kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শিশুদের খেলা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও উপকারি যে কারণে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৬:৫৪



শিশুদের খেলা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও উপকারি যে কারণে

আজকের এই ব্যস্ত এবং প্রযুক্তিচালিত সমাজে অবসর বিনোদন এবং আয়েশ করা একটু কঠিনই বটে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ঐতিহ্যগতভাবে বাচ্চাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন কিছু করে প্রাপ্তবয়স্করাও সাময়িকের জন্য মুক্তি পেতে পারেন।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রঙ্গীন প্রচ্ছদের বইয়ের বেড়ে চলা জনপ্রিয়তা থেকেও এর প্রমাণ মেলে।
অস্ট্রেলিয়াজুড়ে অনেক বাড়িতেই এখন এই ধরনের প্রাপ্তবয়স্কদের বইয়ের দেখা মেলে। আর এর বোধগম্য কারণও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রঙ্গীন হওয়ার অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও রয়েছে। রঙের বৈচিত্র মানসিক অবসাদ এবং উদ্বেগ কমাতে সহায়ক।
সুতরাং আর কোন কোন উপায়ে আমরা শিশুদের খেলা থেকে উপকৃত হতে পারি? এবং কোন ধরনের খেলা, গেম বা তৎপরতা সবচেয়ে বেশি উপকারি?
স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানী ম্যার্নি লিসম্যান বলেন, “শিশুরা শুধু বর্তমানেই বাস করে। তারা আমাদের প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বসে বসে শুধু অতীত নিয়ে বিষণ্ণতায় এবং ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগে ভোগে না। ”
“তারা শুধু বর্তমানেরই কোনো একটি মাত্র বিষয়ে মনোযোগ কেন্দ্রীভুত করতে পারে। আবার তারা যখন যা করে তা পুরো মনোযোগ ঢেলে দিয়েই করে। যা তাদের এবং আমাদের প্রাপ্তবয়স্কদের উভয়ের জন্যই ভালো। ”
লিশম্যান উল্লেখ করেন, শিশুরা খেলার সময় যে আরেকটি কাজ করে তা হলো নিজেদের কল্পনা শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের সীমা অতিক্রম করা।
তিনি বলেন, “প্রাপ্তবয়স্করা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে প্রথম যৌবনেই সীমা অতিক্রমের এই প্রবণতা থেকে পিছু হটেন। কিন্তু আমাদের উচিৎ এই সীমা অতিক্রমমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখা। কারণ এর মাধ্যমে আমাদের নতুন জিনিস শেখার বিষয়টি অব্যাহত থাকে। যা আমাদের মস্তিষ্কের জন্যও উপকারি এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সহায়ক। সুতরাং বয়স যাই হোকনা কেন নিজের সীমা অতিক্রম করুণ সুযোগ পেলেই। ”
এখানে রইল আপনার ভেতরের শিশুটির সংস্পর্শে থাকার পাঁচ উপায়:
১. লেগো
অনেক বাবা-মা লেগোকে শুধু ঘন্টাব্যাপী নির্মাণ এবং বেদনাদায়ক মিথষ্ক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে দেখতে পারেন। তবে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যও লেগো উপকারি হতে পারে। লেগো যেমন করে শিশুদের সৃজনশীলতা ও শেখার প্রবণতা বাড়ায় তেমনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও এই খেলনা সমভাবে উপকারিতা বয়ে আনতে পারে।
লেগোর সঙ্গে আবেগগত এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার বিষয়টিও যুক্ত। লেগো দিয়ে জটিল সব স্থাপনা নির্মাণের চর্চা করার মাধ্যমে জটিল কোনো কাজ সম্পন্ন করার মানসিক সক্ষমতাও অর্জন সম্ভব। আর বিশেষ করে মোটর দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের জন্য মস্তিষ্কের যে অংশটুকু ব্যবহৃত হয় তার উন্নয়নেও সহায়তা করে লেগো খেলার চর্চা। ধৈর্য্য এবং অধ্যাবসায় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২. ধাঁধার খেলা
