kalerkantho

রবিবার । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৭ ফাল্গুন ১৪২৩। ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিকলাঙ্গ হয়ে গেলো শত শত শিশু! কারণটা এখনো জানেন না বিজ্ঞানীরা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ১৯:০৫



বিকলাঙ্গ হয়ে গেলো শত শত শিশু! কারণটা এখনো জানেন না বিজ্ঞানীরা

এরিন অলিভেরার বাচ্চা ছেলেটি বিকলাঙ্গ হয়ে গেলো। কিন্তু কেন এমন হলো তা জানতেই কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষায় থাকতে হলো তাকে। দশ মাস বয়সী লুসিয়ান অস্বাভাবিকভাবে হামাগুড়ি দিতে থাকলো। তার বাম পাটি টেনে আনতে হতো। খুব দ্রত সময়ের মধ্যে সে তার মাথাটাও ঠিকমতো উঁচু করতে সক্ষমতা হারালো। লস অ্যাঞ্জেলসের হাসপাতালে নিয়ে গেলেন মা। কিন্তু চিকিৎসকরা বলতে পারলেন না, কেন তার এমন হচ্ছে।

লুসিয়ানের বাম পাটি ধরলে জেলির মতো তুলতুলে মনে হয়। সে তা নাড়াতে পারে না। তার নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে আসে। হাসলেও ঠোঁটের বাম দিকটি কেমন যেন ঝুলে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা একের পর এক টেস্ট করতে থাকলেন। এরিন সময় কাটাতে থাকলেন হাসপাতালে। মা ভেবে পাচ্ছিলেন না, এই আধুনিক যুগেও এত যন্ত্রপাতি ধরতেই পারছে না যে বাচ্চাটির কি হয়েছে?

বললেন, আমি ওর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম। কারণ জানিই তো না যে ওর আসলে কি হয়েছে?

লুসিয়ান এক রহস্যময় রোগে ভুগতে থাকলো। এ নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটাতে থাকলেন বিজ্ঞানীরা। হঠাৎ করেই দেহের কোনো অঙ্গ প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার ঘটনা সেই পোলিও'র সময় ঘটতো। এর পর থেতে এমনটা শোনা যায় না। কিন্তু লুসিয়ানের ঘটনা আবারো বিজ্ঞানীদের চিন্তায় ফেলে দিলো।

বাচ্চাটি অসুস্থ হওয়ার আগে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এখন হামাগুড়িও দিতে পারে না। ২০১২ সালের জুলাইয়ের এক সকালে লুসিয়ানকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন এরিন। ভাবলেন সে আর হয়তো কখনোই হাঁটবে না।

আর তিন সন্তান রয়েছে এরিন ও ইসরায়েলের। ভেবেছিলেন লুসিয়ানই শেষ সন্তান। কিন্তু ছোট ছেলেটির এ অবস্থাতে হতাশ হয়ে পড়লেন তারা। ও বড় হবে। গাড়ি চালাতে পারবে না, বিয়ে করতে পারবে না। ওর কি হবে?

তারা লুসিয়ানকে নিয়ে আরো বিশেষজ্ঞদের কাছে নিয়ে গেলেন। কয়েক মাস ফিজিক্যাল থেরাপি দেহের যথেষ্ট উন্নতি হলেও বাম পা আগের মতোই থেকে গেলো।

এরিন পাগলাটে হয়ে উঠলেন। তিনি ইন্টরনেট ঘাঁটতে থাকলেন। তিনি এর কারণ জানতে চান। একদিন এক নিবন্ধ পেলেন যেখানে এক ডজন প্যারালাইজড বাচ্চাদের কথা লেখা হয়েছে। সেখানে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজিস্ট ড. কিথ ভ্যান হারেনের কথা লিখা আছে। তিনি এমন অনেক কেস নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন।

এরিন যোগাযোগ করলেন কিথ ভ্যানের সঙ্গে। তখন বিশেষজ্ঞ আরেকটি ৩ বছর বয়সী মেয়ে বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত। তার ঠাণ্ডা লাগে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার একটি হাত নাড়াতে পারছিল না। বিশেষজ্ঞরা ভাবছিলেন মেয়েটি কোনো অটোইমিউন ডিজিসে ভুগছে। দেহ তার কোষগুলোকে ভুল করে আক্রমণ করে বসে।

হারেন ভাবলেন, এই ঘটনাগুলো পোলিও চেয়েও বেশি কিছু প্রকাশ করছে। বহু আগে থেকেই পোলিও বিদায় নিয়েছে। এর কোনো ঘটনা আর চোখে পড়েনি। মেয়েটিকে পোলিওর টিকা দেওয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বললেন হারেন। দেখলেন, তারাও বিষয়টি নিয়ে সচেতন।

বেশ কয়েকজন চিকিৎসক একই সমস্যা নিয়ে আসা বেশ কয়েকজন রোগীকে পরীক্ষা করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়া ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথের বিশেষজ্ঞ ড. ক্যারোল গ্লাসেরকে সবাই বললেন, তাদের পোলিওর পরীক্ষা করতে।

