kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আশুরায় করণীয় ও বর্জনীয়

মুফতি হুমায়ুন কবির খালভি   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ১৮:৪৯



আশুরায় করণীয় ও বর্জনীয়

আশুরার দিনে একটি আমল সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তা হলো রোজা রাখা।

আশুরা উপলক্ষে দুদিন রোজা রাখতে হয়। মহররমের ১০ তারিখের আগে বা পরে এক দিন বাড়িয়ে রোজা রাখা মুস্তাহাব। আরেকটি আমল বর্ণনা সূত্রে দুর্বল হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তা হলো, আশুরার দিনে খাবারে প্রশস্ততা। যথাসম্ভব ভালো খাবার খাওয়া। আরেকটি আমল যুক্তিভিত্তিক প্রমাণিত। সেটি হলো, আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের শাহাদাতের কারণে তাঁদের জন্য দোয়া করা, দরুদ পড়া ও তাঁদের কাছ থেকে সত্যের ওপর অটল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করা। এ ছাড়া অন্য কোনো আমল নেই। অন্য সব বিদআত ও বর্জনীয়।

আশুরার দিন রোজা রাখলে এক বছরের পুণ্য

আশুরার রোজা একসময় ফরজ ছিল। পরে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর তা রহিত হয়ে গেছে। তখন থেকে আশুরার দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। সহিহ মুসলিম শরিফে এসেছে, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কুরাইশরা জাহেলি যুগে আশুরার দিন রোজা রাখত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) সেদিন রোজা রাখতেন যখন তিনি মদিনায় হিজরত করেন, তখন থেকে। তিনি নিজে রোজা রাখেন ও সাহাবাদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন। অতঃপর যখন রমজানের রোজা ফরজ হয়, তখন তিনি বললেন, যার ইচ্ছা রোজা রাখো, আর যার ইচ্ছা রোজা রাখবে না। ’ (মুসলিম, হাদিস : ১১২৫)

মুসনাদে হুমাইদিতে এসেছে, হজরত আবু কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আরাফার দিনের রোজা এ বছর ও আগামী বছরের পাপের কাফ্ফারা হবে। আর আশুরার রোজা এক বছরের পাপের কাফ্ফারা হবে। ’ (হুমাইদি, হাদিস : ৪৩৩)

মুসনাদে আহমদে এসেছে, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো, আর ইহুদিদের বিরোধিতা করো। তাই তোমরা এক দিন আগে বা পরে রোজা বাড়িয়ে দাও। ’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২১৫৪)

শায়খ উসাইমিন লিখেছেন : আশুরার দিন রোজা রাখার চারটি স্তর রয়েছে, প্রথম স্তর—৯, ১০ ও ১১তম দিন রোজা রাখা। এটি উত্তম অভিমত। দ্বিতীয় স্তর হলো—৯ ও ১০ তারিখ রাখা। আর তৃতীয় স্তর হলো—১০ তারিখের সঙ্গে ১১ তারিখ রোজা রাখা। আর চতুর্থ স্তর হলো শুধু ১০ তারিখে রোজা রাখা। কোনো কোনো আলেম এটিকে মুবাহ বলেছেন। আর অনেকে মাকরুহ বলেছেন। তবে কেবল ১০ তারিখ রোজা রাখা মাকরুহ হওয়ার অভিমত শক্তিশালী। তাই আমাদের এক দিন আগে বা এক দিন পরে বাড়িয়ে রোজা রাখা উচিত। (লিকাউল বাবিল মাফতু : ৯৫/১৩)

খাবারে প্রশস্ততা করলে বরকত হয়

মুজামুল কবির ও বায়হাকিতে এসেছে, আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিন পরিবারে প্রশস্ততা করবে, সে সারা বছর প্রশস্ততায় থাকবে। (তাবরানি, মুজামে কবির, হাদিস : ১০০০৭; বায়হাকি, হাদিস : ৩৭৯৫)

