kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০১৬

সুন্দর জীবনের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য

ডা. জিল্লুর রহমান রতন   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৩৫



সুন্দর জীবনের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য

মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক রোগের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি বরাবরই উপেক্ষিত ও অবহেলিত। এ চিত্র উন্নতদেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ প্রায় সব দেশে একই রকম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় (Treatment  Gap Survey) দেখা যায় বিশ্বব্যাপী মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শতকরা ৫০-৭০ ভাগ বিজ্ঞানসম্মত মানসিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ৬৭ জন সময়মতো মানসিক রোগের চিকিৎসা সেবা পায় না। কিন্তু সাসটেইনেবেল ডেভলাপমেন্ট গোল (SDGs ) এর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জনগণকে সুস্থ্য ও কর্মক্ষম রাখা। মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার না দিলে সেটি অসম্ভব।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযথ মর্যাদায় ১০ অক্টোবর জাতীয়ভাবে বিশ্ব মানসিক দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘মানসিক স্বাস্থ্যে মর্যাদাবোধ- সবার জন্য প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা  (Dignity in Mental Health- Psychological and Mental Health First Aid for All)’। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিগত বছরের প্রতিপাদ্য ‘মানসিক স্বাস্থ্যে মর্যাদাবোধ’ এর সম্প্রসারণ। মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক রোগ ও এর চিকিত্সার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় জনগণের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অনেকসময় মানসিক রোগে আক্রান্ত  ব্যক্তি লোকলজ্জা ও অসম্মানের ভয়ে সেটি প্রকাশ করতে চান না এবং চিকিত্সা নিতে লজ্জাবোধ করেন, যেটি শারীরিক রোগের ড়্গেত্রে (হৃদরোগ, ডায়াবেটিস) দেখা যায় না। এজন্য জনসচেতনতার  অংশ হিসেবে প্রতিবছর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। মানসিক রোগ চিকিত্সা সম্পর্কে বিদ্যমান ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার দূর করতে পারলে মানসিক স্বাস্থ্য আরো মর্যাদার আসনে সমুন্নত হবে ও জনগণের চিকিত্সা প্রাপ্তি সহজ হবে।  

এ বছরের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যে এছাড়াও সবার জন্য প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা  প্রাপ্তির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সংকটে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা শারীরিক স্বাস্থ্য সেবার মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার (Psychological First Aid) ধারণাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় মানসিক আঘাতের জন্য প্রয়োগ করা হলেও পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইন্টার এজেন্সি স্ট্যাডিং কমিটি (IASC ) কর্তৃক আধুনিকীকরণ করা হয়। বিভিন্ন ধরনের সংকটে যেমন- সড়ক দুর্ঘটনা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক এবং যৌন সহিনসতা, সহিংস আচরনের শিকার হওয়া, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে (সাভার রানা প্লাজা গার্মেন্টস দুর্ঘটনা ও সাম্প্রতিক গুলশান সন্ত্রাসী হামলা) যে মানসিক ক্ষত তৈরি হয় তা বেশির ভাগ সময় দেখা যায় না। এসব ক্ষেত্রে মানসিক প্রতিক্রিয়া যেমন- মানসিক চাপ বোধ করা,  উদ্বেগ ও বিষণ্নতাবোধ হওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দেখা যায় যা পরবর্তীতে উদ্বেগজনিত মানসিক রোগ, বিষণ্নতা, চাপজনিত মানসিক রোগ, মনোদৈহিক রোগ সহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগ দেখা যায়। এক্ষেত্রে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার  পাশাপাশি মানসিক রোগের বিশেষায়িত চিকিত্সা সেবা প্রয়োজন।  
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানসিক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের দেশে প্রাপ্ত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর শতকরা ১৬ ভাগ (২০০৫) ও শিশু-কিশোরদের শতকরা ১৮ (২০০৯) ভাগ মানসিক রোগেয় ভুগছে। সম্প্রতি (২০১৬) জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও স্বাস্থ্য অধিপ্তরের (এনসিডিসি) কর্তৃক প্রাপ্ত বয়স্ক জনগণের উপর পরিচালিত একটি কমিউনিটি সার্ভের প্রাথমিক রির্পোটে দেখা যায়, মানসিক রোগের প্রকোপ ১০ বছরের আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদসহ মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবির সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবায় অন্তর্ভূক্ত করা জরুরি যা সরকারি পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়াও আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনায় (Sector Invesment Plan ) মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে  বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচী নেওয়া হচ্ছে যা জনগনের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তি সহজ লভ্য করবে।  সকলের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।  

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, শিশু-কিশোর মানসিক রোগ বিভাগ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।


মন্তব্য