kalerkantho


অফিস টয়লেট বিষয়ক একটি গল্প এবং...

আহ্‌সান কবীর   

১২ জুলাই, ২০১৮ ২২:৫৩



অফিস টয়লেট বিষয়ক একটি গল্প এবং...

মান্নান সাহেব অফিসের টয়লেটে গিয়ে কমোডে বসতেই পাশের টয়লেট থেকে প্রায় ফিঁসফিঁস করে কে যেন বললো- ভাই, একটু যদি খুলতেন... খুব উপকার হতো! আমার বেশিক্ষণ লাগবে না। আর সহ্য করতে পারছি না...! অনেকদিন ধরে চেষ্টায় ছিলাম... সুযোগ মেলেনি। আজ একটু খোলেন না ভাই, তেমন কষ্ট দিমু না আপনেরে...আগেও তো এমন দিছেন!

এমন কথাবার্তায় অন্যরকম ইঙ্গিত পেলেন খোদ অফিসের বস মান্নান সাহেব। ঘৃণায় কান লাল হয়ে গেল। খুবই বিরক্ত হলেন।

তবে অফিস বলে কথা। প্রচণ্ড রাগ দমন করে তিনিও ফিঁস ফিঁস করেই বললেন, এসব কী বলছেন এখানে এসে?

অপরপক্ষ: ভাই আমার কথা কিন্তু ক্লিয়ার। এতে কিছুই গোপন নাই। আপনি খুললে ফায়দা আমাগো দুইজনেরই হইবো...

মান্নান: এরজন্য তোর চড়া মূল্য গুণতে হইবোরে বেশরম!

অপরপক্ষ: রেট বেশি চান তো? সমস্যা নাই। চেক বা ক্যাশ, যেভাবেই চান দিমু, পেমেন্ট বিকাশ-রকেটেও দিতে পারি!

মান্নান: খালি বাইর হয়া লই- আইজকা তোর একদিন কি আমার...

অপরপক্ষ: কুনু ঝামেলার সুযোগ নাই- আপনে খালি পাঁচ মিনিটের জন্য খুলবেন। এতেই কাম খালাস কইরা দিমু... এরপর আপনি নিজের ঘরে গিয়া ঘুম দেন...

ভদ্রতার পর্দা এবার ছিঁড়ে গেল মান্নান সাহেবের: শয়তানের বাচ্চা! আমি বের হয়ে নেই, তোর ঘুম বাইর করুম কুন দিক দিয়া দেখবি... তুই...তুই... আইজকা শেষ! দিনদুপুরে অফিসের বাথরুমে... ছি...ছি... এদের জন্যই দেশটা...

অপরপক্ষ: ভাই, আমি পাঁচ মিনিট পরে আপনেরে ফোন দিতেছি। এক অফিসের বাথরুমে ঢুকছিলাম। কিন্তু আপনের লগে বলা আমার প্রত্যেকটা কথার জবাব দিতেছে জানি কুন হারামজাদায় পাশের খুপরি থেইকা... সরি, আপনে দোকানটা খুলেন খালি পাঁচ মিনিটের জন্য। অর্ডারটা আমার আজই সাপ্লাই দিতে হইবো। আমি এক্ষণি আসতেছি মালগুলা নিতে। খালি মোটরসাইকেলের এক টান... টাকা নগদই দিয়া যামু...

প্রতীকি ফাইল ফটো

মিনিট খানেকের মধ্যে পাশের বাথরুমের দরোজা খোলার আওয়াজ পেলেন মান্নান সাহেব। অদেখা লোকটার (সম্ভবত পেশায় সরবরাহকারী কন্ডাক্টর) হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে যাওয়ার শব্দও শুনলেন। তবে তার নিজের কাজ তখনো শেষ হয় নাই। যাক, লোকটার মুখোমুখি হতে হয় নাই- এটা ভেবে কিছুটা স্বস্তি পেলেন হতবাক হয়ে কমোডে বসে থাকা বস মান্নান।

তবে এই গল্পে মান্নান সাহেবের কিন্তু কোনো দোষ নেই। অনেকেই আছেন বাথরুমে গিয়ে ফোনে কথা শুরু করে দেন। নিজের বাসা বাড়িতে না হয় এসব চলে- কিন্তু অফিসে বা বাইরে কিছু নিয়ম কানুন মানতে হয়। সে ধরনের কিছু টিপস কালের কণ্ঠের পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো এখানে- 

