kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মৃত শিশু-মিছিলের প্রতিনিধি সেই আইলান আর আমাদের অবহেলা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৮:০৮



মৃত শিশু-মিছিলের প্রতিনিধি সেই আইলান আর আমাদের অবহেলা

আইলান কুর্দির কথা মনে আছে? তুরস্কের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রের সামনে সমুদ্রের পারে তিন বছরের ফুটফুটে আইলানের সেই মৃতদেহের ছবিটির কথা মনে আছে? লাল জামা আর নীল রঙের প্যান্ট পরা আইলান সিরিয়া ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এসেছিল। তার মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে।

 

সিরিয়ার এক কুর্দিশ রিফ্যুজি পরিবারটি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপমুখী হয়েছিল জীবন বাঁচানোর তাগিদে। যখন তার ছোট্ট দেহটিতে আছড়ে পড়সে ফেনিল সমুদ্র, যখন এই ছবিটি বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশ পাচ্ছে, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও থেমে গিয়েছিল বর্ণবাদী রাজনীতিবিদদের গলাবাজি।

আইলানের ছবিটি আমাদের সেই শিক্ষা দেয়, বিপন্নদের বিষয়ে আমরা যা এড়িয়ে চলেছি। শিশুটি এমন হাজারো আইলানের প্রতিনিধি যারা সমুদ্রের পাড়ে পড়ে থাকে। যাদের খবর আমরা জানি না। যাদের ছবি মিডিয়ায় আসে না। আইলান একটা প্রতীকী চিত্র মাত্র। সম্ভবত এমন অসংখ্য মৃত শিশুর মিছিলের প্রতিনিধি।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা বেইমানী কিংবা সমুদ্রের প্রাণঘাতী ঢেউ এই শিশুটিকে শহীদ করেছে। মানব জাতির ভীতিকর পরিস্থিতির প্রতীক হয়ে উঠেছে এই সিরিয়ান কুর্দির পরিবারের শিশুটি।   এই শরণার্থীরা খুব দ্রুত আমাদের কাছে ভীতিকর হয়ে উঠেছে, বিংশ আর একবিংশ শতকের গলগ্রহ হয়ে উঠেছে।    

কোনো শরণার্থী পরিবারের অনন্য গল্প আমরা পড়তে পারি। নড়বড়ে নৌকায় করে এমনই একটি পরিবার কয়েক শত মাইল পাড়ি দিতে বেরিয়ে পড়ে। অ্যানাটোলিয়ান উপকূল থেকে বেরিয়ে পড়া পরিবারের একটি ছেলে তুলে ধরেছে তাদের কাহিনী। তারা পেছনে লাশের স্তূপ আর মাটি ছেড়ে কিভাবে খোলা সাগরে বেরিয়ে পড়েছিল। অবশেষে তারা তুরস্কে পৌঁছে।

প্রাচীন নথিতে রিফ্যুজিরা অভিবাসী নয়। ল্যাটিন ভাষায় রিফ্যুজি মানে পলাতক কেউ। আর এ শব্দের মাধ্যমে কোনো অপরাধীকেই বোঝায় । এ বিষয়টিই ডোনাল্ড ট্রাম্প তুলে ধরেছেন ম্যাক্সিকানদের প্রসঙ্গে।

প্রাচীনকাল থেকে এমনই চলে আসছে। ট্রয় পোড়ানো থেকে শুরু করে সিরিয়ার গ্রেট মস্ক এবং বিভিন্ন শহরের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। প্রাচীনকালের ট্রোজান এবং এ যুগের সিরিয়ার মানুষরা একই অভিজ্ঞতা লাভ করছেন। এমন ট্র্যাজেডির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে চিন্তার সময় এসেছে। অতীতের ইতিহাস নয়, ভবিষ্যতের ইতিহাস কেমন হতে পারে? ইন্টারনেটের এই যুগে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

মধ্যপ্রাচ্যের ট্র্যাজেডি প্রাচীনকালের অনেক ইতিহাসকে  তুলে ধরে। মুসলমান এবং খ্রিষ্টানদের মসজিদ ও চার্চ ত্যাগ করতে হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের ত্যাগ করতে হয়েছে।

আরব স্বৈরাচারদের নিষ্ঠুরতা এবং দুর্নীতি নিরাপত্তা পেয়েছে অর্থ ও অস্ত্রের মাধ্যমে। ইসলাম কারিমভ, নুরসুলতাম নাজারবায়েভ, ইমোমালি রাখমন এবং আরো অনেকের অবস্থান ইতিহাস গড়ে তুলছে। উজবেকিস্তানরে নৃশংস কারিমভ। তার বাহিনী অত্যাচারে বিশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা শত্রুদের জীবন্ত সেদ্ধ করতো।

তাজিকিস্তানে ১৯৯০-এর দশকের গৃহযুদ্ধে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। রাখমোন হাজার হাজার মানুষ আইএসআইস-এ যোগ দেয়। সেখানে ছিলেন তাজিক পুলিশ কমান্ডার গুলমুরাদ খালিমভ। তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন আমেরিকায়। কাজাখস্তানের নাজারবায়েভেরের টর্চার চেম্বার কারিমভের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।

এসব ঘটনা এক সময় বিস্ফোরণ ঘটাবে। তখন আবার শরণার্থীরা ছুটবে বিভিন্ন দেশে। উজবেকিস্তানের ৩০ মিলিয়ন জনসংখ্যা সিরিয়ার চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি। এক সময় সেখানকার জনগণ রিফ্যুজি হয়ে ছুটবে। তারা মিশে যাবে আফগান, সিরিয়ান এবং আরবদের সঙ্গে। তাই এখন কি করা উচিত?

আবারো অনেক বেশি দেরি হয়ে যাবে। তখন আমরা সমুদ্রের পারে পড়ে থাকা কোনো শিশুর নাম জানতে চাইবো মিডিয়ার কাছে। আবারো নতুন করে কোনো শহর-দেশ পুড়তে থাকবে। এক সময় ট্রয় পুড়েছিল, আজ পুড়তে আলেপ্পো। সূত্র : ইনডিপেনডেন্ট

 


মন্তব্য