kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সত্য পরবর্তী পৃথিবী: হ্যাঁ আমি তোমার সঙ্গে মিথ্যা বলবো

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৫:৪৬



সত্য পরবর্তী পৃথিবী: হ্যাঁ আমি তোমার সঙ্গে মিথ্যা বলবো

রাজনীতিতে মিথ্যা বলা নতুন নয়। কিন্তু কিছু কিছু রাজনীতিবিদ এখন যেভাবে মিথ্যা বলছেন আর এর ফলে যে ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে তা খুবই উদ্বেগজনক।


যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেশটির রিপাবালিকান দলীয় প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বলেন, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা “ইসলামিক স্টেটের প্রতিষ্ঠাতা” আর ডেমোক্রেট দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন জঙ্গি সংগঠনটির “সহপ্রতিষ্ঠাতা” তখন ট্রাম্পের সমর্থকরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।
ট্রাম্প নিশ্চয় আক্ষরিক অর্থেই কথাটি বলেননি? তিনি সম্ভবত বলতে চেয়েছেন, ওবামা প্রশাসন ইরাক থেকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার করে বেরিয়ে আসার ফলে সেখানে যে শুন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তার ফলেই সন্ত্রাসীদের উৎপত্তি হয়েছে? এমনটাই ধারণা কনজারভেটিভ দলের রেডিও হোস্ট হিউ হিউইট এর।
“না, আমি সত্যিই বলেছি ওবামাই আইএস এর প্রতিষ্ঠাতা”, জবাবে বলেন ট্রাম্প। “তিনিই সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়। আমি তাকে সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়ের অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছি। হিলারিকেও আমি অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছি। ”
মি. হিউইট ওবামা এবং হিলারিকে পছন্দ করেন না। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য হিলারির মধ্যে যে মহাকাব্যিক উচ্চাশা কাজ করেছে তার প্রতি কটাক্ষ করেও তিনি একটি বই লিখেছেন।
মি. ট্রাম্প পুনরায় বলেন, “আমি কোনো পরোয়া করি না। ওবামাই আইএস এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি যেভাবে ইরাক থেকে বেরিয়ে এসেছেন তাতেই আইএসআইএস এর প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ঠিক আছে?”
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এ ঘটনা থেকেই প্রমাণিত হয়, বিশ্ব এখন “সত্য-পরবর্তী রাজনীতির” যুগে প্রবেশ করেছে। মি. ট্রাম্প তার কথার সঙ্গে বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল আছে কি নেই তা নিয়ে ততক্ষণ কোনো পরোয়া করেন না। যতক্ষণ তার ওই কথা তার পক্ষের ভোটারদের উদ্দিপীত রাখছে।
ট্রাম্পই একমাত্র সত্য-পরবর্তী যুগের রাজনীতিবিদ নন। গত জুনে ব্রিটিশরাও পুরোপুরি মিথ্যা তথ্যের প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর একটি ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার জন্য তাদের দেশকে সপ্তাহে ৪৭০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয় যা হয়তো তাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় করা যেতো। আর তুরস্ক ২০২০ সালের মধ্যেই হয়তো ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেবে।
আসলে সত্যি বলতে কি রাজনীতি কখনোই সত্যের সমার্থক ছিলো না। অতীতের রাজ-রাজড়ারাও খবু কমই সত্য বলতেন। ম্যাকিয়াভেলি তার রাজনীতি সম্পর্কিত বিখ্যাত বইগুলোতে এ সম্পর্কে বলেছেন।
টঙ্কিন উপসাগরের ঘটনা সম্পর্কে আমেরিকার জনগনকে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন লিন্ডন জনসন। আর তাতেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সুচনা হয়।
বিশ্বের আর যে কোনো স্থানের চেয়ে আমেরিকার রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো মিথ্যাচার অনেক বেশি সহ্য করা হচ্ছে। আর নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করে জনগনের কাছে এখন বাস্তব ঘটনা পুরোপুরি বিকৃত করে উপস্থাপন করাও সম্ভব হচ্ছে অনায়াসেই। অনেক রাজনীতিবিদই মিথ্যার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাচ্ছেন। এটা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে সামাজিক সমস্যার সমাধানে হাতিয়ার হিসেবে সত্যের যে ক্ষমতা ছিল তা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