অধিকাংশ লোকের ধারণা, অফিসে যে ওয়াশরুম, বাথরুম, রেস্টরুম বা টয়লেটের সারি থাকে, তারমধ্যে সবথেকে শেষেরটা একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে- কারণ, এটি দূরে বিধায় কম ব্যবহার হয়। কিন্তু, এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে- এমনটা সব ক্ষেত্রে নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সব শেষের টয়লেটটা বেশি দুর্গন্ধযুক্ত আর অধিক জীবাণুময় থাকে। আপনার মতো অনেকেই এমন মত পোষণ করে যে শেষের টয়লেটটা কম ব্যবহার হয়, তাই আমিও যাই সেটায়... আসলে এমন ধারায় অন্যরাও ভাবেন এবং সেই টয়লেটটি-ই বেশি ব্যবহার হয় এর ফলে।

লেখার শুরুর গল্পে এসেছে টয়লেটে বসে কথা বলার বিড়ম্বনার কথা। তাই, কথা যত জরুরিই হোক, বাথরুমে মানে অফিসের টয়লেটে (হোক নিজের বা অন্যের অফিসের টয়লেট) বসে/দাঁড়িয়ে বলবেন না। প্রয়োজনে কথা শেষ করে নিন আগে, তারপর টয়লেটে যান। না হলে ওপরের গল্পের মতো তা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে। এটা নিশ্চয়ই আপনি চান না।

অনেকেই পা ছড়িয়ে বসেন অফিস টয়লেটের কমোডে। এতে আপনার পা বা জুতোপরা পা পাশের টয়লেট থেকে পরিষ্কার দেখা যাবে- কী দরকার অন্যকে জানানো যে আপনি এই টয়লেটটায় আছেন! 

প্রতীকি চিত্র

এছাড়া অপর টয়লেটে ব্যবহার করা নোংরা পানি পায়ে পড়তে পারে- এটা খুবই অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করবে আপনার জন্য। আমরা জানি যে আধুনিক অফিস টয়লেটগুলো যেভাবে তৈরি- বেশির ভাগই দেখা যায় পাশাপাশি খুপরিগুলোর দেয়াল (কাঠবোর্ড বা অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি) ফ্লোর থেকে কিছুটা উঁচুতে থাকে। তাই পা অতিরিক্ত ছড়িয়ে বসা যাবে না- এটা খেয়াল রাখবেন।

টয়লেট টিস্যু পাশের বাস্কেটে ফেলুন। যদিও আজকাল বেশিরভাগ টয়লেট পেপারই ওয়াটার সলিউবল (পানিতে গেলে যায়), তবুও সেগুলো কমোডে গেলে স্যুয়ারেজ লাইনে সমস্যা হতে পারে। যেহেতু অফিস টয়লেটগুলো বাড়িঘরের চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। 

আপনি ব্যাচেলর হন কিংবা ফ্যামিলি ম্যান, নিজ বাসায় টয়লেট অনেকবার পরিষ্কার করেন তারপরেও তা অপরিষ্কার থাকে অনেক সময়। কিন্তু অফিসে টয়লেট পরিষ্কার করতে হয় না আপনাকে। এজন্য অন্য লোক আছে। তবে তারও সীমাবদ্ধতা থাকে। অনেক সময় দরকারি জিনিসপত্র থাকে না টয়লেট পরিষ্কারের। দোষটা হয় তো অফিসের। কিন্তু স্বাস্থ্য তো নষ্ট হবে আপনার। তাই, সেসব বিষয় বিবেচনা করে অফিসের টয়লেট যতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায়- সেই চেষ্টা করা উচিৎ আমাদের। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষকে সচেতন করার দায়িত্বও আমাদের।

নারীদের টয়লেটগুলো পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে সব অফিসেই অগ্রাধিকার বেশি দেওয়া হয়। তবে সংখ্যায় কম হলেও কোনো কোনো অফিসে দেখা যায় নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট নেই। তেমন অবস্থায় বেশিরভাগ সময় নারীদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে সারতে হয় প্রাকৃতিক কাজ। কেউ কেউ সারাদিন আটকে রাখেন বেগ কখন ছুটি হবে কখন বাসায় ফিরে কাজ সারবেন- এই আশায়। এমন অবস্থা যেখানে আছে সেখানকার পুরুষ সহকর্মীরা আরো একটু সংবেদনশীল হোন নারী কলিগদের জন্য। কারণ, বাংলাদেশে নারীদের অসুখ-বিসুখের অন্যতম প্রধান কারণ কিন্তু ইউরিনালজনিত সমস্যার সূত্রে। এবং এটারও বড় একটা কারণ, অসহায়ভাবে তাদের লম্বা সময় ধরে মুখে হাসি নিয়ে বেগ চেপে বসে থাকতে হয়। অনেকেই হয়তো জানেন না- প্রাকৃতিক কারণেও পুরুষদের জন্য তাদের পক্ষে এটা বেশি কষ্টকর।  

