kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঘুম কম হলে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ১৩:০০



ঘুম কম হলে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক

১৯৫৯ সালে নিউ ইয়র্কের জনপ্রিয় ডিজে পিটার ট্রিপকে দাতব্য কাজের জন্য ২০০ ঘণ্টা জেগে থাকতে বলা হয়। পাশাপাশি তাকে তার রেডিও শো হোস্ট করতে বলা হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে না ঘুমানোর ফলে কী ক্ষতি হতে পারে এ ব্যাপারে তখনও পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়নি। ফলে কেউই বুঝতে পারছিল না পিটার ট্রিপের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটবে। ফলে এটি শুধু ট্রিপের শ্রোতাদের জন্যই নয় বরং বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের জন্যও ছিল একটি বড় ঘটনা।

এভাবে দীর্ঘসময় ধরে একটানা না ঘুমানোর ফলে ট্রিপের মস্তিষ্কে লোকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছিল। স্বাভাবিকভাবে ট্রিপের ব্যক্তিত্ব ছিল উল্লাসপূর্ণ এবং হাসিখুশিতে ভরপুর। কিন্তু না ঘুমানোর ফলে তার ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি বদলে যেতে থাকে।

তৃতীয় দিনে ট্রিপ উচ্চমাত্রায় খিটখিটে হয়ে ওঠেন। তিনি এমনকি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরকেও সামান্য কারণেই গালাগালি ও অপমান করতে থাকেন। আর তার ওই প্রচেষ্টার শেষের দিকে গিয়ে তিনি অবাস্তব জিনিস দেখতে শুরু করেন এবং তার মস্তিষ্কেও বিকৃতি দেখা দেয়।

কিন্তু তাকে পর্যবেক্ষণকারী ডাক্তাররা তার অবস্থা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা সত্ত্বেও তিনি টানা ২০১ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে কাটান। এ সময় ঘুম তাড়ানোর জন্য তিনি শরীর চাঙাকারী ওষুধও সেবন করেন।

আধুনিক গবেষণাগারেও ঘুমহীনতা নিয়ে চালানো পরীক্ষায় একই সমস্যার সৃষ্টি হতে দেখা গেছে। ঘুম কম হলে বা একটানা দীর্ঘসময় না ঘুমালে মেজাজ ক্রমাগত খিটখিটে হয়ে ওঠে বা রোষপ্রবণতা বাড়ে। এ ছাড়া মানসিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং অবসাদের অনুভূতি, রাগ ও উদ্বেগ বাড়ে।

ক্লান্ত এবং আবেগী
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম কম হওয়ার ফলে লোকের মাঝে উচ্চমাত্রায় মানসিক উদ্বেগ এবং রাগ দেখা দেয়। একটি সহজ তুলনামূলক জ্ঞানীয় পরীক্ষায় দেখা গেছে, ঘুম কম হলে লোকে আত্মনিয়ন্ত্রণহারা এবং বদরাগী হয়ে ওঠেন। আর যারা পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমান তারা অনেক বেশি শান্ত থাকেন।

 

ঘুম কম হলে মস্তিষ্ক কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্ক্যানিং করে মস্তিষ্কের ছবি তোলার মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হয়। আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে অ্যামিগডালা নামের একটি অংশ আছে যা আমাদের আবেগের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। যাদের ঘুম কম হয় তাদের মস্তিষ্কের ওই অংশে উচ্চমাত্রার এবং উত্তেজক তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়।

এ ছাড়া গবেষকরা এদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয় তাও পরীক্ষা করে দেখেন। গবেষণায় তারা দেখতে পেয়েছেন, ঘুম কম হলে অ্যামিগডালার সঙ্গে মস্তিষ্কের মেডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এর সংযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ। কারণ মেডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স নামে মস্তিষ্কের এই অংশটি স্বয়ং অ্যামিগডালার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুম কম হলে অ্যামিগডালা নেতিবাচক অনুপ্রাণনার প্রতি অতি বেশি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। কারণ তখন এটি মস্তিষ্কের সেই অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যে অংশটি এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখে।

লাসভেগাসে যারা রাত জেগে জুয়া খেলেন, তাদের মধ্যে ঘুম কম হওয়ার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বেশি গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এক রাত না ঘুমানোর ফলে জুয়াড়িরা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন এবং অযৌক্তিকভাবেই বেশি আশাবাদী হয়ে উঠছেন। ঘুম কম হওয়ার ফলে মস্তিষ্কের যে অংশ নেতিবাচক এবং ইতিবাচক ফলাফল মূল্যায়ন করে সে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এ কারণেই জুয়াড়িরা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং বিনা কারণেই অতি আশাবাদী হয়ে ওঠেন।

ঘুম কম হওয়ার ফলে মস্তিষ্কের আরেকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর নাম হিপ্পোক্যাম্পাস। মস্তিষ্কের এই অংশটিতে নতুন স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়। লোকে যখন এমনকি মাত্র এক রাতের জন্যও ঘুম থেকে বঞ্চিত হয় তখন তাদের মস্তিষ্কের এই অংশের নতুন স্মৃতি সংরক্ষণের সক্ষমতা নষ্ট হয়।

সম্ভবত ঘুম না হলে হিপ্পোক্যাম্পাস নিজের মধ্যে সংরক্ষিত তথ্যগুলো মস্তিষ্কের অন্য কোনো জায়গায় স্থানান্তরের সুযোগ পায়না। ফলে নতুন কোনো তথ্য গ্রহণে অক্ষম হয়ে পড়ে।
সূত্র : দ্য ইনডিপেনডেন্ট


মন্তব্য