kalerkantho


স্বামীর সঙ্গ পেতে বৃদ্ধা পুকুরে গা ডুবিয়ে ১৫ বছর!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১১:০১



স্বামীর সঙ্গ পেতে বৃদ্ধা পুকুরে গা ডুবিয়ে ১৫ বছর!

প্রতিবেশীরা নাম দিয়েছেন 'ডুবুরি বুড়ি'। খুদেরা ডাকে 'জলহস্তি'। কাটোয়ার গোয়াই গ্রামের বছর ষাটেকের বৃদ্ধা পাতুরানী ঘোষের এহেন নামকরণ সার্থকই। কারণ শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বছরভরই পাতুরানীর দিনরাতের আশ্রয় বাড়ির লাগোয়া পুকুর। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সেই পুকুরে গা ডুবিয়ে বসে থাকেন পাতুরানী। শুধু জলহস্তির মতো মাথাটি থাকে জলের ওপরে।  

এক-আধ দিন নয়, টানা ২০ বছর ধরে এমনই অদ্ভুত রুটিন পাতুরানীর। এ রকম টানা পানির বুকে ঘর বাঁধার জন্য নিউমোনিয়ার মতো ভারী অসুখ দূরের কথা, বুড়িকে হাঁচতে বা কাশতে পর্যন্ত দেখেননি কেউ। জানালেন বাড়ির লোকজন। প্রথম প্রথম পাতুরানীকে দেখতে পুকুরপাড়ে আট থেকে আশির রথের মেলা বসত। এখন গ্রামের বাসিন্দাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। যাতায়াতের পথে বুড়িকে দেখে একবার বড়জোর থমকে দাঁড়ান। তারপর অল্প হেসে যে যার নিজের কাজে চলে যান।  

পাতুরানীর বাড়ি মুর্শিদাবাদের সালারে। সংসার ছিল ভারি আনন্দের। ১৫ বছর আগে আচমকা স্বামীর মৃত্যু হয়। তারপর থেকে পাতুরানী কেমন যেন হয়ে যান। সব সময় থম মেরে বসে থাকতেন। স্বামীর স্মৃতি যাতে বেশি তাড়া না করে তার জন্য পাতুরানীকে নিজের গোয়াই গ্রামের বাড়িতে এনে রাখেন তাঁর মেয়ে মিঠু ঘোষ।

মিঠুর কথায়, "একদিন মা হঠাৎ বলে উঠল, তোর শ্বশুর বাড়ির পাশের নিশিপুকুরে একদিন তোর বাবাকে দেখলাম। যাই একটু খুঁজে নিয়ে আসি। বলেই প্রায় ছুটতে ছুটতে সেই যে পুকুরের পানিতে ঘাঁটি গাড়ল, আর মাকে পুকুর থেকে তোলে কার সাধ্য! কতবার বলেছি, শরীর খারাপ হবে। কথা শোনে কই! দেড়-দুই দিন বাদে একবার উঠে আসে। কোনোরকমে দু’-চার গ্রাস ভাত মুখে দিয়ে আবার এক দৌড়ে গিয়ে পানিতে নামে। "

গ্রামের বাসিন্দা বংশী ঘোষ, পুতুল ঘোষরা বলছিলেন, রাতেও বুড়িকে ওইভাবে একগলা পানিতে ডুবে থাকতে দেখে প্রথম প্রথম ভূতের ভয়ে আঁতকে উঠত গ্রামের বাসিন্দারা। এখন সব জানাজানি হয়ে যাওয়ায় আর সে ভয় নেই। তবে এইভাবে দিনের পর দিন গা ডুবিয়ে থাকাটাই আশ্চর্যের। কাটোয়ার ঐতিহ্য ও ইতিহাস নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে রণদেব মুখোপাধ্যায়ের। তিনি বললেন, ভাতারের কয়রাপুরে দেবী মা, কাটোয়ার করুই ও গোপালপুরে বুড়োশিব বা মঙ্গলকোটের ক্ষীরগ্রামের দেবী যোগাদ্যার প্রস্তরমূর্তি বছরভর পানিতে চোবানো থাকে। পূজার জন্য নির্দিষ্ট দিনে মূর্তি তোলা হয়। আবার পুজো হয়ে গেলে নির্দিষ্ট দিঘি বা পুকুরে রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু একজন মানুষ বছরের পর বছর এভাবে পানির আশ্রয়ে রয়েছেন, কল্পনা করতেও কেমন লাগে!‌ 

কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসক তাপস সরকার বলছিলেন, "ওঁর চিকিৎসার দরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। পরিবারের লোকজন যদি রাজি থাকেন, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে পারি। তাহলে হয়ত রোগটা ধরা পড়বে। "

এত কথাবার্তা অবশ্য পাতুরানীর কানে পৌঁছায় না। মাঝপুকুরে ঠাঁই নেওয়া বুড়িকে পাড় থেকে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করি, "খিদে পায় না? উঠবে কখন?" ভিজে গলায় বুড়ি জবাব দেয়, "খিদে নেই বাপ। শরীরে বড্ড জ্বলুনি। আজ আর উঠব না। "

তারপর পানকৌড়ির মতো টুক করে ডুব দেন। জ্বলুনির নিরাময়ে, নাকি স্বামীকে খুঁজতে, তা জানা হয় না। ডুবুরি বুড়ির জল ভাঙার ক্ষীণ স্রোত এসে ঘাটের গায়ে লাগে। ‌ পাতুরানী ওরফে 'ডুবুরি বুড়ি'।
সূত্র : আজকাল


মন্তব্য