kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ক্ষমাশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত: খুনীর পরিবারকে বন্ধু বানিয়ে নিলো হতাহতের পরিবার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ২১:৫০



ক্ষমাশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত: খুনীর পরিবারকে বন্ধু বানিয়ে নিলো হতাহতের পরিবার

ছবি : টেরি রবার্টস

টেরি রবার্টসের রৌদ্রজ্জ্বল ঘরে ঢুকলেই দুটো জানালার ওপরের দেয়ালে একটি লেখা চোখে পড়বে। বিশাল করে লেখা রয়েছে 'ক্ষমাপ্রাপ্ত'।

এই কক্ষ এবং এই লেখাটি উপহার হিসাবে দেওয়া হয়েছে এক প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে। ওই প্রতিবেশী এক অ্যামিশ পরিবার। এই পরিবার এবং তার পরিবারের মাঝে ঘটে যায় এ অবিশ্বাস্য ঘটনা। তার কিছুদিন বাড়েই এমন উপহার গড়ে দেয় সেই পরিবার। ঘর এবং শব্দটা টেরিকে এক মারাত্মক ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয় প্রতিদিন। গত ১০ বছরে নেই নারী যা খুইয়েছেন এবং যা হাসিল করেছেন তারই প্রমাণ এগুলো।

ছবি : সেই অ্যামিশ স্কুল

তার এই গ্রামের জীবনে নরক নেমে আসে ২০০৬ সালের অক্টোবরে। তার বড় ছেলে চার্লস কার্ল রবার্টস চতুর্থ এক সোমবার সকালে প্রবেশ করলেন অ্যামিশ স্কুলে। তার ৩২ বছর বয়সী ছেলে তিন সন্তানের জনক। স্কুলে ঢুকে তিনি বড়দের এবং সব ছেলেদের বের হয়ে যেতে বললেন। ছোট ছোট ১০টা মেয়েকে বেছে নিলেন যাদের বয়স ৬-১৩ বছরের মধ্যে। এরপর ওই শিশুদের স্রেফ গুলি করে মেরে ফেললেন। তারপর করলেন আত্মহত্যা। ওই ঘটনায় আরো অনেকে আহত হয়।

টেরি রবার্টের স্বামী ভাবলেন, ছেলের এমন নৃশংস পাগলামীর পর তাদের এখানে থাকা হবে না। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন তারা। সবাই তাদের প্রত্যাখ্যান করবেন। তাদের ছেলের মধ্যে যে হিংস্র অশুভ আত্মা লুকিয়ে ছিল, বাবা-মা হয়ে কেন তারা জানবেন না?

কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরো বিস্ময় অপেক্ষায় ছিল। প্রতিবেশী অ্যামিশ পরিবার অপেক্ষায় রয়েছে তাদের মেয়ে বেঁচে রয়েছে কিনা জানার জন্য। এরপর এক অ্যামিশ লোক হেনরি আসলেন তাদের বাড়িতে। বললেন, টেরি এবং তার স্বামীকে ক্ষতিগ্রস্তরা শত্রু হিসাবে দেখেন না। বরং তারা এ দুজনকে এমন বাবা-মা হিসাবেই দেখছেন যারা তার সন্তানকেও হারিয়েছেন। পরে হেনরি টেরির স্বামীর কাঁধে হাত রাখেন এবং তাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে নেন।

এরপরের ঘটনা সত্যিই মানবিকতার ইতিহাস হয়ে থাকবে। খুনীর শেষকৃত্যে উপস্থিত হলেন কমপক্ষে ৩০ জন অ্যামিশ পুরুষ এবং নারী। এদের মধ্যে এমন পরিবারও রয়েছে যাদের মেয়েকে গুলি করেছেন চার্লস কার্ল। সেই মানুষগুলো তাদের পাশেই দাঁড়ালেন যার ছেলে তাদের কন্যাদের খুন করেছেন।

ওই ঘটনার চার সপ্তাহ পর স্থানীয় এক হলে টেরির পরিবারকে দাওয়াত করলেন অ্যামিশ পরিবারগুলো। মেয়ে হারানো এক মা টেরির চোখে চোখ রাখলেন। দুই জোড়া চোখ বেয়ে গড়ালো পানি। ওই নারী বললেন, তারা সবাই শোকে কাতর। তারা সবাই এই অর্থহীন ঘটনার অর্থ বের করার চেষ্টা করছেন।

অ্যামিশ খুনীর পরিবারকে কেবল ক্ষমাই করেছেন তাই নয়, তারা এই পরিবারকে তাদের সমাজে গ্রহণ করে নিলেন। টেরি স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে থাকেনে। ফিরে আসার আগে তার বাড়ি পরিষ্কার করে দেন এক অ্যামিশ মেয়ে। এই মেয়ে টেরির ছেলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত।

টেরি এখন বলেন, একেই বলে ক্ষমা। কোনো সন্দেহ নেই মানুষ ক্ষমা করতে জানে।

এলিজাবেথটাউন কলেজের অ্যামিশ স্টাডিজ প্রফেসর স্টিভেন নোল্ট বলেন, দীর্ঘ আবেগপ্রসূত অবস্থা থেকে ক্ষমাশীলতার উদয় হতে পারে। এখানকার অ্যামিশ পরিবারগুলো সেই অবস্থা থেকেই এই পরিবারকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

