kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সমুদ্র আর আমাদের বাঁচাতে পারবে না!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৭:১৪



সমুদ্র আর আমাদের বাঁচাতে পারবে না!

বিশ্ব জলবায়ু উষ্ণায়নের বেশির ভাগ ধকলই বহন করেছে সমুদ্র। সেই সহ্যসীমাও এবার অতিক্রান্ত হয়েছে।

কারণ সমুদ্রের কোরাল সব মরে যাচ্ছে আর মাছের মজুদও দ্রুত কমে আসছে। আর এসব লক্ষণ দেখেই বুঝা যাচ্ছে সমুদ্র বিশ্ব জলবায়ু উষ্ণায়নের ধকল সহ্য করার সক্ষমতা হারাচ্ছে। এমনকি তা বিপৎসীমা অতিক্রম করার পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ইস্যুটিতে এই প্রথমবারের মতো ব্যাপক গুরুত্ব সহকারে নজর দেওয়া হয়েছে। আর তাতেই এই বিপজ্জনক লক্ষণগুলো ধরা পড়েছে।

মানুষ তো ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলগুলো ভুগতে শুরু করেছেন। যেমন চরমভাবাপন্ন আবহাওয়াগত ঘটনা। যার মধ্যে রয়েছে হারিকেনের মতো ঝড়। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।

আইইউসিএন এর মহাসচিব ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, "আমাদের প্রায় সকলেই জানি সমুদ্রই পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তথাপি আমরা সমুদ্রকে প্রতিনিয়ত আরো রোগগ্রস্ত করে চলেছি। "

১৯৭০ সাল থেকে বিশ্ব জলভাগ বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী মিত্র হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। কারণ সমুদ্র মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে নিঃসরিত ৯৩ শতাংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নিতে সক্ষম ছিল।

অ্যান্ডারসেন বলেন, "সমুদ্রের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করার ক্ষমতা না থাকলে বিশ্ব তাপমাত্রা আরো অনেক বেশি দ্রুত গতিতে বাড়ত। " গত সোমবার আইইউসিএন এর ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন কংগ্রেসে তিনি এসব কথা বলেন।

"স্পষ্টকরে বলেতে গেলে সমুদ্র যদি এতদিন আমাদের রক্ষা না করত তাহলে আমাদের নিম্ন বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে যেত। " বলেছেন আইইউসিএন এর গ্লোবাল মেরিন অ্যান্ড পোলার প্রোগ্রাম এর মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড কনজারভেশন এর প্রধান উপদেষ্টা ড্যান ল্যাফোলি।

বিপদগ্রস্ত জলভাগ
অ্যান্ডারসেন বলেন, "বিশ্ব তাপমাত্রা বর্তমানে যে হারে বাড়ছে তা অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যেই সমুদ্রের তাপমাত্রা আরো ১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে। আর আবহাওয়া, পরিবেশ, জলবায়ু এবং প্রাণ ও প্রকৃতিগত পরিবর্তনের (বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত) সময়কাল পরিমাপের মানদণ্ডে ২১০০ সাল মানে আগামী কাল!"

ল্যাফোলি বলেন, "সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার ব্যাপারে এবারের গবেষণাটি ছিল সবচেয়ে বড় কলেবরের এবং পদ্ধতিগতভাবেও সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন। ১২টি দেশের মোট ৮০ জন বিজ্ঞানী এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছেন। "

তিনি বলেন, "আমরা সমুদ্রে বসবাসকারী জীবাণু থেকে শুরু করে তিমি মাছের ওপর এবং পৃথিবীর এক মেরু থেকে অপর মেরু পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ চালিয়েছি। আমরা প্রধান প্রধান প্রতিটি প্রাণ ও প্রকৃতিগত একক (বাস্তুতন্ত্র) এর ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়েছি। গভীর সমু্দ্রের প্রাণ ও প্রকৃতিও এ থেকে বাদ পড়েনি। "

পর্যবেক্ষণে ধরা পড়া সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাটি হলো সমুদ্রের সমগ্র প্রজাতির জনসংখ্যা- যেমন প্ল্যাঙ্কটন, জেলি ফিশ, কচ্ছপ এবং সামুদ্রিক পাখি- সব মেরু অঞ্চলের দিকে ১০ ডিগ্রি অক্ষাংশ পর্যন্ত বসবাসের জন্য চলে যাচ্ছে। তারা এমন পানিতে গিয়ে বাসস্থান গড়ার জন্য স্থানান্তরিত হচ্ছে যা আগে তাদের জীবন ধারণের জন্য উপযোগী ছিল না। কারণ এত বেশি ঠাণ্ডা পানিতে তাদের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না। সামুদ্রিক প্রজাতিগুলো মেরু অঞ্চলের দিকে যে গতিতে অভিবাসী বা দেশান্তরী হচ্ছে তা ভূ-ভাগের প্রজাতিগুলোর উত্তর মেরুর দিকে দেশান্তরী হওয়ার গতির চেয়ে পাঁচগুণ বেশি দ্রুত।

