kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন

কন্যা শিশুরা ভালো নেই বাংলাদেশে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ২০:৫১



কন্যা শিশুরা ভালো নেই বাংলাদেশে

বিশ্বে মোট জনসংখ্যার ১৫ ভাগ কন্যা শিশু৷ বাংলাদেশে মোট জনসংখার ১০ ভাগ৷ কিন্তু এই কন্যা শিশুরা নানা দিক দিয়ে এখনো অবহেলিত৷ তারা নিরাপত্তাহীনতা আর অপুষ্টির শিকার ঘরে বাইরে, সবখানে৷
গত আগস্টে ঢাকায় উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আখতার রিশাকে কুপিয়ে আহত করা হয় তার স্কুলের সামনে৷ পরে সে হাসপাতালে মারা যায়৷ কিন্তু আহত রিশাকে হাসপাতালে নেয়া তো দূরের কথা, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে স্কুল চত্বরেও রাখতে দেয়নি৷ তারা তখন ঘটনাটিকে ‘ঝামেলা' মনে করেছে৷
তাকে হত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে ওবায়দুল নামে টেইলার্সের এক কর্মচারীকে৷ আর পোশাক বানাতে গিয়ে ওই কর্মচারীকে রিশার ফোন নাম্বার দিয়েছিলেন তার মা-বাবাই৷ তারা অজান্তেই রিশার নিরাপত্তাকে অবহেলা করেছেন৷
গত ১৫ এপ্রিল ঢাকার মিরপুরে ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে জামেনা আক্তার নামে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী৷ ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে আইন থাকার পরও তা থামছেনা৷
ঢাকার একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী সাবেরা টিউলিপ ডয়চে ভেলেকে জানায়, ‘‘আমরা ঘরে-বাইরে সবখানেই এক ধরণের অবহেলা এবং নিরাপত্তাহীনতার শিকার৷ যে কোনো ঘটনার জন্য আমাদের দায়ী করার প্রবণতা স্পষ্ট৷ কেউ ইভটিজিংয়ের শিকার হলে তার জন্য আমাদের দায়ী করা হয়৷ আবার প্রতিবাদ করলে বলা হয়, আমরা কেন ঝামেলা করতে গেলাম৷''
টিউলিপ আরো বলে, ‘‘এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আমরা নানাভাবে হয়রানি, নির্যাতন এবং নিপীড়নের শিকার হচ্ছি৷''
বাংলাদেশে এখন কন্যা শিশু এক কোটি ৬০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার শতকরা দশ ভাগ৷ দেশের বিভিন্ন জরিপ এবং গবেষণায় ১৫ থেকে ১৮-১৯ বছরের মেয়েরা গরুত্ব পায়৷ কিন্তু ১০ থেকে ১৪ বছর  বয়সি কন্যা শিশুরা কী অস্থায় আছে তার চিত্র পরিসংখ্যানে স্পষ্ট নয়৷ অথচ উপরে যে দু'টি উদাহরণ দেয়া হলো তাদের বয়স ১০ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে৷
নারী  ও মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই বয়সের কন্যা শিশুরা প্রধানত পরিবারে, রাস্তায় এবং স্কুলে নানা ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়৷ তাদের ওপর যৌন নির্যাতনও করা হয়৷ তারা তা প্রকাশ করেনা৷ বা ভয়ে প্রকাশ করতে পারেনা৷''
পরিসংখ্যণ অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলে ভর্তির দিক দিয়ে কন্যা শিশুরা এগিয়ে৷ আবার তাদের ড্রপ ‘আউট'ও বেশি৷ মাধ্যমিকে মেয়েদের অন্তর্ভূক্তি  ৬৪ ভাগ আর ছেলে ৫৭ ভাগ৷ কিন্তু ঝরে পড়া হিসেবে মেয়ে ৪৭ এবং ছেলে ৩৫ ভাগ৷ অন্যদিকে এই কন্যা শিশুরা কাজে অংশ গ্রহণের ক্ষেত্রেও ছেলেদের চেয়ে পিছিয়ে৷
জাতিসংঘের শিশু-বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষ স্থানীয় দেশগুলোর একটি৷ বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে হয়৷ ১৮ বছর বয়সের মধ্যে ৫২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়৷ ‘সেভ দ্য চিল্ড্রেন'-এর তথ্য অনুসারে, ১০ বছর বয়সি কন্যা শিশুদের অনেক বেশি বয়সি পুরুষদের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়৷
এলিনা খান বলেন, ‘‘এই পরিসংখ্যান একটি ভয়াবহ তথ্য দেয়৷ আর তা হলো, মেয়েরা বাবার বাড়িতে যেমন  ঠিকমতো খাবার পায়না, তেমনি অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় তারা শ্বশুর বাড়িতে গিয়েও নানা চাপে পড়ে৷ তারা নানা রোগে আক্রান্ত হয় এবং অপুষ্টি এবং শারীরিক সমস্যায় ভোগে৷''
তিনি বলেন, ‘‘আমরা শহরে আর গ্রামে ভিন্ন চিত্র দেখি৷ শহরে এখানো মেয়েদের দিয়ে ঘরকন্যার কাজ করানো হয়৷ আর শহরে আছে নানা হয়রানি৷ যদিও তারপরও মেয়েরা নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে৷''
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী ড. মাহবুবা নাসরিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘নিরাপত্তার বিষয় থেকেই কন্যাশিশুর সব অবহেলা এবং নির্যাতনের শুরু৷ আর কন্যা শিশুকে শুরু থেকেই মেয়ে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ এই দৃষ্টিভঙ্গি এখানো তেমন পল্টায়নি৷''
সমাজবিজ্ঞানী ড. মাহবুবা নাসরিনের মতে,  ‘‘কন্যা শিশু জন্মের পর থেকেই প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে৷ ফলে তার নিজের মানসিকতায়ও এক ধরণের অবদমন থাকে৷''


মন্তব্য