kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মৌসুম পরিবর্তনে মেজাজ-মর্জির বদল, মোকাবিলা করবেন যেভাবে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ১৫:২৭



মৌসুম পরিবর্তনে মেজাজ-মর্জির বদল, মোকাবিলা করবেন যেভাবে

গাছের পাতা ঝরতে শুরু করেছে। দিনের দৈর্ঘ্য ছোট হয়ে এসেছে।

তাপমাত্রাও কমে যাচ্ছে। শীতল মাসগুলোতে আপনার অনুভূতিতে কিছুটা নিম্নগতি আসার বিজ্ঞানসম্মত কারণ রয়েছে। পিটসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ক্যাথরিন অ্যা রোয়েকলেইন দ্য হাফিংটন পোস্টকে বলেছেন, "এটি সত্য"।

মৌসুমের এই পরিবর্তন সকলকে সমভাবে প্রভাবিত করে না। কিন্তু মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ-মর্জির এই পরিবর্তনের ফলে শক্তিহীনতা, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি, প্রিয় তৎপরতাগুলোতে আগ্রহ হারানো ও কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা বাড়ে। এবং ঘুমের রুটিনেও পরিবর্তন দেখা দেয়- হয়ত ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে আর নয়ত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমানোর ইচ্ছা হয়।

রোয়েকলিন বলেছেন, বিজ্ঞানীরা জানেন, মৌসুম বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মেজাজ-মর্জিতেও পরিবর্তন আসার পেছনে প্রচুর জৈবিক এবং শারীরবৃত্তীয় কারণ রয়েছে। তবে মৌসুম পরিবর্তনের ফলে মেজাজ-মর্জি প্রভাবিত হওয়ার পেছনে একটি বড় নিয়ামক উপাদান হলো সূর্যের আলো।

তিনি বলেন, "বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য-প্রমাণ বলছে, দিনের দৈর্ঘ্য মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মেজাজ-মর্জিকেও প্রভাবিত করে। যা শীতকালে সংক্ষিপ্ততর আর গ্রীষ্মকালে দীর্ঘতর হয়। "

ফলে শরতের শুরুতে সূর্য দ্রুত অস্ত যেতে শুরু করলে আপনার মেজাজ-মর্জিতেও যদি পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। এটি খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।

আপনার দেহ জানে সূর্য কখন লুকাচ্ছে। আপনার দেহঘড়ি দিনের দৈর্ঘ্যে যে পরিবর্তন হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করছে। সার্কাডিয়ান ক্লক নামে পরিচিত আপনার দেহঘড়িটি আপনার দেহের আভ্যন্তরীণ টাইম-কিপার। এটি আপনাকে বলে দেয় কখন ঘুমাতে হবে আর কখন জাগতে হবে। এ ছাড়া মানবদেহের অন্যান্য অনেক পদ্ধতিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। উদাহরণত, হরমোন নিঃসরণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পরিপাকতন্ত্র এবং মেজাজ-মর্জির পরিবর্তন।

সুতরাং যখন দিনের দৈর্ঘ্য কম থাকে তখন ওই প্রক্রিয়াগুলোর কয়েকটি দেহঘড়ি দ্বারা প্রভাবিত হয়। এর মধ্যে আমাদের মেজাজ-মর্জির ওপর প্রভাব বিস্তারকারী প্রক্রিয়াও রয়েছে। এটিও এর ফলে বিঘ্নিত হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে মানুষের দেহে সেরোটোনিন হরমোন নিঃসরণের হার কমে আসে। আর দীনের দৈর্ঘ্য বেশি হলে এই হরমোন নিঃসরণের হার বাড়ে। এই হরমোন আমাদের ভালো থাকা এবং সুখী হওয়ার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

অারেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, আলো-আঁধারির চক্রের পরিবর্তন প্রক্রিয়া আমাদের দেহের তাপমাত্রাকেও প্রভাবিত করে। এটি আমাদের ঘুমিয়ে পড়ার সময়কালকে প্রভাবিত করে। এ ছাড়া আমাদের দেহে মেলাটোনিন নিঃসরণের হারকেও প্রভাবিত করে এই প্রক্রিয়া। মেলাটোনিন হরমোন আমাদের মাঝে ঘুম উসকে দেওয়ার কাজ করে। এটি অবসাদ হরমোন নিঃসরণের হারকেও প্রভাবিত করে।

