kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রান্নায় ব্যবহৃত সচরাচর মশলাগুলোই হতে পারে প্রাণ রক্ষাকারী মহৌষধ!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ১৭:২২



রান্নায় ব্যবহৃত সচরাচর মশলাগুলোই হতে পারে প্রাণ রক্ষাকারী মহৌষধ!

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন জিরা এবং ধনের মতো রান্নায় সচরাচর ব্যবহৃত হয় এমন মশলা আমাদের সবচেয়ে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান হতে পারে? আপনি কি জানেন অশ্বগন্ধ্যা এবং ব্রাহমির মতো ভেষজ স্মৃতিভ্রংশের মতো রোগ নিরাময়ে সক্ষম?
এমনটাই বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্নায়ু চিকিৎসাবিদ কুলরীত চৌধুরী। তিনি তার বই “দ্য প্রাইমে” এ বিষয়ে লিখেছেন।

প্রাচীন ভারতের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থার জ্ঞানে পরিপূর্ণ বইটি কোনো সুপাঠ্য উপন্যাসের মতোই একনাগাড়ে পড়ে ফেলা সম্ভব।
স্নায়ুবিজ্ঞানী কুলরীত যেভাবে আয়ুর্বেদিক ডাক্তার হলেন
কুলরীত চৌধুরী জানান নিজের মাইগ্রেনের ব্যাথার চিকিৎসা করতে গিয়ে একের পর এক ওষুধ সেবনের পর তিনি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার দ্বারস্থ হন। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় শুধু তার মাথা ব্যাথাই ভালো হয়নি বরং তার দেহের শক্তিও বাড়ে। এবং মনটাও ফুরফুরে হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “এমনকি আমার মনে হচ্ছিল যেন বা আমি যৌবন ফিরে পেয়েছি। এই অভিজ্ঞতা আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আমি আমার রোগীদের জন্যও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় কী রয়েছে তা গভীরভাবে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ”
আপনার বইয়ে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মৌলিক ধারণাগুলো সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, আমাদের দেহে যে বিষাক্ত পদার্থ জমা হয় তার ফলেই আমরা রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হই। আপনি কি মনে করেন, আমাদের সময়ে আমাদের পক্ষে বিষ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব?
দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা পরিবেশের মধ্যে এতো বেশি ক্ষতিকর পরিবর্তন সাধন করে ফেলেছি যে আমাদের পক্ষে এখন আর পুরোপুরি বিষমুক্ত থাকা সম্ভব নয়। তারচেয়ে বরং আমরা বিষের পরিমাণ কমিয়ে আনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রম তা থেকে মুক্ত হতে পারি। এজন্যই দ্য প্রাইমের মতো কর্মসূচি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমাদের ওপর এখন প্রতিনিয়ত বিষের বোমা ছোঁড়া হচ্ছে। ফলে আমরা যদি নিয়মিতভাবে আমাদের দেহকে বিষমুক্ত করার কোনো উপায় খুঁজে না পাই তাহলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হবে।
দ্য প্রাইমের অর্থ কী?
দ্য প্রাইম এর অর্থ, দেহকে সুস্বাস্থ্য এবং স্বতস্ফুর্ত ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রস্তুত করা। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার আগে এটি জরুরি প্রাক প্রস্ততিমূলক একটি পর্যায়। আপনাকে পরবর্তী পরিবর্তনগুলোর জন্য আগে নিজের দেহকে প্রস্তুত করতে হবে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ও নিয়ম রয়েছে। প্রাইম আপনাকে ওই নতুন অভ্যাসগুলোর জন্য প্রস্তুত করবে। দেহের প্রাইম করানো ছাড়া খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের বিষয়টি অনেকটা খাড়া পাহাড়ে ওঠার চেষ্টার মতো। আর এ কারণেই বেশিরভাগ মানুষ ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের চেষ্টায় ব্যর্থ হন।
“অ্যামা” শব্দটি আপনার বইয়ে বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। সকল শারীরিক সমস্যার মুলে রয়েছে এটি। আপনি এর কোনো সংজ্ঞা দিতে পারবেন?
