kalerkantho


বাস্তবের রবিনসন ক্রুসো : ২০ বছর ধরে বাস করছেন নির্জন দ্বীপে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৩:৩৯



বাস্তবের রবিনসন ক্রুসো : ২০ বছর ধরে বাস করছেন নির্জন দ্বীপে

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক মিলিওনিয়র ডেভিড গ্ল্যাশিন (৭৩) গত ২০ বছর ধরে বাস করছেন রিস্টোরেশন আইল্যান্ড নামে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এক নির্জন দ্বীপে। সেখানে থেকেও নিজেকে তিনি সুখী বলছেন কারণ তাকে সেখানে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হামলার জন্য উদ্বেগ পোহাতে হয় না।

১৯৯৭ সালের মে মাসে থেকে তিনি ওই দ্বীপে বাস করছেন। এর ১০ বছর আগে ১৯৮৭ সালের স্টক এক্সচেঞ্জে ধস নামার ফলে ব্যবসায় লোকসানের শিকার হয়ে ধনসম্পদ হারান।

সাবেক এই স্বর্ণখনির মালিক একসময় ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক ছিলেন। যিনি এখন দ্বীপটির সমুদ্রসৈকতে স্থাপিত একটি কাঠের কুঁড়েঘরে বাস করছেন। আর তার সঙ্গী শুধু পলি নামের একটি কুকুর।

কিন্তু সীমিত বিদ্যুৎ, মিঠা পানির অভাব এবং প্রতিনিয়ত বন্য জীবনের সঙ্গে লড়াইকারী দাড়িওয়ালা এই স্বনির্বাসিত ব্যক্তি বলছেন, ওই নির্জন দ্বীপে তিনি সুখে এবং নিরাপদেই আছেন।

তিনি বলেন, 'এখানে সাপ, মাকড়সা এবং কুমিরের ভয় আছে। কিন্তু তারপরও আমি এখানে নিরাপদ আছি। কারণ এখানে কোনো সন্ত্রাসী হামলার ভয় নেই।

'

'আমি এখানে থাকতে ভালোবাসি কারণ এখানে আমার নিরাপত্তা আছে। আপনি যতই সাহসী বা বয়স্ক হন না কেন আপনিও নিশ্চয় নিশ্চিতে বিছানায় ঘুমাতে যেতে চাইবেন। আপনিও নিশ্চয় আপনার ওপর কোনো সন্ত্রাসী হামলা হবে না সেই নিশ্চয়তা নিয়েই ঘুমাতে যেতে চাইবেন। '

সিডনির উত্তর সমুদ্রসৈকত এলাকায় এক আইরিশ পরিবারে জন্ম নেওয়া ডেভিড বলেন, তিনি ওই দ্বীপেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান। তিনি তার ওই প্রাকৃতিক স্বর্গ ছেড়ে আর কোথাও যেতে চান না। ওটাই তার জন্য পৃথিবীতেই স্বর্গস্বরূপ।

'আমি যখন এখানে আসি তখন আমি টাকার জন্য মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলাম। টাকাই মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ বানিয়ে ফেলে। টাকার জন্য আমার স্ত্রীও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তবে আমি এখনো এমন কোনো নারীকে খুঁজছি যিনি আমার সঙ্গে এখানে বসবাস করবেন। অথবা এমন কিছু নারী যারা বছরে অন্তত কয়েকবার এখানে ভ্রমণ করতে আসবেন। '

আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি কর্ক থেকে আসা এক ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া ডেভিড পড়াশোনা করেছেন একটি প্রাইভেট বোর্ডেং স্কুলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

পাপুয়া নিউগিনিতে তিনি একটি স্বর্ণখনি কম্পানি গড়ে তোলেন। কিন্তু ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে বিশ্ব আর্থনীতিতে ধস নামলে পরবর্তী ১২ মাসে ৬ মিলিয়ন ডলার লোকসানের শিকার হন তিনি।

এর কিছুদিন পরই তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এবং এক গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে সম্পর্ক হয় তার। নতুন বান্ধবী তাকে বলেন তিনি কোনো নির্জন দ্বীপে পালিয়ে যেতে চান। বান্ধবীর ইচ্ছাতেই এমন দ্বীপের সন্ধান করতে থাকেন তিনি।

