kalerkantho


দরিদ্র নারীদের সামাজিক জীবন ধ্বংস করে দেয় ফিস্টুলা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৭:৫৮



দরিদ্র নারীদের সামাজিক জীবন ধ্বংস করে দেয় ফিস্টুলা

যখন বয়স মাত্র চৌদ্দ, বিয়ে হয় কুলসুম বেগমের (প্রকৃত নাম নয়)। এখন তার বয়স চল্লিশ।

তিন সন্তানের জননী। প্রথম সন্তানের জন্মদানকালে তিনি ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন।
দরিদ্র ও নিরক্ষর কুলসুম ফিস্টুলা রোগের করুণ পরিণতি সম্পর্কে জানতেন না। গর্ভকালীন সময়েও তিনি পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাননি। সুষম খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। তার রোগাক্রান্ত হওয়ার এটাই ছিল কারণ।
ফেস্টুলার কারণে কুলসুমের শারীরিক বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। তার স্বামী রুক্ষ ব্যবহার করতে থাকেন। স্বামীর চরম অবহেলার কারণে পারিবারিক জীবন থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এখন তিনি সমাজ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন।
অপর দরিদ্র নারী জরিনা (প্রকৃত নাম নয়) একই রকম দুর্ভাগ্যের কবলে পড়েন ফিস্টুলার কারণে। কুলসুম ও জরিনা দু’জনেরই বিয়ে হয় বাল্য বয়সে। কিশোরী বয়সে যখন সমবয়সী বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে সময় কাটানোর কথা, তারা সেই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো- অপরিণত বয়সে তাদের বিয়ে দেয়া হয়েছিল।
কুলসুম ও জরিনার মতো এদেশে হাজার হাজার কিশোরীকে অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে দেয়া হয়। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের কারণে তারা ফিস্টুলা রোগে আক্রান্ত হন। তারা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত।
‘সেভ দ্যা চিলড্রেনের’ ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. ইশতিয়াক মান্নান জানান, অদক্ষ দাই দিয়ে নিরাপত্তাহীন প্রসব ও দীর্ঘসময়ের প্রসব জটিলতা থেকে ফেস্টুলা রোগের উদ্ভব ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরিদ্র নারীরা এই রোগের প্রধান শিকার। কারণ তারা গর্ভকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পান না। আনাড়ি দাইদের দিয়ে বাড়িতেই তাদের সন্তান প্রসব করানো হয়।
ডা. ইশতিয়াক বলেন, যারা ফিস্টুলা রোগে আক্রান্ত হন, তারা জটিল মূত্ররোগে ভোগেন। কেউ কেউ মল নিয়ন্ত্রণেও অপারগ হন। এ কারণে তাদের কপালে নেমে আসে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, তালাক, পরিত্যক্ত হওয়া এমনকি দুর্ব্যবহারও।  
তিনি বলেন, ফিস্টুলা আক্রান্তদের যোনী থেকে অনিয়ন্ত্রিত মূত্র ঝরতে থাকে। শিশু জন্মদানের নির্দিষ্ট পথের সাথে মূত্রনালি ও মলদ্বারের সংযোগ ঘটার কারণে এই দুরাবস্থার সৃষ্টি হয়।
“ফিস্টুলা আক্রান্তরা স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হবে অথবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে”- এটা সচরাচর ঘটনা। বললেন ডা. ইশতিয়াক। তিনি জানান, ফিস্টুলা আক্রান্তদের মূত্রত্যাগে কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যখন তখন তারা মূত্রত্যাগ করেন। এর ফলে তাদের শরীরেও দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়।
হেলথ সার্ভিসেসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমাদের দেশে ঠিক কতজন ফিস্টুলায় আক্রান্ত তার প্রকৃত তথ্য নেই। তবে ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ নারী এই রোগে আক্রান্ত।  
তিনি জানান, দেশের সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে দশটি ফিস্টুলা কেন্দ্র খোলা হবে। অপারেশনের মাধ্যমে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ করার জন্য এই কেন্দ্রগুলো কাজ করবে।  
অধ্যাপক আজাদ বলেন, শিশু জন্মকালে জটিলতার কারণে সৃষ্ট ফিস্টুলা হচ্ছে দুর্ভাগ্যজনক গুরুতর রোগ। শিশু জন্মকালে ‘বাথ ক্যানেলের’ সাথে ব্লাডার অথবা ‘রেকটমের’ সংযোগ ঘটে যায়। ধাত্রীর আনাড়িপনা এজন্য দায়ী। বারো ঘন্টারও বেশী সময় যদি সন্তান আটকে থাকে, তাহলে যোনীর নরম যোনি দেওয়াল ও হাড়ের ওপর চাপ পড়ে। এর ফলে যে চাপের সৃষ্টি হয়, তা থেকে মূত্রনালী অথবা মলদ্বার বা উভয়ের সাথে সন্তানের প্রসবপথের সংযোগ ঘটে যায়। এতে দীর্ঘস্থায়ী রোগের সৃষ্টি হয় এবং পুষে রাখলে এটি ক্রনিক হয়ে যায়।
তিনি জানান, দেশজুড়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই রোগের হার তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কমছে। তিনি বলেন, আক্রান্ত ভুক্তভোগী ও পরিবারের সদস্য-যারা এ রোগ গোপন রেখেছেন এতদিন, তাদের সাথে কথা বলে ফিস্টুলা রোগীদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা হবে। এটা নিরাময়যোগ্য ব্যাধি। এই রোগে যারা আক্রান্ত, তাদের সুচিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করা ও রোগ প্রতিরোধে সব রকম চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হবে। - বাসস।


মন্তব্য