kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাবার রোগ ছেলের দেহে : 'আমার হৃদয়টা ভেঙে লক্ষ টুকরা হয়ে যায়'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ২১:১৮



বাবার রোগ ছেলের দেহে : 'আমার হৃদয়টা ভেঙে লক্ষ টুকরা হয়ে যায়'

বিগত ৩৫ বছর ধরে এক নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারে ভুগছি আমি। এটা আমার গোটা দেহে ছড়িয়ে পড়েছে।

মাঝে মাঝেই পেশি প্রচণ্ড ব্যথা হয়। তখন আমার জন্য হাঁটাচলা এবং লেখার কাজটি কঠিন হয়ে পড়ে। এক যন্ত্রণাদায়ক অসুস্থতা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা এভাবেই জানাচ্ছে কার্ল লুয়েপকার। তার ছেলেটারও একই অবস্থা হয়েছে। এ নিয়ে পিতা জানিয়েছেন তার যন্ত্রণার কথা।

বলছেন, আমি দুর্ভাগ্য নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারি। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে আমার এ অবস্থা। আরো ভয়ানক বিষয় হলো, আমি এই রোগটি জিনে বহ করেছি। এটা চলে গেছে আমার ছেলের দেহে। আমার ১১ বছরের ছেলে লিয়াম এখন এতে আক্রান্ত।

যখন আমি আর স্ত্রী সন্তান নেওয়ার কথা ভাবছিলাম, তখন সম্ভাবনার কথা ঠিকই ভাবা হয়েছিল। এই অসুস্থতার সম্ভাবনা সন্তাদের দেহে ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। আমরা এমন এক পরিবার চাইছিলাম যেখানে এ সমস্যা থাকবে না। আমার মেয়েটির দেহে এ রোগ নেই।

বাবা হিসাবে আমি আমার সমস্যা নিয়ে আর আক্ষেপ করি না। এ রোগের নাম ডিস্টোনিয়া। এটা সারাজীবন আমার ওপর নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে। কিন্তু এটা লিয়ামের সঙ্গে অবিচার করেছে। ছেলেটিক এখন এর সঙ্গে লড়াইয়ের নিজস্ব পথ খুঁজে নিতে হবে। সে প্রায়ই আমাবে জিজ্ঞাসা করে, যদি জানতে পারতা যে আমার এ রোগ আছে, তাহলে কি তোমরা আমাকে সন্তান হিসাবে মেনে নিতে? এ প্রশ্ন শুনে আমার হৃদয় ৮০ লাখ উপায়ে ভেঙে যায়। আমার হৃদয় আরো টুকরো হয় যখন এই ভয়ংকর অবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা চালায় সে।

বাবা-মা হিসাবে আপনি আশা করবেন যে, আপনার সন্তানের জীবন আরো ভালোর দিকে যাবে। দৈহিক ও মানসিকভাবে তারা বেড়ে উঠবে যেখানে অবারিত সম্ভাবনা থাকবে।    

আমার বামের বুড়ো আঙুল : এই অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে আমার জীবনে একের পর এক ক্ষতি হতে থাকে। আমার ছেলেটি স্কুলের আরো ৮০০ শিশুর সঙ্গে স্কুলে যায়। লিয়াম তার শিক্ষক এবং সহপাঠীদের তার সমস্যা নিয়ে অনেক কিছু বুঝিয়ে বলে।

যাদের ডিস্টোনিয়া রয়েছে তাদের বেশিরভাগই অবস্থার উন্নতির জন্য ওষুধ খায়। আমি তিনটি ওষুধ খাই। এদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। মাতা ঘোরা, প্রতিক্রিয়া কমে আসা এবং ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এসব ওষুধে আপনার কিডনি এবং লিভার পরিষ্কার থাকবে না। কিন্তু এতে কিছুটা কাজ হয়। কিন্তু আমার ছেলের বিষয়ে আমি অন্য চিকিৎসা নিতে চাই। এই পদ্ধতিতে ইলেকট্রোড গভীরভাবে তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো হবে।