১০০ এককের রিস্টোরেশন আইল্যান্ডে তিনি প্রথম ভ্রমণ করেন ১৯৯৩ সালে। দ্বীপটির সবচেয়ে কাছের শহর কেয়ার্নসও দ্বীপটি থেকে ৬২১ মাইল দূরে অবস্থিত। ১৯৯৭ সালে কুইন্সল্যান্ড প্রদেশের সরকারের কাছ থেকে ৫০ বছরের জন্য লীজ নেন তিনি।

কিন্তু অবশেষে স্ত্রী হারানোর পর আসা গার্লফ্রেন্ডও আর তার সঙ্গে থাকতে চাইলেন না। এবং তিনি একাই ওই দ্বীপে গিয়ে থাকতে শুরু করেন।

গত ২০ বছরে তার দ্বীপে তিনি প্রচুর সংখ্যক ভ্রমণকারী এবং পর্যটকদেরকেও অতিথি হিসেব আপ্যায়ন করেছেন। হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা রাসেল ক্রো একবার গিয়েছিলেন তাকে দেখতে। তবে এখন বছরে মাত্র ১২ জন ভিজিটরের দেখা পান তিনি।

১৭৮৯ সালে ব্রিটিশ নাবিক ক্যাপ্টেন ব্লিঘ এই দ্বীপে তার জাহাজের নাবিকদের স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য যাত্রাবিরতি করেছিলেন। আর সেই থেকেই এর নাম হয় 'রিস্টোরেশন আইল্যান্ড'।

ডেভিড ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাইরের দুনিয়ার খোঁজ-খবর রাখেন। ইন্টারনেটে তিনি সোশাল মিডিয়া এবং ইউটিউবে বিচরণ করেন। ব্রিটেনস গট ট্যালেন্ট প্রগ্রামটি দেখেন তিনি।

কিন্তু তার কোনো সরাসরি বিদ্যুৎ সাপ্লাই নেই। সোলার প্যানেল এবং জেনারেটরের মাধ্যমে তিনি সামান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন। আর মাত্র কয়েকবছর আগে তিনি সীমিত পরিমাণে পানির সরবরাহ পেয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নির্মিত একটি কাঠের কুড়ে ঘরে থাকেন তিনি।

দ্বীপটিতে তিনি একটি হোটেল বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন শুধু অলাভজনক একটি পরিবেশ বান্ধব স্বাস্থ্যোদ্ধার আবাসন কেন্দ্র বানাতে চান।

পাশের শহর কেয়ার্নস এ বছরে একবারের জন্য কেনাকাটা করতে যান ডেভিড। সে সময় অলিভ অয়েল, চাল এবং বিয়ার কিনে আনেন তিনি।

এ ছাড়া বাকি সময় তিনি দ্বীপে সবজি চাষ, মাছ, কাঁকড়া এবং চিংড়ি শিকার করেই কাটান। কয়েকবছর আগে বিষাক্ত মাকড়সায় কামড়ালে তাকে বিমানে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে স্বাস্থ্য এখনো লক্ষণীয়ভাবেই ভালো আছে।

তিনি এখনো একজন নারী সঙ্গিনীর জন্য আকুতি জানান। এ জন্য তিনি প্রায়ই ইন্টারনেটের ডেটিং সাইটগুলোতে ঘুরে বেড়ান। কাউকে পাওয়া যায় কিনা যিনি তার সঙ্গে ওই দ্বীপে গিয়ে থাকবেন।

তিনি বলেন, এই দ্বীপটিতে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প করা হয়নি বলে আমি খুশি। কারণ উন্নয়ন করা হলে এর প্রাণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যেত।

তিনি সভ্য জগতে শুধু রাগ আর তিক্ততা। প্রচুর লোক তাদের সঙ্গিনীকে হারাচ্ছেন। কিন্তু এখানে এক ভিন্ন প্রশান্ত জগত।

ডেভিড বলেন, 'আমি একটা বড় কম্পানির চেয়ারম্যান ছিলাম। কিন্তু বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় আমি ১০ মিলিয়ন ডলার হারাই। আমার পুরো জীবনযাপনের ধরনেও ধস নামে। '

'আমি ছিলাম এমন একজন যাকে হয়তো চিকিৎসাগত ভাবে অবসাদগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করা হতো। কিন্তু এরপরই আমি সিদ্ধান্ত নিই মূলধারার জীবনযাপনের মানসিক চাপে আর ফিরে যাব না। যখন একজন নতুন নারী বন্ধু আমাকে বললেন কীভাবে কোনো একটি নির্জন দ্বীপ পুরোপুরি মানসিক চাপমুক্ত জীবনযাপনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হতে পারে। '

সূত্র : নিউ ইয়র্ক পোস্ট


মন্তব্য