kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডেঙ্গু ২০১৬ : এ সম্পর্কে আপনার যা কিছু জানা দরকার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৩:০৬



ডেঙ্গু ২০১৬ : এ সম্পর্কে আপনার যা কিছু জানা দরকার

গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ব্যাপকহারে বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে, বিশ্বব্যাপী ৩৯০ মিলিয়ন বা ৩৯ কোটি মানুষের ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে ৯৬ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ৬০ লাখেরই মেডিক্যালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

ডেঙ্গু জ্বর ও এর লক্ষণ
ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। ডেঙ্গু ভাইরাসগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত একটি ভাইরাসের সংক্রমণে এই জ্বর হয়। যাদের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ হয় তাদের ৮০ শতাংশের মধ্যেই বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়। আর এই ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্তদের মাত্র ৫ শতাংশ মারাত্মক রোগগ্রস্ত হন।
ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো উচ্চমাত্রার জ্বর, শরীরের জোড়াগুলোতে ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামান্দ্য, খাওয়ার রুচি নষ্ট হওয়া, বমি হওয়া, রক্তচাপের ওঠানামা ও ত্বকে অবিরাম বিশেষ ধরনের র‌্যাশ সৃষ্টি হওয়া।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু জ্বর এক সপ্তাহের বেশি সময় স্থায়ী হয় না। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা গুরুতর রূপ ধারণ করতে এবং রোগীর জীবনের জন্য হুমকি হতে পারে। ডেঙ্গুর ফলে রক্তকণিকা কমে যাওয়া, রক্তরস ফুটো হওয়া এবং মারাত্মক নিম্ন রক্তচাপের কারণে রোগীর জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার প্রথম ২ থেকে ৪ দিনের মধ্যেই এর লক্ষণগুলো পুরোপুরি ফুটে ওঠে। এরপর রোগীর দেহের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাওয়া এবং দেহ থেকে প্রচুর ঘাম বের হওয়ার ঘটনা ঘটবে। এরপর একদিন দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকবে এবং সুস্থ লাগবে। কিন্তু পুনরায় পরের দিন হঠাৎ করেই দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। আর সেসময়ই দেহে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তবে মুখে এ ধরনের ফুসকুড়ি খুব কমই দেখা যায়। হাত-পায়ের পাতাগুলোও গাঢ় লাল হয়ে যেতে পারে।

কারা আক্রান্ত হন
যে কেউই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে সাধারণত যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম তারাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন বেশি।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে কী করবেন
- সাধারণত সকালের শুরুতে এবং শেষ বিকেলে ডেঙ্গু ভাইরাস সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। দিনের এসব সময়ে সতর্ক থাকতে হবে।
-পৃথিবীর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং প্রায়-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকাগুলোতেই মহামারি আকারে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। এসব এলাকা থেকে আসা ভ্রমণকারীরা অন্যান্য এলাকাতেও ভাইরাসটি বহন করে নিয়ে যেতে পারেন।
-পানি সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থা, যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানিবদ্ধতা প্রতিরোধের মাধ্যমে ডেঙ্গু মশার সংখ্যা কমানো সম্ভব।
-দেহে মশা বিতাড়ক ব্যবহার ডেঙ্গু মশার আক্রমণের সংখ্যা কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভুমিকা পালন করতে পারে। তবে দেহে মশা বিতাড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ২ মাসের কম বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মশা বিতাড়ক ব্যবহার করবেন না। আর ২ মাসের বেশি বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মাত্র ১০ শতাংশ ডিইইটি যুক্ত মশা বিতাড়ক ব্যবহার করুন। তবে হাতের তালু এবং চোখের কাছে মশা বিতাড়ক ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। মশা বিতাড়ক ব্যবহারের আগে সব সময়ই মোড়কের নির্দেশনা মেনে চলুন। বিশেষ করে বাচ্চা, গর্ভবতী নারী এবং বাচ্চাদেরকে বুকের দুধ খাওয়ানো নারীদের দেহে মশা বিতাড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
-ঘুমানোর সময় কালো এবং আঁটোসাঁটো পোশাক পরা থেকে বিরত থাকুন। ঢিলেঢালা, সাদা ও লম্বা পোশাক পরুন। যা দিয়ে পুরো দেহ ঢেকে রাখা সম্ভব।
-শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। সুতরাং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পূর্ণ হাতাওয়ালা জামা পরার নিয়ম করলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ৫০% কমে আসবে।
-ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটলে সরকারের উচিৎ বিষয়টি গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা। যাতে জনগণ সতর্ক থাকতে পারেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার কারণে ডেঙ্গু নিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট করার প্রবণতাও পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে।

রোগ নির্ণয়
জ্বরের মাত্রার তীব্রতা কম বা বেশি যাই হোক না কেন, বর্ষাকালের যেকোনো ধরনের জ্বরকেই ডেঙ্গু জ্বর হিসেবে গণ্য করতে হবে। আর ডেঙ্গুর সংক্রমণ হলে যথাযথ চিকিৎসাগত পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। কারণ এতে দেরি করলে তা প্রাণনাশক হয়ে উঠতে পারে। তবে ৭ দিনের বেশি স্থায়ী হওয়া জ্বর ডেঙ্গু নয়।

চিকিৎসা
এই রোগের চিকিৎসার সঠিক কোনো রূপরেখার অভাবই পরিস্থিতিকে আরো বেশি কঠিন করে তোলে। প্রথম পর্যায়েই ডেঙ্গু শনাক্ত করা গেলে এবং যথাযথ চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করলে এতে মৃত্যুর হার কমে আসবে।

ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার যে পরামর্শ দেবেন এর মধ্যে বেশির ভাগই থাকবে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া, বিশ্রাম নেওয়া এবং বেশি বেশি তরল খাওয়া। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি পরিস্থিতির আরো অবনতি হয় তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হতে দেরি করবেন না।

ব্যথানাশক হিসেবে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ওষুধ খাওয়া যাবে না। এতে তীব্র আভ্যন্তরীণ রক্তপাতের আশঙ্কা আছে। মাথা, মাংসপেশি এবং শরীরের জোড়াগুলোর ব্যথা থেকে মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে।

আর কিছুক্ষণ পরপর স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রোগীকে ভেজা তোয়ালে দিয়ে ২০ মিনিট ধরে গা মুছে দিতে হবে। এতে দেহের তাপমাত্রা কমে আসবে। তবে সাবধান ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করা যাবে না।

টিকা
বিজ্ঞানীরা এখনও ডেঙ্গুর টিকা আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেক্সিকোতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে স্যানোফি প্যাস্তোর ডেঙভেক্সিয়া (সিওয়াইডি-টিডিভি) নামের একটি ওষুধের নিবন্ধন করেছে। এটিই ডেঙ্গুর প্রথম টিকা। এ ছাড়া আরো পাঁচটি টিকা এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আর ভারতে আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জিকা ভাইরাসের সংক্রমণও ঠেকাবে?
জিকা ভাইরাসেও ডেঙ্গুর সমগোত্রীয় রোগের সংক্রমণ হয়। যারা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে নিজ দেহে কঠোর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছেন তাদের জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
সূত্র : টাইমস অফ ইন্ডিয়া


মন্তব্য