আমার মনে হয়, এই পদ্ধতিতে অন্তত জীবনটাকে একটু সামলে নেওয়া যাবে। আমি এই লেখাটি লিখছি আমার বাম বুড়ো আঙুল দিয়ে। আমার কথা বলা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। হয়তো ডিপ-ব্রেন স্টিমুলেশন বা ডিবিএস গ্রহণের পর আমার কথা আরো খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু গবেষণায় বলা হয়, এতে জীবনটা বদলে যাবে। ডিস্টোনিয়া সামলাতে যাবতীয় ওষুধপত্র আর খেতে হবে না।

তবে লিয়ামকে সাহস দিতে আমি নিজেই এ কাজটি করতে চাই। যখন সার্জারি নিয়ে লিয়ামের সঙ্গে কথা বলি তখন সে আমাকে বোকা বলে। কিন্তু আমরা কথা বলে যাই। লিয়ামের ভয়, যদি আমি ভালো হয়ে যায় তবে হয়তো ওকে আর ভালোবাসবো না।

অদূর ভবিষ্যতেই হয়তো তাকে ডিবিএস নিতে হবে। আমি প্রথমে নিচ্ছি। এতে করে সে বুঝতে পারবে কি ঘটবে তার। ওর জন্য আমি আসলে গিনি পিগ হতে চাই।

ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা হসপিটালে আমার ডিবিএস লাগানো হবে। বিশেষজ্ঞরা আমার খুলির বাইরের অংমে একটি খাঁচা লাগিয়ে দেবেন। এতে নিরাপত্তা দেবে যন্ত্রটিকে। এই ইলেকট্রোডটি আমার মস্তিষ্কের নিউরালের কারবার ধারণ করে তা জানান দেবে নিউরোলজিস্টদের। এই যন্ত্রটি মস্তিষ্কের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে যে অংশটি দেহের ডানপাশের নড়াচড়া ভারসাম্যপূর্ণ করে।

এই সার্জারি চলতে পারে ৫-৭ ঘণ্টা পর্যন্ত। যন্ত্রটি ইলেকট্রিসিটি সরবরাহের পর কি ঘটবে তা দেখতে চান বিশেষজ্ঞরা। এ সার্জারির কারণে ব্যথা বা মানসিক চাপ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠবে না। সমস্যা হলো, এতে বেঁচে থাকার সুযোগ মাত্র ২ শতাংশ।

তবে সার্জারি সফল হলে তার এক সপ্তাহ পর একটি ব্যাটারি বসিয়ে দেওয়া হবে আমার বুকে। এটি থেকে শক্তি সরবরাহ করা হবে মাথার যন্ত্রে। আমার ডিস্টোনিয়া সামলাতে কতটুকু ইলেকট্রিসিটি সরবরা করতে হবে তা ঠিক করে দেবেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা জানান, কয়েক মাস বা বছর লেগে যেতে পারে মস্তিষ্কের এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে।

নতুন সমস্যা : সম্প্রতি লিয়ামের একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। সে একটি পেন্সিলও ব্যবহার করতে পারছে না। সে তার এই সমস্যা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। এ কারণেই সে আঁকাআঁকির কাজ আরো জেদ নিয়ে সম্পন্ন করতে চাইছে।

ডিস্টোনিয়া আমাকে একটি জ্ঞান দিয়েছে। তা হলো, মানুষ আসলে তার পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে। লিয়ামকে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলায় সৃষ্টিশীল উপায় বের করতে হবে। আমি এবং আমার স্ত্রী বিশ্বাস করি যে, লিয়াম ঠিকই তার সমস্যা দূর করতে নতুন নতুন উপায় বের করে নেবে। সে একটা ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে। সে তার সীমাবদ্ধতার বাইরে অনেক চিন্তা করবে। লিয়াম ইতিমধ্যে ডিবিএস নিয়ে সাহসী হয়ে উঠছে। তার বয়সে এমন সাহসের কথা আমি চিন্তাই করতে পারতাম না। সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট

 


মন্তব্য