ধাঁধার খেলাও নতুন কিছু নয়। কিন্তু বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কই বহুবছর ধরে ধাঁধার খেলা খেলেননি বললেই চলে। দ্য গ্রেট ব্রিটিশ পাজল কম্পানির মতে, ধাঁধার খেলা খেলে মস্তিস্কের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। মস্তিষ্কের মোটর দক্ষতার উন্নয়ন, হাত ও চোখের তৎপরতার সমন্বয় সাধন এবং এমনকি আত্মসম্মানবোধও বাড়ানো সম্ভব।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ধাঁধার খেলা খেলার মাধ্যমে মস্তিষ্কের জ্ঞানগত কর্মদক্ষতার উন্নয়ন ঘটে। এবং বয়স্কদের স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত হওয়ার গতিও ধীর হয়ে আসে।
৩. ডায়েরি লেখা
এমন অনেকেই আছেন যারা হয়তো কিশোর বয়সে ধর্মাচারণের মতোই ডায়েরি লিখতেন। এতে আমরা আমাদের সবচেয়ে গভীর চিন্তা, ভয় এবং আনন্দ নিয়ে লিখতাম। আর সেগুলোকে অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি করে আগলে রাখতাম।
কিন্তু অনেক আগেই ভুলে যাওয়া এই অভ্যাসটি আমাদের পুনরায় মনে করা উচিত। জার্নাল অফ এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের অনুভূতিগুলো লেখার মধ্য দিয়ে আমরা মূলত আমাদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলোকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাই।
লেখালেখি আমাদের জ্ঞানগত ভাণ্ডারকেও উম্মুক্ত করে। ফলে আমরা আরো বেশি ইতিবাচক তৎপরতায় মনোযোগ নিবদ্ধ করতে সক্ষম হই। যা আমাদেরকে কার্যকরভাবে মানসিক অবসাদের মোকাবেলা করতেও সহায়তা করে।
৪. ভিডিও গেমস খেলা
আগে ধারণা ছিল শিশুদের জন্য ভিডিও গেমস সাধারণত কুফলই বয়ে আনে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভিডিও গেমস খেলার অনেক উপকারিতাও রয়েছে।
গবেষকরা তাদের গবেষণায় দেখতে পেয়েছেন, ভিডিও গেমস শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটায়। এছাড়া সামাজিক ও জ্ঞানগত দক্ষতাও বাড়ায়। প্রাপ্তবয়স্কদের বেলায়ও একই ভুমিকা পালন করে ভিডিও গেমস।
এমনকি প্রাপ্ত বয়স্করা ভিডিও গেমস থেকে অর্জিত দক্ষতা কর্মক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে পারেন। “ইওর ক্যারিয়ার গেম” নামক বইয়ে বিশেষজ্ঞরা “মডার্ন ওয়ারফেয়ার ২” এর মতো ভিডিও গেমস কী করে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপকারি হতে পারে তা আলোচানা করেছেন। এতে আলোচনা করা হয় কী করে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিযোগীতামূলক পদ্ধতিতে বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করার মাধ্যমে কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারেন। বিশেষকরে চাকরি অনুসন্ধানকারীদের যখন চাকরি খুঁজতে খুঁজতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন।
৫. হস্তশিল্প বা কারুকর্ম
হস্তশিল্প বা কারুকর্ম করার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। যুক্তরাজ্যে ৩ হাজার ৫০০ বুনন শিল্পীর ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, বুননকর্ম সমাধা করার পর অর্ধেকেরও বেশি বুননকারী জানিয়েছেন, তাদের মানসিক উদ্বেগ এবং অবসাদ কমে এসেছে।
আর্ট থেরাপিতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যাগাজিনের পাতা থেকে কোলাজ তৈরি, কাঁদামাটি দিয়ে ভাস্কর্য্য নির্মাণ অথবা শুধু একটি মার্কার দিয়ে চিত্র আঁকার মাধ্যমে মানসিক অবসাদের চাপ অনেক কমে এসেছে।
আর নিয়মিত হস্তশিল্পের কাজ করলে দীর্ঘমেয়াদি উপকারিতা লাভ করা যায়। ২০১১ সালে দ্য জার্নাল অফ নিউরোসাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হস্তশিল্প কর্ম করা, গেমস খেলা এবং বই পড়ার মাধ্যমে হালকা জ্ঞানীয় বৈকল্যে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৩০-৫০% কমে আসে।
সূত্র: দ্য হাফিংটন পোস্ট


মন্তব্য