অনেকে হাতে পত্রিকা এমনকি বই নিয়েও নিয়ে প্রবেশ করেন টয়লেটে। অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, তবে অফিসের দরকারি ফাইল নিয়েও ঢোকেন কেউ কেউ। মানে, কাজ সারার সময়টুকু বই-পত্রিকা-ফাইল পড়ে পার করা। এমন কাজগুলোও দৃষ্টিকটু এবং বেশিরভাগ মানুষ অশোভন মনে করে। তাই, এই বিরল অভ্যাস যাদের আছে- তারাও এটা ত্যাগ করুন। 

অনেক সহকর্মীকে দেখা যায় পাশাপাশি ইউরিনাল বুথে (প্রশ্রাব করার কমোড) দাঁড়িয়ে কাজ সারার সামন্তরালে দরকারি কথাও চালাতে থাকেন। এটা স্বাস্থ্যের জন্য নেতিবাচক এবং দেখতেও দৃষ্টিকটু। এই কথাগুলো এক দুই মিনিট পরেও বলা যাবে। তাই, এমন সময়ে কথা বলার অভ্যাস ত্যাগ করুন।

কেউ কেউ আছেন, হাতে একখান জ্বলন্ত সিগারেট না নিয়ে ঢুকলে তার কাজ হয় না। মানে মলত্যাগের বেগ আসে না। যদিও এই সংখ্যাটা তেমন বেশি না। তবে এমন অভ্যাস যাদের আছে তারা অফিসের টয়লেটে অন্তত এমনটি করতে যাবেন না। অন্যদের স্বাসকষ্টের কারণ এটি আর আপনার নিজের মারাত্মক ক্ষতি তো আছেই। এ সংক্রান্ত চিকিৎসা দ্রুত করিয়ে নিন। মনে রাখবেন, অনেক ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ইচ্ছাশক্তিই অনেক বদঅভ্যাস বা রোগের নিরাময়ে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে। আপনি চেষ্টা করলে এটা ত্যাগ করাও অসম্ভ হবে না। 

কেউ কেউ আছে চুইংগাম চিবুতে চিবুতে টয়লেটে ঢোকেন। এরপর মুখ থেকে থুক দিয়ে সেটি ইউরিনাল বা কমোডে ছুঁড়ে মারেন। এর ফলে এর লাইন নষ্ট ছাড়াও তাতে স্থায়ী দাগ পড়তে পারে, দেখতে ঘৃণা উদ্রেককারী হতে পারে এটা অনেকের জন্য। এই অভ্যাসটাও ত্যাগ করুন দয়া করে।

এছাড়া টয়লেট পেপার ব্যবহারে মিতব্যয়ী হোন। টয়লেটে ঢোকার আগে খুব ভাল হয় যদি মোবাইল ফোনটি অ্যারোপ্লেন মোড কিংবা সাইলেন্ট মোডে রাখুন। বন্ধ করেও রাখা যায় যদি সম্ভব হয়।

সহজে এবং প্রায় বিনা খরচে টয়লেটের দুর্গন্ধ দূর করার কিছু টিপসের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে, খবরের কাগজের টুকরোয় আগুন দিয়ে তা কিছুক্ষণ টয়লেটে রাখা- এতে প্রস্রাবজনিত অ্যামোনিয়া গ্যাস এবং অন্যান্য দুর্গন্ধও দূর হয় খুব দ্রুত- এটা পরিক্ষিত। কিন্তু এটা করতে গিয়ে দুইটি সাবধানতা অবলম্বন করুন। 

এক হচ্ছে,  ছোট কাগজের টুকরো নিন এবং কাগজ জ্বলে শেষ হওয়ার পরই তা কমোডে বা অন্যত্র ফেলুন। আর দ্বিতীয় সাবধানতাটিও হচ্ছে প্রথমটিরই অংশ, তা হলো কখনোই, কোনো অবস্থায়ই কাগজ জ্বালিয়ে কমোডে ফেলবেন না সরাসরি। এর ফলে ভেতরে জ্বমে থাকা দাহ্য গ্যাসের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এমন কিছু বিপজ্জনক ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়েও যাতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। যেসব বাড়িতে/অফিসে টয়লেটের জন্য সেপটিক ট্যাংক আছে এবং সেগুলো টয়লেটে বা কমোড সংলগ্ন- সেখানে এধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। 

আশা করছি, বাস্তবতার নিরিখে পরামর্শগুলো আপনাদের উপকারে আসবে।



মন্তব্য