“অ্যামা” শব্দের যথাযথ কোনো অনুবাদ আধুনিক পশ্চিমা চিকিৎসা ব্যবস্থায় নেই। এর সবচেয়ে কাছাকাছি অনুবাদটি হলো, হজম না হওয়া খাদ্য দ্রব্য। আমি এর প্রতি ইঙ্গিত করেছি বিষাক্ত প্রদাহ বলে। এটি দিয়ে শুধু শারীরিকভাবে গৃহীত কোনো বিষাক্ত পদার্থের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়নি। বরং একজন ব্যক্তি মানসিক এবং আবেগতভাবেও যেসব বিষ হজম করতে পারেন না সেসবকেও বুঝানো হয়েছে।
বর্তমান শতকের সবচেয়ে বড় একটি আবিষ্কার হলো, কীভাবে দৈহিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকা জরুরি। এমনকি তারা অভেদ্য। “অ্যামা” শব্দটি দিয়ে পরিবেশগত বিষ, খাদ্যে প্রয়োগকৃত রাসায়নিক বিষ এবং জীবনের কোনো আবেগগত বিপর্যয়মূলক ঘটনা সবকিছুকেই বুঝায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থ্য থাকার জন্য আপনি শুধু অল্প কয়েকটি রান্না উপাদানের কথা উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি কি একুট অবিশ্বাস্য শোনায় না?
আধুনিক বিশ্বে আমরা সারল্যের ক্ষমতা সম্পর্কে অবমূল্যায়ন করতেই অভ্যস্ত। এই সামান্য কয়টি উপাদানের প্রতিটিই প্রকৃতির পক্ষ থেকে মানবদেহের জন্য অনেক বড় বড় উপহার। উদাহরণত, যদি হলুদের কথা বলি। এটি অবিশ্বাস্যভাবে একটি সরল খাদ্য। অথচ এটি নিয়ে যে স্বল্প গবেষণা হয়েছে তাতেই দেখা গেছে, এটি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর ক্ষয় ও স্মৃতিভ্রংশ থেকে শুরু করে ক্যান্সারের মতো কঠিন সব রোগ কার্যকরভাবেই প্রতিরোধে সক্ষম। আমাদের দেহকে সুস্থ রাখতে খাদ্য এমনই অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এটি।
দ্য প্রাইমের প্রতিটি পদক্ষেপই শক্তিশালি। আমি শুধু সে পদক্ষেপগুলোই বাছাই করেছি যেগুলোকে আমি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি। স্নায়ুবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে আমি শিখেছি যে, আপনি যদি প্রতিদিন নিয়মিতভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করেন তাহলে আপনি দীর্ঘমেয়াদে একত্রে বিস্ময়কর ফলা লাভ করতে পারবেন।
এপিজেনেটিক্স থেকে আমরা শিখছি যে, আপনি প্রতিদিন যা করেন তা আপনার ডিএনএ কোষের অভিব্যক্তি বদলে দিতে সক্ষম। আমাদের প্রতিদিনের সহজ সরল পছন্দগুলো আক্ষরিক অর্থেই আমাদের ডিএনএ বদলে দিচ্ছে।
ভারতীয়রা তাদের প্রতিদিনের খাবারে জিরা, এলাচ এবং ধনে ব্যবহার করেন। আপনি কি মনে করেন এটি বিদেশিদের জন্যও যতটা উপকারে লাগবে ভারতীয়দের জন্যও ততটাই উপকারে আসবে?
আমি এখনো আমার ভারতীয় আত্মীয় পরিবারগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করি। একটি বিষয় দেখে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি যে, ভারতীয়রা অনেক বেশি পরিমাণে আমেরিকান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ভারতে আমার তরুণ আত্মীয় ভাই-বোনরা আমেরিকানদের চেয়েও বেশি হারে ফাস্টফুডের দোকানে খেতে যায়। ঐতিহ্যগতভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয়রা আমেরিকান খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে তা সহজলভ্য হওয়ার কারণে। যার ফলে ভারতীয়রাও আমেরিকানদের মতোই স্থুলতা, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো জটিল সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
জিরা, এলাচ এবং ধনের বিশেষ উপকারীতাগুলো কী? এগুলো কীভাবে দেহকে বিষমুক্তকরণে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে ভুমিকা পালন করে?
নাড়িভুড়ি পরিষ্কার রাখতে এবং হজম শক্তি অটুট রাখতে এই মসলাগুলো বিস্ময়কর ভুমিকা পালন করে। প্রাণশক্তি ধরে রাখা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর হজম প্রক্রিয়া প্রধান ভুমিকা পালন করে। এই প্রতিটি মসলা পরিপাক নালীর কোনো ক্ষয় হলে তা সারিয়ে তুলতে আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। আর একসঙ্গে প্রয়োগ করা হলে এগুলো আরো শক্তিশালি হয়ে ওঠে।
অশ্বগন্ধা এবং ব্রাহমির বিশেষ গুনগুলো কী? শিশুদের দেহে কি এগুলো প্রয়োগযোগ্য?