এ হাদিসের বর্ণনা সূত্রে দুর্বলতা আছে। তবে ইবনে হিব্বানের মতে, এটি ‘হাসান’ পর্যায়ের হাদিস। ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর দাবি হলো, রিজিকে প্রশস্ততার ব্যাপারে কোনো হাদিস নেই। এটি ধারণাপ্রসূত। ইমাম আহমদ (রহ.) বলেছেন, এটি বিশুদ্ধ হাদিস নয়। অর্থাৎ সত্তাগতভাবে এটি বিশুদ্ধ হাদিস নয়। তবে এ বিষয়ে একাধিক বর্ণনা থাকার কারণে ‘হাসান’ হওয়া অস্বীকার করা যাবে না। আর ‘হাসান লিগাইরিহি’ দ্বারা দলিল দেওয়া যায়। (আস সওয়াইকুল মুহরিকা আলা আহলির রফযি ওয়াদ দালাল ওয়ায যানদিকা, খণ্ড-২, পৃ.৫৩৬)

আশুরায় বর্জনীয় ও বিদআত

ওপরে উল্লিখিত তিনটি আমল ছাড়া আরো বিভিন্ন আমল আশুরার দিনে সমাজে প্রচলিত, যা থেকে বিরত থাকা প্রকৃত মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।

আশুরার দিন সুরমা লাগানো : হানাফি মাজহাবের কেউ কেউ আশুরার দিন সুরমা লাগানোর কথা বলেছেন। যেমন তাহতাবি ও হিদায়া নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃত কথা হলো, আশুরার দিন সুরমা লাগানো বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। এটি বানানো হাদিস। তাই বেশির ভাগ হানাফি আলেম এটিকে বিদআত বলেছেন। ফাতওয়ায়ে শামিতে এসেছে : আশুরার দিন সুরমা লাগানোর হাদিসকে মোল্লা আলী কারী (রহ.) জাল হাদিসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আল্লামা সুয়ুতি (রহ.) দুরারে মুনতাসিরাতে হাকিম সূত্রে এটিকে ‘মুনকার’ বলেছেন। আল্লামা জারাহি (রহ.) ‘কাশফুল খিফা ওয়া মুজিলুল ইলবাস’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, আশুরার দিন সুরমা লাগানোর হাদিস নবী (সা.) থেকে প্রমাণিত নয়। তাই তা বিদআত। তবে খাবারে প্রশস্ততার হাদিস প্রমাণিত ও সহিহ। হাফিজ সুয়ুতি দুরারে তা-ই বলেছেন। ’ (রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, খণ্ড-২, পৃ. ৪১৯, ৪৩০)

ঈদ বানানো : আশুরার দিনকে ঈদ বানানো যাবে না। বরং রোজা রাখা হবে। আর ঈদের দিন তো রোজা রাখা হারাম। মুসলিম শরিফে এসেছে, আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘খায়বরবাসী আশুরার দিন রোজা রাখত। এটিকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করত। তাদের নারীদের অলংকার ও সুন্দর পোশাক পরিধান করাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের বললেন, তোমরা রোজা রাখো। ’ (কুশাইরি, হাদিস : ১১৩১)

পিপাসার্ত থাকা : জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ.) লিখেছেন : কিছু মনপূজারি লোক আশুরার দিন কুসংস্কারে লিপ্ত হয়। যেমন—পিপাসার্ত থাকা, পেরেশান হওয়া, ক্রন্দন করা ইত্যাদি। এগুলো বিদআত। এগুলো আল্লাহ, তাঁর রাসুল, সালফে সালেহীন, আহলে বাইত প্রমুখ অনুমোদিত নয়। নিশ্চয়ই হুসাইন (রা.)-এর হত্যার মাধ্যমে পূর্ব যুগে ফিতনার সূচনা হয়। তাতে আমাদের করণীয় হলো, যা মসিবতের সময় করণীয়। সেটি হলো, ইন্না লিল্লাহ... পড়া, ধৈর্য ধরা, হা-হুতাশ না করা, নিজের আত্মাকে কষ্ট না দেওয়া। অথচ বর্তমানে বিদআতিরা এসব করে থাকে। তাতে তারা অনেক মিথ্যা ও সাহাবাদের ব্যাপারে খারাপ বিবরণ পেশ করে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অপছন্দ করেন। (হাকিকাতুস সুন্নাহ ওয়াল বিদআতি : ১/১৪৭)

মাতম করা ও শোক পালন : আল্লামা সুয়ুতি (রহ.) লিখেছেন : বিভিন্ন বিপদের দিনকে শোকের দিন বানানো ইসলাম সমর্থন করে না। এটি জাহেলি কাজ। শিয়া সম্প্রদায় আশুরার দিনে এসব করে এ দিনের মর্যাদাবান রোজা ছেড়ে দেয়। (হাকিকাতুস সুন্নাহ ওয়াল বিদআতি, খণ্ড-১, পৃ. ১৪৮)।

