kalerkantho


একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের খুশির ঈদ

অসীম মন্ডল, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৫:০৭



একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের খুশির  ঈদ

এমন সুসময় জীবনে আগে আর তাদের জীবনে কখনোই আসেনি। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর স্বাধীন দেশের মাটিতে এ বছরই প্রথম উচ্ছ্বসিত আর স্বস্তির আনন্দে ঈদ পালন করতে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের বেঁচে থাকা ১৮ প্রৌঢ়া নারী। তাদের যৌবনের প্রারম্ভে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনী আর রাজাকার আলবদরের লালসার শিকার হয়ে সম্ভ্রম হারান। এরপর সেই পুরনো গল্প। স্বামী-সংসার পরিবার-পরিজন এমন কি সমাজ থেকে বিতাড়িত।

অভাব-অনটন আর লাঞ্ছনা ছিল তাদের চিরসঙ্গী। কেউ কেউ পরিবারের সাথে বসবাসের সুযোগ পেয়েও থেকেছেন অবাঞ্চিতের মতো পরিবারের উটকো বোঝা হিসেবে। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধে তারা নিগৃহীত হলেও রাষ্ট্র গত ৪৫ বছর তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিল। যেন সম্ভ্রম হারানোর দায়ভার এসব নারীদেরই। জীবন সায়াহ্নে এসে সিরাজগঞ্জের ১৮ বীরাঙ্গনা এবং মরণোত্তর ২ বীরাঙ্গনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেছে। পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। এসব মায়েরা এখন উচ্ছ্বসিত।

প্রথম দফায় ১৩ জন বীরমাতাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই ঘোষণায় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মায়েরা খুশি হলেও তাদের মধ্যে ছিল অতৃপ্তি। কারণ মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানোর পর চরম দুর্দশাগ্রস্ত এইসব মায়েরা ঠাঁই পেয়েছিলেন তৎকালীন নারী কল্যাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। জীবনের চরম মুহূর্তে তারা এক সঙ্গে থাকলেও এদের মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যে মারা গেছেন। বর্তমানে তারা বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে বসবাস কররেও তাদের মধ্যে রয়েছে আত্মিক বন্ধন। তাই জীবিত ১৮ জনের মধ্যে পাঁচজনের স্বীকৃতি না মেলায় অতৃপ্ততা ছিল সকল বীরমাতাদের মধ্যে।

কিন্তু গত মাসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রাণালয়ের গেজেটে বাদপড়া পাঁচজন বীরঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় এখন তাঁরা সকলেই আনন্দিত। তাঁদের কাছে এবারের ঈদের আনন্দ রূপ পেয়েছে জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ হিসেবে। এই জন্য তাঁরা কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তাঁরা এখন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার প্রত্যাশায় রয়েছেন।

কালিয়া হরিপুরের বীরাঙ্গনা রাজুবালা জানান, "সম্ভ্রম হারানোর পর দীর্ঘদিন স্বামী-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও পরবর্তীতে সংসার শুরু করি। কিন্তু ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার পর তার স্বামীকে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর কত কষ্টেই না চলেছে জীবন। অবশেষে ঈশ্বর হয়ত মুখ তুলে চেয়েছে। গত ৪৫ বছর আামদের কত দীর্ঘ সফর ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। "

বীরাঙ্গনা রাহিলা বেগম জানান, দীর্ঘসময় সমাজের মানুষের অনেক লাঞ্ছনা, গঞ্জনা শুনতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া ভয়ংকর সেই ঘটনার কারণে। সমাজের অধিকাংশ মানুষ তাদের দেখেছে বাঁকা চোখে। তাদের সন্তানদেরও পথে শুনতে নানা কটু কথা। কিন্তু বীরাঙ্গানা মুক্তিযোদ্ধার গেজেটে নাম প্রকাশের পর কিছুটা হলেও সে চিত্র বদলেছে। তবে ঈদের আগে এমন সংবাদে তারা অনেক খুশি। বিগত দিনের ঈদগুলোর সাথে এ ঈদের কোনো তুলনা হয় না।

বীরাঙ্গনা নূরজাহান বেগম জানান, খেয়ে না খেয়ে প্রায় সমস্ত জীবন পার করলেও এবার ঈদ অনেক শান্তির, অনেক স্বস্তির। কেননা এবার ঈদের আগে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মিলেছে। এখন সমাজে তাদের সন্তানেরা মাথা উচু করে বলতে পারবে আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। ঈদের আগে এটা আমাদের অনেক বড় পাওয়া।

রেললাইনের ধারে বাস করা বীরাঙ্গনা হাজেরা বেগম জানান, রাতে শব্দ করে যখন ঘরের পাশ দিয়ে ট্রেন যায়, তখন ঘুম ভেঙ্গে যায়। বিছানায় উঠে বসে ঘুম ঘুম চোখে ভেসে উঠে ভয়াল সে দিনের কথা। তারপরের চিত্র আরো ভয়াবহ। সমাজের মানুষ তাদের অস্পৃর্শই ভেবেছে। তবে বর্তমান সরাকার তাদের যে সম্মানের স্থান দিয়েছে, তাতে আর কোথ্ওা মাথা নিচু করে কথা বলতে হবেনা।

কালিয়া হরিপুরের করিমন বেওয়া জানান, আর কোন দুঃখ নেই। এবার মরল্ওে শান্তি। জীবনে অনেক পাওয়া না পাওয়া নিয়ে কষ্ট থাকলেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলায় আর কোন কষ্ট মনের মাঝে নেই।

বীরাঙ্গনা আয়েশা বেগম জানান, অনেক কষ্টের পর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মিলেছে। কিন্তু আমরা এ স্বীকৃতির সনদ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিয়ে এ সম্মান পাওয়ার পূর্ণতা পেতে চাই।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গাজী শফিকুল ইসলাম শফি জানান, সিরাজগঞ্জের ২০ বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে সিরাজগঞ্জসহ দেশের সব মুক্তিযোদ্ধারা অনেক খুশি। সমাজে অনেক যন্ত্রণা, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ওঁরা সহ্য করেছেন। এখন অন্তত জীবনের বাকি দিনগুলো নিশ্চিন্তে পার করতে পারবেন।


মন্তব্য