তার দশ বছর পর সেই অ্যামিশ পরিবারগুলো প্রতিদিন ক্ষমাশীলতার চর্চা করেন। তবে এ ঘটনা ভোলা সম্ভব নয়। ১৬ বছর বয়সী এক মেয়ে বসে থাকেন হুইলচেয়ারে। সে কোনো কথা বলতে পারেন না। তার পাশে বসা ২৩ বছর বয়সী এ ভদ্রলোক। তার মুখ থেকেও কথা বেরোয় না। এই নয় যে তারা বিললাঙ্গ। এই ঘটনার শোক তারা এখনো বহন করে বেড়াচ্ছেন।

ওই ঘটনায় রোজানা কিন ছিল স্কুলের সবচেয়ে ছোট মেয়ে, বয়স ৬ বছর। আর সবচেয়ে বড় মেয়েটার বয়স ছিল এশ জুনিয়র, বয়স ১৩। দুজনের সঙ্গেই টেরির সম্পর্ক চমৎকার।

ক্ষমাশীলতা : ঘটনার ৯ মাস পর টেরি সব অ্যামিশ পরিবারকে দাওয়াত করলেন তার বাড়িতে। সেখানে সবাই আসলেন, রোজানাও এলো। টেরি তাকে কোলে নিয়ে গান গাইয়ে শোনালেন। আরো কয়েক মাস পর টেরি সব অ্যামিশ নারীদের নিমন্ত্রণ করলেন। এটা এখন তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। টেরি প্রতি বৃহস্পতিবার বিকালে রোজানার কাছে যান। তাকে গোসল করান, খাওয়ান, পড়ে শোনান এবং তাকে ঘুম পাড়িয়ে তবেই বাড়ি ফেরেন। টেরির স্বামী রবার্ট বলেন, ওই বাড়ি থেকে ফিরে আসার পুরো পথটাই টেরি কাঁদতে থাকেন। তার ছেলের সেই কাণ্ডে এই ছোট মেয়েটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

অসুস্থতার জন্য এক বিকালে যেতে পারলেন না টেরি। সেই বিকালে রোজানার চোখ দুটো ছলছল করছিল, জানান রোজানার বাবা কিং।

ক্ষমাশীলতা এতো সহজ নয়। অনেক বাবা-মা মেয়ে হারানোর বেদনায় এখনো কাতর। অনেকে তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সন্তানকে ধীরে ধীরে ভালো হতে দেখেছেন। কিন্তু অনেক কিছুই হারিয়েছেন। তিনি প্রতিদিন তার ক্ষোভের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। প্রতিদিন তিনি ক্ষমা করে দেন।

স্নেহের লেনদেন : গুলির ঘটনার দিন অ্যারোন অন্যান্য ছেলের সঙ্গে খেলছিল। সে ছিল স্কুলের সবচেয়ে বড় শিশু। সে দৌড়েছিল সাহায্যের জন্য। সে অনুতাপে ভুগছিল। কারণ সে ওইদিন মেয়েগুলোকে বাঁচাতে পারে নাই। তবে সবাই মিলে বুঝিয়েছেন যে, ছোট মানুষটির কিছুই করার ছিল না। ধীরে ধীরে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পেরেছে। কিন্তু ওই ঘটনা তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। মানসিকভাবে তার নানা সমস্যা দেখা দেয়। স্থূলকায় হয়ে পড়ে অ্যারোন। হাসপাতালে নিতে হয় তাকে।  

২০০৭ সালে এক পিকনিকে অ্যারোন সম্পর্কে জানতে পারেন টেরি। তখন থেকেই অ্যারোনের প্রতি আলাদা স্নেহ জন্ম নেয় তার মনে। টেরি তাকে ওহিও'তে বেড়াতে নিয়ে যান। সেখানে নিজের সম্পর্কে বলেন। অ্যারোনও তার অভিজ্ঞতা বয়ান করে।

অ্যারোন এখন হ্যান্ডসাম যুবকে পরিণত হয়েছেন। একদিন বললেন, এখনো মনে হয়, এমন ঘটনা কেন ঘটবে? সেখানে নিজেকে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি নিয়ে যাওয়ার অবস্থাই বা কেন সৃষ্টি হবে? আমি জানি না আমার মনে আর শান্তি ফিরে আসবে কি না।

টেরি সম্পর্কে অ্যারোন বলেন, তিনি চান না আমি এতো অশান্তিতে থাকি। বিগত ১০ বছর ধরে তাকে দেখছি। তার ছেলেই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু তাকে কষ্ট দেওয়ার কথা আমার মনে কখনো আসেনি।

নতুন বাস্তবতা : টেরির বয়স এখন ৬৫। ওই ঘরটিতে রোদ পোহান তিনি। তার ছেলের সেই পৈশাচিক ঘটনার ১০ বছর পূর্তি হয়েছে। তার ঘরের দেওয়ালে পূর্ণ তার সন্তান এবং নাতী-নাতনীদের ছবিতে। তার সেই ছেলের ছবিও রয়েছে। তবে এগুলো লুকানো থাকে ড্রয়ারে। অ্যামিশ পরিবারের মানুষগুলো তার আপনের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠেছে। তারা আসলে ছেলের ছবিগুলো লুকিয়ে রাখেন।

সেদিন যে ঘটনা ঘটেছিল তা কখনো ভোলার নয়, বলেন টেরি। তার পরিবারও সেখানে থাকার কথা নয়। একটি কারণেই তিনি বেঁচে রয়েছেন সেখানে। তা হলো, ক্ষমাশীলতা। সূত্র : ওয়ারশিংটন পোস্ট

 


মন্তব্য