kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কীভাবে ৩৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মাকে খুঁজে পেল গোয়েন্দা ছেলে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৮:৩২



কীভাবে ৩৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মাকে খুঁজে পেল গোয়েন্দা ছেলে

গোয়েন্দা হিসেবে তিনি হরহামেশাই গোপন তদন্ত পরিচালনায় অভ্যস্ত। কিন্তু জন ডি সেন্ট জোরের সবচেয়ে বড় অ্যাসাইনমেন্ট ছিল তার মায়ের কী হয়েছে সেটা খুঁজে বের করা।

তার শিশু বয়সেই তার মা নিখোঁজ হন। এখানে তিনি তার গল্পের কিছুটা তুলে ধরেছেন।
১৯৪০ সাল। আমার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। আমার মা কোনো চিহ্ন ছাড়াই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। তার আর কোনো হদিসই পাওয়া যাচ্ছিলো না। ছোট ভাই মরিসকে নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার লন্ডনে বেড়ে উঠি আমি। প্রথমে বৃদ্ধ চিরকুমারীরা আমাদের দেখাশোনা করতেন। এরপর আমাদেরকে একটি ক্যাথলিক বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়। আমার বাবা কাজের সুবাদে বেশিরভাগ সময়ই বাইরে বাইরে থাকতেন।
তিনি কখনোই আমাদের মায়ের ব্যাপারে কথা বলতেন না। এমনকি আমাদের পরিচিত কেউও না। মরিস এবং আমিও আমাদের মায়ের ব্যাপারে কোনো আলোচনা করতাম না। আমি তার নামও জানতাম না। আর তিনি দেখতে কেমন ছিলেন তাও মনে ছিল না আমার। প্রথমদিকে মা ছাড়া থাকাটা তেমন একটা অস্বাভাবিক লাগতো না আমাদের। কারণ সেসময় আমরা আসলে আর কিছুই জানতাম না।

একমাত্র যে শিশুদের বাবা-মা আছে তারা যখন জিজ্ঞেস করত আমাদের মায়ের কী হয়েছে তখন আমরা বলতাম, তিনি মারা গেছেন। যুদ্ধের সময় অনেক মানুষই বোমার আঘাতে মারা যাচ্ছিল। সুতরাং আমাদের কথা তারা সহজেই বিশ্বাস করত। যুদ্ধের পর, আমার বয়স যখন ১২, আমার বাবা পুনরায় বিয়ে করেন।
সকলেই আমার মায়ের কথা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু আমি ভুলিনি। আমার মা নিখোঁজ হওয়ার অনেকদিন পর লন্ডনের কোনো একটি বাড়ির রান্নাঘরে একদিন আমি এক রহস্যময়ী অল্প বয়সী সোনালি চুলওয়ালা ও নীলচোখের এক নারীকে দেখি। পাগলাটে চেহারায় তিনি ধুমপান করছিলেন। আমাকে দেখে তিনি হেসেছিলেন। আমিও হেসেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল তিনিই আমার মা। কিন্তু এরপর আর কখনো আমি ওই নারীর দেখা পাইনি।
আমাদের নতুন সৎ মা এডিথ রসকে যেন ঈশ্বরই আমাদের সকলের কল্যাণের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তিনি মরিস এবং আমাকে ক্যাথলিক বোর্ডিং স্কুল থেকে বের করে নিয়ে আসেন। যেখানে আমরা প্রায় চার বছর ধরে ক্ষুধা, শারীরিক শাস্তি এবং একাকীত্বে ভুগেছি। সেখান থেকে বের করে নিয়ে এসে তিনি আমাদেরকে ভালো অবস্থার দিনের বেলার স্কুলে ভর্তি করেন। তার সব কিছুই ভালো ছিল। তবে তিনিও আমাদের বাবার মতোই আমাদের মায়ের ব্যাপারে নীরব থাকতেন।
আমার বাবা ছিলেন একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। আর আমার সৎ মা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা।
আমার ভাই এবং আমি স্কুলে ভালো করি। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ডিগ্রি নেওয়ার পর আমি দু্ই বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করি। আর আমার ভাই জাতীয় কয়লা বোর্ডের বৃত্তি নিয়ে খনন প্রকৌশলী হয়। এরপর বিয়ে করে কানাডায় চলে যায়।
অক্সফোর্ডে পড়ার সময়ই শেষের বছরগুলোতে আমি ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্সে কাজ করার সুযোগ পাই।
১৯৬৫ সালে আমার বাবা মারা যান। এর আগে এমআই সিক্সের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কিছু তথ্য-উপাত্ত সরবরাহের সুবাদে আমি আমার মায়ের নাম জানতে পারি। সেসময় আমার বয়স হয়েছিল ২৪।
বাবার মৃত্যুর পর আমি মাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ পাই। ইতিমধ্যেই আমি এমআই সিক্স এর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। এমআই সিক্সে কাজ করার সময় আমি বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছি আফ্রিকায়। এমআই সিক্সের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর আমি ছুটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করি। আর ১৯৬০ এর দশকের যুগের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি উপভোগ করছিলাম। ৬০ এর দশকের সামাজিক বিপ্লবগুলোতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছিলাম।
আমার ভাই তার কাজ ও বেড়ে চলা পরিবার নিয়ে পশ্চিম কানাডায় বসবাস করছিল। আমাদের মায়ের কোনো স্মৃতি তার মনে ছিল না। সে ধরেই নিয়েছিল আমাদের মা মারা গেছেন।
কিন্তু আমার ভাইয়ের মতো আমি অতীতকে এতো সহজেই ভুলতে পারিনি। অতীত কখনো আমার পিঁছু ছাড়েনি। আমি আমার মাকে খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখি।
এসময় আমার জন্য বড় সংকট ছিল একটি নিয়মিত চাকরি যোগাড় করা। অবশেষে দৈনিক পত্রিকা দ্য অবজারভারে চাকরি পাই আমি। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংকট বিষয়ে আমি প্রতিবেদন করতাম। এছাড়া নাইজেরিয়া-বায়াফ্রা যুদ্ধ, ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ওপরও রিপোর্টিং করছিলাম আমি। কিন্তু মাকে খুঁজে বের করার বিষয়টি আমি কখনোই ভুলিনি।