কিন্তু সন্দেহ যায় না গ্লাসেরকে। কারণ পোলিও হতে পারে না। এটা চলে গেছে। পরীক্ষার পর খুব দ্রুত বুঝে ফেললেন তিনি, এরা কেউ পোলিওতে আক্রান্ত নয়। পোলিইভাইরাস গোত্রের অন্যান্য ভাইরাসের আক্রমণ কিনা তা দেখার চেষ্টার করলেন তিনি। বুঝলেন, সম্ভাব্য শত্রুটা হলো এন্টেরোভাইরাস ডি-৬৮।

এন্টেরোভাইরাস ডি-৬৮ এক বিরল ভাইরাস। ১৯৬২ সালে প্রথম আবিষ্কারের পর এর আর দেখা মেলেনি বললেই চলে।

এ ভাইরাসের বিষয়ে শোনেননি ভ্যান হারেন। পরে হারেন ও গ্লেসার প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের দেখলেন। যদি এই ভাইরাসের আক্রমণ ঘটে, তবে এটা কি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে?

ভ্যান হারেনের সঙ্গে দেখা হলো লুসিয়ানের। তখন ২০১৪ সাল। বছর দুয়ের আগে ওই মেয়েটির চিকিৎসা করেছিলেন তিনি। বাম পা পরীক্ষা করতে থাকলেন বিশেষজ্ঞ। এই সময়ের মধ্যে হারেন এমন প্যারালাইসিসের বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষণা চালিয়েছেন। একটি, দুটি, চারটি অঙ্গ প্যারালাইজড হতে পারে। এতে মস্তিষ্কের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তিনি পোলিও মতো প্যারালাইসিস সৃষ্টিকারী এন্টেরোভাইরাস ডি-৬৮ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। এমন আরো কয়কটি শিশু রয়েছে বলে জানান হারেন। বলে রাখলেন বিশেষজ্ঞ, লুসিয়ানের ফিজিক্যাল থেরাপি চলতে থাকবে। তবে তার ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

এরিন এবং ইসরায়েল ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে ফেরার পর এই রহস্যময় প্যারালাইসিস ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে ওই ভাইরাসের আক্রমণে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বাচ্চাদের ভীড় বাড়তে থাকলো। টেক্সাসের ১১ বছরের ছেলে হাঁটার সক্ষমতা হারালো। সান্তা বারবারার ১৭ বছরের মেয়েটির ঘাড়ে ব্যথা শুরু হলো এবং তার নিচ থেকে বিকলাঙ্গ হয়ে গেলো।

কানসাস সিটির চিলড্রেন্স মার্সি হসপিটালের নিউরোলজিস্ট ড. জিন-ব্যাপটিস্টে লি পিচোন জানালেন, বাচ্চাগুলোর যা ঘটে চললো তা পোলিওর আক্রমণের মতোই। গ্লেসার এসব ঘটনায় শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। হয়তো এন্টেরোভাইরাস ডি-৬৮ এগুলো ঘটিয়ে চলেছে।

বিশেষজ্ঞরা এ অবস্থার নাম দিলেন অ্যাকুট ফ্লাসিড মাইএলিটিস। হঠাৎ করেই বিকলাঙ্গ হয়ে যায় দেহের যেকোনো অংশ। ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে আমেরিকার ৩৫টি স্টেটের ১২০টি শিশু এতে আক্রান্ত হয়।

ধারণা করা হলো, একটি ভাইরাস স্পাইনাল কর্ড দিয়ে মস্তিষ্কের মোটর ফাংশন ক্ষতিগ্রস্ত করে।

লুসিয়ানের বয়স ৫। সে তার ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলা করে। বাবা তাকে দেখাশোনার জন্য কাজ কমিয়ে দিয়েছেন। পরাশোনা করতে লুসিয়ানের কোনো সমষ্যা হবে না বলেই মনে করে বাবা-মা।

কয়েক মাস আগে লুসিয়ান বাবা-মা বলে কোনো ইঞ্জেকশন দিতে। তার ধারণা এতে সে ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু তাকে বুঝিয়ে বললেন এরিন যে, এটা আর সারবে না।

গোটা আমেরিকার আরো ৩০টি শিশুর একই ঘটনা ঘটলো। বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না কারণটা কি? কেউ ভাবেন সেই বিরল ভাইরাসই দায়ী। তবে একে খুঁজে বের করতে শিশুদের সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড থেকে। কিন্তু এ কাজটি এখনো করা হয়নি। বিগত ৩৬ বছরের মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ জন মানুষ। হতে পারে ভাইরাসটি সম্প্রতি মিউটেশনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে এমনটা ঘটাচ্ছে।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এন্টেরোভাইরাস ডি-৬৮ চিন্তা করেই ভ্যাক্সিন বানানো সম্ভব নয়। কারণ এতে ভাইরাসটি আবারো টিকে থাকার পথ খুঁজে নেবে।

এখন লুসিয়ান স্কুলে যায়। প্রথম দিন তার সঙ্গে থাকার অনুমতি পেয়েছেন বাবা। অন্যান্য ছেলে-মেয়েরা তাকে অনেক ভালোবাসে। ইসরায়েল স্কুল থেকে লুসিয়ানকে তুলে নিতে যান। কপালে চুমু দিয়ে গাড়ির দিকে এগোন কোলে নিয়ে। লুসিয়ান তার বন্ধুদের থেকে বিদায় নেয়। রওনা দেয় তার বাড়ির দিকে। সূত্র : এলএ টাইমস

 


মন্তব্য