kalerkantho

৪ চালের পান্তা ভাতে বেশি পুষ্টি বৈশাখে!

শওকত আলী    

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ১২:৩০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৪ চালের পান্তা ভাতে বেশি পুষ্টি বৈশাখে!

চালের পার্থক্য যেমন ভাতের স্বাদে ভিন্নতা আনে, তেমনি পুষ্টিমানের পার্থক্যও ঘটায়। তবে চার জাতের ধানের চাল থেকে তৈরি সাধারণ ভাতের তুলনায় পান্তা ভাতে পুষ্টিমান আরো বেশি। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র পাওয়া গেছে। বিআর ২৮, পারি, মিনিকেট (বাজারে প্রচলিত নাম) ও আমন (পাইজাম ধানের চাল)—এই চার জাতের চালের সাধারণ ভাত ও পান্তা ভাত নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে দেখা গেছে, পান্তা ভাতে ক্যালসিয়াম ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় দেখা গেছে, বিআর-২৮ চালের সাধারণ ভাতের চেয়ে পান্তা ভাতে ৩৩ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম ও ৫৫.৮৩ গুণ বেশি আয়রন পাওয়া যায়। এ চালের সাধারণ ভাতেও ক্যালসিয়াম ও আয়রনের পরিমাণ এমনিতেই বেশি।

মানুষের কাছে জনপ্রিয় একটি চাল হলো মিনিকেট। এ চালের ভাতে ক্যালসিয়াম ও আয়রনের পরিমাণ অন্য যেকোনো চালের ভাতের চেয়ে অনেক কম। তবে মিনিকেট চালের ভাত থেকে যদি পান্তা ভাত তৈরি করা হয় তাহলে তাতে পুষ্টিমান অনেক গুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণার তথ্যানুযায়ী, মিনিকেট চালের পান্তা ভাতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায় ৩৫১.৯৪ শতাংশ এবং আয়রনের পরিমাণ বাড়ে ১১.৬৬ শতাংশ।

এ ছাড়া পারি চালের পান্তা ভাতে ক্যালসিয়াম ৭২.৪৯ শতাংশ এবং আয়রন ৪.৩৫ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। আমন চালের পান্তা ভাতেও সাধারণ ভাতের চেয়ে ৮.১১ শতাংশ বেশি ক্যালসিয়াম ও ২৯.৩৭ শতাংশ আয়রন বেশি পাওয়া যায়।

শুধু নাজিরশাইল চালের সাধারণ ভাতের চেয়ে পান্তা ভাতে পুষ্টিগুণ কিছুটা কমে যায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ৪.২৫ শতাংশ ও আয়রনের পরিমান ৫.৬৭ শতাংশ কমে যায়। কমে যাওয়ার পরও যে পরিমাণ পুষ্টি পাওয়া যায় তা আমন ও মিনিকেট চালের পান্তা ভাতের চেয়ে বেশি। আর সব ধরনের চালের পান্তাতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পটাসিয়াম ও সোডিয়াম পাওয়া যায়।

পান্তা ভাত সাধারণত আট থেকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে খাওয়া হয়। গাজন প্রক্রিয়ায় ফাইটিক এসিড, ল্যাকটিক এসিড ও উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, যা ভাতের গুণগত মান পরিবর্তন ও বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ গাজন প্রক্রিয়ায় আবদ্ধকৃত অণুপুষ্টিগুলো মুক্ত হয়ে যায় এবং সেগুলো শোষণ করা সহজ হয়। তবে অনিরাপদ পানিতে চার থেকে ১০ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে তৈরি করা প্রায় ৯০ শতাংশ পান্তা ভাতে ফিকাল কলিফর্ম পাওয়া গেছে। সে জন্য ভাত পান্তা করতে নিরাপদ পানি ব্যবহার অপরিহার্য। নির্দিষ্ট সময় ধরে পানি ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করার পর ওই পানি ব্যবহারের মাধ্যমে এ সমস্যা কাটানো যায়।

সংস্থাটির পুষ্টি গবেষণা ইউনিটের পরিচালক ও পুষ্টিবিজ্ঞানী মো. মনিরুল ইসলাম গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গরম ভাতের চেয়ে পান্তা ভাতে পুষ্টিগুণ বেশি। তবে এটি অতিরিক্ত না খেয়ে পরিমিত মাত্রায় খেলে তবেই কাজে দেবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পান্তা তৈরির জন্য নিরাপদ পানির কোনো বিকল্প নেই। নিরাপদ পানির পাশাপাশি একটু বেশি সময় ধরে ভাত পানিতে ভিজিয়ে রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ।’

জানা যায়, ১৭০০ শতাব্দী থেকে ভারতবর্ষের কৃষ্টি, সভ্যতা ও সংসৃ্কতির সঙ্গে পান্তা ভাত জড়িত। যদিও পান্তা ভাত গরিবের খাবার হিসেবেই পরিচিত। তবে এই খাবারটি যেমন দ্রুত হজমযোগ্য তেমনি অধিক পুষ্টিসম্পন্ন। সাধারণ ভাতে উপস্থিত বিভিন্ন খনিজ ও ভিটামিন আবদ্ধ অবস্থায় থাকে, ফলে শরীরে তা ভালোভাবে শোষণ হয় না। গাজনকৃত খাবারে এসব পুষ্টিকণা বন্ধনহীন হয়ে পড়ে বিধায় সহজেই তা মানবদেহে শোষিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সার্বিক পুষ্টি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটলেও বিরাট জনগোষ্ঠী এখনো অপুষ্টিজনিত সমস্যার শিকার। অপুষ্টিজনিত সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো রক্তস্বল্পতা; যা মূলত আয়রনজনিত ঘাটতিকেই বোঝায়। প্রয়োজনীয় ও পরিমাণমতো খাবার, বিশেষ করে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের স্বল্পতায় শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী ও প্রসূতিরা এ সমস্যায় বেশি আক্রান্ত। নারীসহ যারা আয়রন ও ক্যালসিয়াম ঘাটতিতে ভোগে তাদের জন্য উত্তম হলো পরিমিত মাত্রায় ও নিরাপদ পানির মাধ্যম তৈরি করা পান্তা ভাত খাওয়া। আর স্বাদ ও মান বাড়াতে সঙ্গে পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ বেশ উপকারী।

মন্তব্য