একটি মূল পয়েন্ট মনে রাখতে হবে। রোয়েকলিন বলেন, তথাকথিত 'উইন্টার ব্লুস' মানে হলো 'পরিবর্তিত আলোর মাত্রার প্রতি এটি একটি জৈবিক প্রতিক্রিয়া'। নিছকই ইচ্ছাশক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার মতো কোনো জিনিস নয় এটি।

এর মোকাবিলায় আপনি আরো যেসব বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন :

১. সূর্যের আলো প্রবেশ করতে দিন
রোয়েকলিন বলেন, আলো- অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে, এর ঘাটতি- আপনার মেজাজ-মর্জি খারাপ করার ক্ষেত্রে প্রধান ভুমিকা পালনকারী উপাদানের অংশ। সুতরাং জানালা খোলা রাখা এবং সকালবেলায় বাইরে সূর্যের আলোতে একটু হেঁটে আসার মাধ্যমে আপনি আপনার মেজাজ-মর্জি ভালো রাখতে পারেন।

২. চলতে থাকা
শরীরচর্চা মেজাজ ভালো করার এবং মানসিক অবসাদ কমানোর একটি বড় উপায়। রোয়েকলিন বলেন, দশকের পর দশক ধরে অবসাদে আক্রান্ত লোকদের ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এ ক্ষেত্রে ঘাম ঝরানো বেশ কার্যকর একটি উপায়।

৩. সঠিক খাবার খান
বৃষ্টি হচ্ছে। শীত পড়ছে। আর আপনি এখনো আপনার ক্লোজেটের পেছন থেকে ভারী সোয়েটারটি খুঁজে বের করেননি। গরম জামা-কাপড়ের পাশাপাশি সহজলভ্য কার্বোহাইড্রেট এবং সুগার আপনার মস্তিষ্কের রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এরপর সেগুলো চুর্ণ করে নিচের দিকে প্রেরণ করুন। পাশাপাশি আপনার মেজাজ-মর্জিকেও নিচ বরাবর ট্যাগ করুন।

তার চেয়ে বরং ফলমূল, শাক-সবজি, ওমেগা থ্রি সমৃদ্ধ খাদ্য, প্রোটিন এবং জটিল কার্বোহাইড্রেটের প্রতি বেশি মনোযোগ দিন। প্রচুর পরিমাণ পানি পান করুন। পানি আপনার শক্তি ও মেজাজকে ধারাবাহিকভাবে উন্নত করে ধরে রাখবে।

৪. বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান
সেরা বন্ধুর সঙ্গে একটি ভালো কথপোকথন আপনার দিনটিকে যে আরো উন্নত করে তার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমে মানসিক অবসাদ কমে আসে। এতে আপনার মাঝে অপরের সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতি সৃষ্টি হবে এবং মেজাজ-মর্জিও ভালো থাকবে।
সামাজিকতা, শখ পূরণ এবং যেসব কাজ করে আপনি আনন্দ উপভোগ করেন সেসবের পেছনে সময় ব্যয় করার মাধ্যমে আপনি আপনার মেজাজ-মর্জি সহজেই উন্নত করতে পারেন। এটি একটি প্রমাণিত পদ্ধতি। যারা মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তির জন্য লড়াই করছেন তাদের জন্য এই পদ্ধতিটি অবলম্বনের পরামর্শ রইল।
আমাদের প্রায় সকলেই মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ-মর্জি পরিবর্তনের প্রভাবেও প্রভাবিত হই। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৪ থেকে ৬ শতাংশ লোক সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার (এসএডি) বা মৌসুম পরিবর্তন সংক্রান্ত মানসিক অবসাদের চিকিৎসা করানোর প্রয়োজনীয়তার নির্দেশক লক্ষণে আক্রান্ত হন।

মৌসুম পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট মানসিক অবসাদের তিনটি চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এক. উজ্বল আলো থেরাপি, দুই. জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি এবং তিন. মানসিক অবসাদরোধী ওষুধপথ্য।

একজন মনোবিজ্ঞানী আপনার লক্ষণগুলো দেখে আপনার চিকিৎসা করানো দরকার আছে কিনা তা নির্ধারণ করে দিতে পারেন। তবে আপনি নিজেও আপনার লক্ষণগুলো দেখে আপনার চিকিৎসা গ্রহণের দরকার আছে কিনা তা নির্ধারণ করতে পারবেন। যদি এমন হয় যে, আপনি ঠিকমতো কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না, পরিবার এবং নিয়মিত ব্যবহারগুলো সুশৃঙ্খল রাখতে পারছেন না। তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখুন আপনার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া দরকার।
সূত্র : দ্য হাফিংটন পোস্ট


মন্তব্য