kalerkantho


গাঁজার রহস্য উদঘাটনে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের তোড়জোড়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ১৭:১০



গাঁজার রহস্য উদঘাটনে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের তোড়জোড়

গাঁজার বিষয়ে নতুন করে অবশ্য আর কিছুই বলার নেই। মানবজাতির আশেপাশে এটি সবসময়ই ছিল।


সাইবেরিয়ায় কবরের ভেতরে ৩ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে আগুনে পোড়ানো গাঁজার বীজ পাওয়া গেছে। হাজার হাজার বছর আগে চীনারা ওষুধ হিসেবে গাঁজার ব্যবহার করতেন। গাঁজা একটি আমেরিকান নেশাও বটে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসজুড়ে গাঁজা সেবন আইনগতভাবে বৈধ ছিল।
কিন্তু একটা সময়ে এসে গাঁজা সেবনের ফলে পাগলামি দেখা দিতে থাকে। গাঁজা হয়ে ওঠে তারুণ্যের গুপ্তঘাতক। খুনি নেশা। অন্য মাদকের প্রতি আগ্রহ জাগানিয়া মাদক। ফলে প্রায় ৭০ বছর গাঁজা অদৃশ্য ছিল। আর এ নিয়ে চিকিৎসা সম্পর্কিত গবেষণাও বন্ধ ছিল।
১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার গাঁজা নিয়ে কোনো ধরনের গবেষণা করা আরো কঠিন করে তোলে। সে বছরই সরকার গাঁজাকে শিডিউল ওয়ান মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। গাঁজাকেও হেরোইনের মতো বিপজ্জনক মাদকের তালিকাভুক্ত করা হয়। এমনকি যারা গাঁজা সম্পর্কিত কোনো জ্ঞান ছড়াতো বা গবেষণা করতো তাদেরকেও ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হতো।
তবে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য লোকে এখন গাঁজার প্রতি যতি বেশি ঝুঁকে পড়ছে ততই গাঁজা সম্পর্কিত বিজ্ঞান পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। আর এতে লুকিয়ে থাকা বিস্ময় এবং অলৌকিকত্বগুলোও আবিষ্কৃত হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র গাঁজাকে এখনো শিডিউল ওয়ানভুক্ত মাদক হিসেবেই বিবেচনায় রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল বিবেক মুর্থি সম্প্রতি গাঁজা সম্পর্কিত বিজ্ঞানের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা গেছে, “বিশেষ কিছু চিকিৎসাগত অবস্থা এবং লক্ষণের” জন্য গাঁজা “সহায়ক” হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৩টি অঙ্গরাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অফ কলাম্বিয়ায় কিছু চিকিৎসাগত উদ্দেশ্যের জন্য গাঁজার ব্যবহার আইনগতভাবে বৈধ। আর বেশিরভাগ আমেরিকান চিত্তবিনোদনের জন্য গাঁজার ব্যবহার বৈধ করার পক্ষপাতি।
উরুগুয়েতে ভোটের মাধ্যমে গাঁজা বৈধ করা হয়েছে। পর্তুগালে গাঁজা সেবনকে নিরপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কানাডা, নেদারল্যান্ডস এবং ইসরায়েলে চিকিৎসাগত উদ্দেশ্য সাধনে গাঁজার ব্যবহার করা হয়। আর সম্প্রতি বিশ্বের আরো বেশে কয়েকটি দেশে গাঁজা সম্পর্কিত আইন-কানুন আরো নমনীয় করা হয়েছে।
নিস্তেজ ব্যাথা, নিদ্রাহীনতা, ক্ষুধামান্দ্য এবং জীবনের কষাঘাতগুলো থেকে মুক্তিতেও গাঁজা বেশ কার্যকর। গাঁজা সেবনকারীরা জানিয়েছেন, গাঁজা সেবনের ফলে মানসিক অবসাদের চাপ কমে আসে। এটি বেদনানাশক, বমিরোধী, শ্বাসকষ্ট লাঘবকারী এবং প্রদাহরোধী ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এটি এমনকি হেঁচকি থেকে মুক্তিতেও বেশ কার্যকর। গাঁজাতে থাকা বিভিন্ন উপাদান ট্রমা থেকে মস্তিষ্ককে রক্ষা করা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং কোনো সর্বনাশা ঘটনার বেদনাদায়ক স্মৃতি মুছে ফেলার কাজও করে।
এমনকি ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়েও বিজ্ঞান গাঁজা সম্পর্কিত প্রাথমিক তথ্যটি জানতো না। গাঁজার ভেতরে থাকা উপাদানটি কী এবং এটি কীভাবে ক্রিয়া করে তখনো পর্যন্ত তা রহস্যাবৃতই ছিল। ১৯৬৩ সালে ইসরায়েলি বিজ্ঞানী রাফায়েল ম্যাচুলাম তেল আবিবের অদূরে ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে গাঁজা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু গবেষণা করে প্রথমদিকে তিনি হতাশ হন। তিনি বলেন গাঁজা স্রেফ একটি গাছ ছাড়া আর কিছু্ই নয়।
এরপর আরো গবেষণা থেকে অবশেষে আবিষ্কৃত হয়, গাঁজাতে টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (টিএইচসি) নামের একটি রাসায়নিক উপাদান আছে যেটি মানুষের মনকে নিস্তেজ করে দিতে বেশ কার্যকর ভুমিকা পালন করে। এছাড়া তার নেতৃত্বাধীন গবেষক দল গাঁজার আরেকটি উপাদান ক্যানাবিডিওল (সিবিডি) এর রাসায়নিক গঠনগত কাঠামোও উদঘাটন করেন। এই উপাদানটি অনেক চিকিৎসাগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্ভব। আর মানবদেহে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে না। এই আবিষ্কারের ফলে ম্যাচুলামকে গাঁজার বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
তিনিই গাঁজার নেতিবাচক প্রভাবও আবিষ্কার করেন। তিনি গবেষণা করে দেখতে পেয়েছেন যে, গাঁজা সেবনকারীরা মারাত্মক ক্ষতিকারক ও শরীর দুর্বলকারী উদ্বেগজনিত মানসিক বিশৃঙ্খলায় আক্রান্ত হতে পারেন। এমনকি গাঁজার ব্যবহারে যাদের পূর্ব পুরুষদের সিজোফ্রেনিয়া রোগ ছিল তাদের মাঝেও সেই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। ১৯৯২ সালে গাঁজা নিয়ে গবেষণা চালাতে গিয়েই মানব মস্তিষ্ক সম্পর্কিত আরো কিছু বিস্ময়কর আবিষ্কার করেন তিনি।
সাম্প্রতিককালেও গাঁজা নিয়ে বিস্তর পরিসরে গবেষণা চলছে। গত দশকের শেষদিক থেকে নতুন করে গাঁজা নিয়ে এই ব্যাপক গবেষণা শুরু হয়েছে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক


মন্তব্য