তেল মালিশ, মেহেদি ব্যবহার, দানা রান্না করা, নতুন কাপড় পরিধান : আবুল আব্বাস আনসারি লিখেছেন : মুহাদ্দিস ও ফকিহদের কাছ থেকে সুরমা লাগানো, গোসল করা, মেহেদি লাগানো, দানা রান্না করা, নতুন কাপড় পরিধান করা এবং আশুরার দিন খুশি পালন করার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়। তাঁরা বলেন, তাতে কোনো সহিহ হাদিস রাসুল ও সাহাবা থেকে বর্ণিত নেই। এমনকি কোনো ইমাম, চার প্রসিদ্ধ ইমাম ও অন্য কেউ মুস্তাহাব বলেননি। এ বিষয়ে কোনো বিশ্বস্ত কিতাবে সহিহ বা দুর্বল কোনো অভিমতও নেই। (আস সওয়াইকুল মুহরিকা আলা আহলির রফযি ওয়াদ দালাল ওয়ায যানদিকা, খণ্ড-২, পৃ. ৫৩৫)

হুসাইন (রা.)-এর বিরোধীরাই এসব বিদআত আবিষ্কার করেছে। এগুলো মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে শরিয়তের কোনো দলিল নেই। জুমহুর আলেমদের মতে, সেদিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। (ইসলাহুল মাসাজিদ, খণ্ড-১, পৃ. ১৬৭)

গোশত না খাওয়া : মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব (রহ.) লিখেছেন : ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, আশুরার দিন সুরমা লাগানো, তেল লাগানো, সুগন্ধি লাগানো মিথ্যুকদের বানানো কথা। এর বিপরীতে আরেক দল এটিকে শোক ও মাতমের দিন বানিয়েছে। দুই দলই বিদআতি। সুন্নাতের বিপরীতে এদের অবস্থান। আর রাফেজিরা বৈধ প্রাণীর গোশত ভক্ষণ নিষিদ্ধ মনে করে। (রিসালাতুন ফির রদ্দি আলার রাফিযা : ১/৪৯)

নামাজ পড়া : রায়িদ ইবনে সাবরি (রহ.) লিখেন, আশুরার দিন এভাবে নামাজ পড়বে—জোহর ও আসরের মাঝখানে চার রাকাত নামাজ পড়বে। প্রত্যেক রাকাতে সুরায়ে ফাতিহা ও ১০ বার আয়াতুল কুরসি পড়বে, ১১ বার সুরা ইখলাস পড়বে, পাঁচবার সুরা নাস ও ফালাক পড়বে। যখন সালাম ফিরাবে, ৭০ বার আসতাগফিরুল্লাহ বলবে। (মুজামুল বিদাঈ, পৃ. ৩৪১)

এভাবে অনেকেই আশুরার দিন নামাজ পড়ার বিভিন্ন পদ্ধতি ও ফজিলত বর্ণনা করেন। এগুলো বানোয়াট কথা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস। শিয়া সম্প্রদায় এগুলো রচনা করেছে।

শিয়ারা আশুরার দিনকে শোকের দিন পালন করে। এটি বনি উমাইয়ার প্রতি বিদ্বেষের কারণে। এটি হুসাইন (রা.)-এর প্রতি মোহাব্বত বা শোকের কারণে নয়। কেননা হজরত আলী (রা.) হুসাইন (রা.)-এর পিতা ছিলেন। পিতা অবশ্যই পুত্র থেকে উত্তম। আলী (রা.)-কেও অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। অথচ তাঁর মৃত্যুর দিনকে শোকের দিন হিসেবে পালন করা হয় না। হুসাইন ও আলী (রা.)-এর চেয়ে উত্তম ওসমান (রা.)-কেও অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর শাহাদাতের দিনকেও শোকের দিন পালন করা হয় না। তাঁদের চেয়ে উত্তম হজরত ওমর (রা.)। তাঁর শহীদ হওয়ার দিনকে তো তারা শোকের দিন হিসেবে পালন করে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক জ্ঞান নিয়ে সঠিকভাবে আমল করার তাওফিক দান করুন।  

লেখক : লেকচারার, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য