অবসাদের বিরুদ্ধে লড়াইকারী ভেষজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালি দুটি ভেষজ হলো অশ্বগন্ধা এবং ব্রাহমি। আধুনিক কালে দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং ওজন বাড়ার কারণগুলোর একটি অবসাদ। দেহ ও মনে অবসাদ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদান নিষ্ক্রিয় করে এই দুটি ভেষজ। এছাড়া খাদ্য আসক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়েও এগুলো বেশ কার্যকর ভুমিকা পালন করে।
আধুনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবারগুলোর বেশিরভাগই মস্তিষ্কে খাদ্য আসক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাসায়নিকভাবে পরিকল্পিত। অশ্বগন্ধা এবং ব্রাহমি প্রাকৃতিকভাবেই এই দুষ্টচক্র ভেঙ্গে ফেলে। অনেক সময় শিশুদের জন্য এই ভেষজগুলো ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে আমার মতে, এই ভেষজগুলো খাওয়ানোর আগে কোনো আয়ুর্বেদিক চিকিৎসককে দিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মূল্যায়ন করিয়ে নিতে হবে।
আপনার বইয়ে মধুর সঙ্গে গরম পানি মিশিয়ে খেতে মানা করা হয়েছে। খাদ্য সম্পর্কিত এমন আর কোনো বিধি-নিষেধ আছে কি যা আপনি পাঠকদের জন্য তুলে ধরতে চান?
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আরো এমন কিছু বিধি-নিষেধ আছে যেগুলো হরহামেশাই ভঙ্গ করা হয়। যেমন, মাংসের সাথে দুধ মিশিয়ে রান্না করা এবং রাতে দই খাওয়া। এসব বিধি-নিষেধ ভারতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে এসেছে। কিন্তু কেউই বুঝতে পারছেননা যে এর পেছনে প্রকৃতই বিজ্ঞান সম্মত কারণ রয়েছে। এই বিধি-নিষেধগুলো খাদ্যের হজমপ্রক্রিয়ায় অ্যামা বা বিষ উৎপাদন করে এমন খাদ্যাভ্যাস থেকে বিরত থাকার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ক্ষয় এবং ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ নিরাময়ে কি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি কোনো কার্যকর ভুমিকা পালনে সক্ষম?
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র এই রোগগুলোকে পশ্চিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানের চেয়ে একটু ভিন্ন চোখে দেখে থাকে। আমরা এই রোগগুলোকে অনেক দেরিতে শনাক্ত করি। কিন্তু আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রাথমিক পর্যায়েই এই রোগগুলো শনাক্ত করার কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে। ফলে এই রোগগুলো পুরোপুরি নিরাময়ও সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সব রোগেরই চিকিৎসা করা হয় অনেক পরে গিয়ে। অন্যদিকে, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সব রোগের লক্ষণই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা হয়। যাতে কোনো রোগ মারাত্মক রুপ ধারণ করার আগেই তার নিরাময় করা সম্ভব হয়।
ডেঙ্গু এবং চিকনগুনিয়ার মতো ভাইরাসজনিত রোগের চিকিৎসা কি আয়ুর্বেদে সম্ভব?
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের একটি পূর্ণ অধ্যায়ে শুধু সংক্রমণজনিত রোগের চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়াই এতোটা কার্যকর যা দেখে আমি বিস্ময়ে অভিভুত হয়ে গেছি। তবে আয়র্বেদ শাস্ত্রে সংক্রমণজনিত রোগের চিকিৎসায় প্রধান কর্তব্য হিসেবে হজম প্রক্রিয়াকে স্বাস্থ্যকরভাবে কার্যকর ও সক্রিয় রাখার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হিসেবে পরিপাকতন্ত্রকে স্বাস্থ্যকরভাবে সক্রিয় রাখার বিষয়টিকেই প্রধান কর্তব্য বলে মনে করা হয়।
আমাদের পরিপাকতন্ত্রেই আমাদের দেহের বেশিরভাগ রোগপ্রতিরোধী কোষগুলোর অবস্থান। আর সংক্রামক রোগগুলো মারাত্মক রুপ ধারণ করার আগেই সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আমাদের পরিপাকতন্ত্র। সুতরাং কোনো গুরুতর সংক্রামক রোগ নিরাময়ের বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি থাকলেও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে সবসময়ই প্রধান লক্ষ্য থাকে আগে ভাগেই রোগ প্রতিরোধ করা।
সূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া


মন্তব্য