বিশেষ করে মাছের প্রজাতিগুলোর তাদের চেনা-জানা গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব মৎস ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয় নেমে আসবে। উদাহরণত, দক্ষিণ এশিয়ায় মাছেরা তাদের ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার ফলে এ অঞ্চলের সমুদ্রে ২০৫০ সালের মধ্যে মাছের পরিমাণ ৩০ শতাংশ কমে আসবে। আর পূর্ব আফ্রিকা এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশের জেলেরা ইতিমধ্যেই তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায় হারিয়েছে। যেখানে তাপমাত্রা বাড়ার ফলে ইতিমধ্যেই প্রবাল প্রাচীর বা দ্বীপগুলো সব মরে গেছে এবং মাছের বেশ কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে।

বিশেষ করে প্রবাল প্রাচীর বা দ্বীপগুলোর জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে শোচনীয় হয়ে এসেছে যা অনেক দেশের পরিবেশগত ভ্রমণ শিল্পের প্রধান অবলম্বন। ওই প্রতিবেদন মতে, বিশ্বের অনেক অঞ্চলই তাদের প্রবাল প্রাচীর বা দ্বীপগুলোর ৫০ শতাংশ হারিয়েছে।

আর সর্বশেষ মডেল প্রতিবেদনগুলোতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যেই সমুদ্রের সব কোরাল দ্বীপ মরে যাবে।

এ ছাড়া সমুদ্রের কাছে বসবাসকারী বা সমুদ্রের সঙ্গে দৈনিন্দিন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় লিপ্ত জনগোষ্ঠীর মানুষেরাও বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ উষ্ণ সমুদ্রে প্যাথোজেন বা রোগজনক শক্তি, যেমন কলেরাবাহী ব্যাকটেরিয়া এবং স্নায়ুরোগ সৃষ্টিকারী অ্যালগাল ব্লুম দ্রুত ছড়ায়।

সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে আবহাওয়াও আরো চরমভাবাপন্ন হবে। কারণ এতে হ্যারিকেন এবং টাইফুন সৃষ্টি হবে বেশি বেশি। অ্যান্ডারসেন বলেন, সম্প্রতি একটি যুগল হ্যারিকেন হাওয়াইয়ে আঘাত হেনেছে যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিশ্ব তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মারাত্মক হ্যারিকেনের সংখ্যাও ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কারণ গরম পানিতে সহজেই ঝড় সৃষ্টি হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির নির্দিষ্টকালীন উষ্ণায়ন যা এল নিনো নামে পরিচিত তাও গত দুই দশকে আরো তীব্র রুপ ধারণ করেছে।

সমাধানের উপায় কী?
তাহলে, "কী করে আমরা দুনিয়া দোজখে পরিণত হওয়ার এই প্রক্রিয়া থামাতে পারি?," জিজ্ঞেস করেছেন সমুদ্র বিশেষজ্ঞ গ্রেগ স্টোন। তিনি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল এর নির্বাহী সহসভাপতি।

তিনি, সমুদ্রের সঙ্গে একজন অসুস্থ রোগীর মতো আচরণের পরামর্শ দিয়েছেন। যার তাপমাত্রা বাড়ছে। আর ওই তাপমাত্রা কমানোর জন্য কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ বন্ধ করে বায়ুমণ্ডলকে এখনই দূষিত করার প্রক্রিয়া বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আর এটি কোনো সহজ কাজ নয়।

আরেকটি সমাধান হলো সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চল বা অভয়ারণ্য তৈরি করা। এর মাধ্যমে ইতিমধ্যেই রুগ্ন হয়ে পড়া সমুদ্রকে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। এরপর হয়ত সমুদ্রের স্বয়ংক্রিয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় হলে সমুদ্র নিজেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই করবে। বলেছেন গ্রেগ স্টোন। তিনি অবশ্য এই প্রতিবেদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে একটি সুখবরও রয়েছে। মাত্র চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হাওয়াইয়ের পাপাহানাউমোকুয়াকী ম্যারিন ন্যাশনাল মনুমেন্টের আকার চারগুণ বাড়িয়েছেন। ফলে এখন সমুদ্রের ৫ লাখ ৮২ হাজার ৫৭৮ মাইলজুড়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যা যুক্তরাষ্ট্রের সমগ্র ন্যাশনাল পার্কের সমন্বিত আয়তনের চেয়েও বেশি।

বিজ্ঞানীরা আঞ্চলিক অর্থনীতিতে আসন্ন বিপর্যয় মোকাবিলা করার পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শও দিয়েছেন। উদাহরণত যদি কেলপ বন ধ্বংস হয়ে যায়, যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, তাহলে মাছ সম্পদের ব্যবস্থাপনায় কী করা হবে তা আগে থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে।

গ্লোবাল মেরিন অ্যান্ড পোলার প্রোগ্রামের পরিচালক কার্ল গুস্তাফ লুন্ডিন বলেন, এসব কিছুই শুনে হয়তো অনেক কঠিন মনে হতে পারে।

"কিন্তু এ ব্যপারে আমাদের সকলেরই মনে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমরাই এই সমস্যার মূলে। আর সমাধানের উপায়টি কী তাও আমারা জানি। আমাদেরকে শুধু এখন সমাধানের উপায়টি বাস্তবায়ন করতে হবে। "
সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক


মন্তব্য