রাজনৈতিক মিথ্যা ব্যবহৃত হয় এজন্য যে, সত্যটি যেন বেরিয়ে আসতে না পারে। এখন অসংখ্য রাজনীতিবিদ এবং পণ্ডিতরাও আর পরোয়া করেন না। তারা এখন আমেরিকান কমেডিয়ান স্টিফেন কোলবার্ট এর “সত্য হওয়ার অনুভুতি” নিয়েই সন্তুষ্ট। অর্থাৎ কোনো বিষয় সত্য বলে অনুভুত হলে বা সত্য হওয়া উচিৎ মনে হলেই তা সত্য বলে ধরে নিতে হবে। এমনকি এরা নিজেদের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছুর সত্যতার চেয়ে বরং এর প্রামাণিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন বেশি।
চিন্তা করার এই ধরনটি নতুন নয়। ১৯ শতকের শুরুতে আমেরিকায় কথিত “ব্যাভারিয়ান ইলুমিনাতি”দের ধ্বংসাত্মক তৎপরতার বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে দেখা যায়। আর ১৯৫০ এর দশকে সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থিকে অ-আমেরিকান তৎপরতার বিরুদ্ধে ডাইনী খোঁজার কর্মাকাণ্ডে লিপ্ত হতে দেখা যায়। ১৯৬৪ সালে রিচার্ড হফস্ট্যাডটার “দ্য প্যারানয়েড স্টাইল ইন আমেরিকান পলিটিক্স” নামের বইটি প্রকাশ করেন। এতে রাজনীতিতে মনোবিকারের মাত্রা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
জর্জ বুশ যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন বামপন্থীদের মধ্যে একটি উটকো বিশ্বাস ছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে চালানো সন্ত্রাসী হামলা ছিল বুশ প্রশাসনের একটি সাজানো নাটক। আরব বিশ্বে এটি আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হত।
পোস্ট ট্রুথ বা সত্য-পরবর্তী রাজনীতি বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইউরোপে এর সেরা উদারহণ পোল্যান্ডের উগ্র জাতীয়তাবাদি শাসক দল, ল অ্যান্ড জস্টিস পার্টি (পিআইএস)। এই দলটি বিচিত্র সব মিথ্যা গল্পের পাশাপাশি একটি রসালো গল্প ছড়ায় যে, পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট যুগ পরবর্তী শাসকরা কমিউনিস্টদের সঙ্গে মিলেই দেশ শাসনের ষড়যন্ত্র করছে।
তুরস্কে ২০১৩ সালে গেজি পার্কে বিক্ষোভ এবং সাম্প্রতিক সেনা অভ্যুত্থানচেষ্টার পর দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জাল বুনতে থাকেন। গেজি পার্কের বিক্ষোভ নাকি জার্মান বিমান কম্পানি লুফথানসার অর্থায়নে সংঘটিত হয়েছে। কারণ তুরস্ক পার্কটি উচ্ছেদ করে সেখানে বিমান বন্দর বানালে নাকি জার্মানির বিমান পরিবহন ব্যবসায় ক্ষতি হবে। আর তুরস্কের সাম্প্রতিক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানচেষ্টার পেছনে নাকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর মদদ রয়েছে।
এরপরে আছে রাশিয়া। পররাষ্ট্রনীতি এবং আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে দেশটি অনেক আগেই সত্য-পরবর্তী যুগে প্রবেশ করেছে। ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ব্যাপক মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছে। এমনকি ইউক্রেনে রশিয়ার সেনাদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রকাশ্যেই ইউক্রেনে কোনো রাশিয়ান সৈন্যের উপস্থিতি থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
আসলে সত্যি বলতে কি মানুষ স্বভাবগতভাবেই সত্য অনুসন্ধান করে না। প্রচুর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে মানুষ সত্যকে বরং এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই দেখায় বেশি। লোকে প্রবৃত্তিগতভাবেই তাদের সামনে যে তথ্য পায় তাই গ্রহণ করে নেয়। তারা ভাবে যে পরিচিত তথ্য মানেই সত্য। আর লোকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গীর সমর্থনে বাছাই করে তথ্য গ্রহণ করে। এছাড়া মানুষদের মধ্যে এমন একটি প্রবণতা রয়েছে যার ফলে তারা তাদের মস্তিষ্ককে কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য করে এমন সত্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
আর রাজনীতিতে কোনো বিষয়ে লোকে কখনো একমত হলে তা সত্যিই বিস্ময়কর। তবে অনেক সমাজেই সত্য কী সে ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। যেমন বিদ্যালয়, বিজ্ঞান, আইন-কানুন ও গণমাধ্যম। এই সত্য উৎপাদনকারী অবকাঠামো কখনোই পুরোপুরি নিঁখুত হতে না পারলেও এমন বিষয়কেও সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে বিষয়ে সামান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে বা একেবারেই কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। তবে এই অবকাঠামো সবসময়ই সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। আর এই অবকাঠামো গড়ে তুলতে অনেক সময় লাগলেও ভেঙ্গে পড়তে পারে দ্রুত।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট


মন্তব্য