মায়ের ব্যাপারে যা কিছু মনে ছিল তা এক জায়গায় জড়ো করতে থাকি আমি। প্রধান পয়েন্টগুলো ছিল আমার ভাইয়ের জন্মের পর আমার মা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। প্রসবের বিণ্নতার কারণে তার ওই মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। মাকে বেশ কয়েকটি মানসিক চিকিৎসালয়ে নেওয়া হয়েছিল। যেগুলো পাগলাটে এবং সহিংস সহচরে পূর্ণ ছিল।
আমার বাবা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে উত্তোরত্তর আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আমার নানী পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটান। তিনি ছিলেন এক ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক নারী যিনি আমার বাবাকে ঘৃনা করতেন। তিনি আমার মা ও বাবার মাঝে আরো ঝগড়া বাধিয়ে দেন। এতে আমার মায়ের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে।
১৯৪০ সালে আমার বাবা-মায়ের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। আমার বাবা আমাকে এবং আমার ভাইকে আমাদের মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে নেন। আমার মা সম্ভবত বিয়ে বিচ্ছেদে রাজি হয়েছিলেন এই কারণে যে, তিনি হয়তো ভেবেছিলেন তাকে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হবে এবং তিনি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে থাকতে পারবেন। কিন্তু আমার বাবার মাথায় ছিল অন্য পরিকল্পনা।
তিনি চুড়ান্তভাবেই বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন। পরবর্তী ৩৫ বছরে তারা আর একত্র হননি। এ সময়টাতে আমার মা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন। তাকে সেখানে বর্বর সব পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হতো। বৈদ্যুতিক শকসহ শারীরিক শাস্তির মতো অদ্ভুত সব বর্বর পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো।
অবশেষে আমি আমার মাকে খুঁজে পাই। ৪০ বছর ধরে তিনি মানসিক হাসপাতালেই কাটিয়েছেন। আমি আমার মায়ের একজন বড় বোনকেও আবিষ্কার করি। একমাত্র তার ওই বড় বোনই আমার মায়ের বিপদের সময় সার্বক্ষণিকভাবে তাঁর পাশে ছিলেন। আমার খালা জানতেন আমি বেঁচে আছি। এবং এও জানতেন আমি দ্য অবজারভারে কাজ করছি। কিন্তু তিনি কোনোদিন আমার সঙ্গে যোগযোগ করার সাহস পাননি। কারণ তার ভয় ছিল আমি হয়তো এতে অসন্তুষ্ট হতে পারি। তবে মা ও খালাকে খুঁজে পাওয়ার পর আমি বুঝতে পারি আমার খালা খুবই ভালো একজন মানুষ।
মাকে খুঁজে পাওয়ার পর আরো চার বছর তিনি বেঁচেছিলেন। আমার ৩৯তম জন্মদিনের অল্প কিছুদিন পরই আমার মা মারা যান। মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছিল। মানব জীবনের সবচেয়ে গভীর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এক সম্পর্ক এই মা ও সন্তানের সম্পর্ক।
মার সঙ্গে সাক্ষাতের ছয় সপ্তাহ পর আমার মনে হচ্ছিল ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। যখন তিনি আমাকে বলছিলেন: “আমি তোমাকে চিনি না। কে তুমি? তোমার নাম কী? মার সঙ্গে তিন-চারবার সাক্ষাতের পর আমি লন্ডন ছেড়ে স্পেনে যাই একটি বইয়ের কাজে। কিছুদিন পর যখন আমি ফিরে আসি আমি মায়ের কাছ থেকে প্রথম লেখা চিঠিটি পাই।
সুন্দর ওই চিঠিটির আলাদা একটি লাইনে তিনটি শব্দ লিখেছিলেন আমার মা: ‘প্রিয় শিশুটি আমার’। অবশেষে আমি আমার মাকে খুঁজে পেয়েছি। আর তিনিও আমাকে চিনতে পেরেছেন।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ


মন্তব্য