kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


থামুন, আপনার শিশুটির খেলা দেখুন!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৩:১৩



থামুন, আপনার শিশুটির খেলা দেখুন!

আমি একটি নিবন্ধ নিয়ে কাজ করছি। একই সঙ্গে আমার মায়ের স্বাস্থ্য নিয়েও আমি উদ্বিগ্ন।

আর পরিবারের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটাতে না পারার কারণে মানসিকভাবেও পীড়িত বোধ করছি। আর আমার স্বামীও অফিসের দায়িত্ব পালনেই বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকেন।

এখন আমার সে দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে যখন আমরা প্রেম শুরু করেছিলাম। সে সময় সবকিছু কত সহজ ছিল। আমরা সব সময়ই নিজেদের জন্য ফ্রি সময় বের করে তা একসঙ্গে কাটাতাম। কিন্তু এখন করপোরেট জগতের সিঁড়িতে চড়ে বসার ফলে আমাদের নিজেদের জন্য সময় বের করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

এসব ভাবতে ভাবতেই আমি লক্ষ করলাম আমার ছোট্ট মেয়েটি তার পুতুল নিয়ে আপন মনে গল্পের জাল বুনে খেলা করছে। তাকে দেখে আমার নিজেরও আবার শিশু হয়ে যেতে ইচ্ছা জাগল। কারণ ওই সময়টাতে প্রতিশ্রুতি, ডেডলাইন, অর্থনৈতিক দায়ভার নামে কোনো টার্ম আছে কিনা তাও আমি জানতাম না।

আমার মেয়ে তার দিকে আমি তাকিয়ে আছি দেখতে পেয়ে আমাকে তার চকমকে পোশাক পরানো পুতুলটি দেখালো। আমি অনেকটা জোর করেই একটি মুচকি হাসি দিলাম। সে আমার কাছে তার পুতুলটি নিয়ে আসল সেটির স্কার্টটি ঠিক করে দেওয়ার জন্য। আমি অনেকটা আনমনেই তা করে দিলাম। পুনরায় সে খেলতে চলে গেল।

এরপর এলোমেলো মন নিয়েই আমি আমার ফোনটি খুলি। ই-মেইল, ফেসবুক এবং টুইটার চেক করতে শুরু করি। এ সময় আমার আঙুলগুলো ফেসবুকে এমন কিছু হাতড়ে বেড়াচ্ছিল যা দিয়ে হয়ত আমার মনের ভেতর যে হঠাৎ শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ করতে পারব।

কিন্তু আমার ভেতরের ঝড় কিছুতেই থামছিল না। আমার মেয়ে ফের তার পুতুলটির স্কার্ট ঠিক করে দেওয়ার জন্য আমার কাছে আসল। আমি এবার একটু বিরক্ত হলেও তার কাজটি করে দিলাম। এরপর সে ফিরে গিয়ে তার লেগো বক্সটি খুলল এবং লেগোর টুকরোগুলো বিছানার ওপর ছড়িয়ে দিয়ে পাগলের মতো কিছু একটা খুঁজতে লাগলো। আমি এ ধরনের এলোমেলো দৃশ্য খুবই অপছন্দ করি। কিন্তু আমার মনটাও যথেষ্ট এলোমেলো ছিল।

আমি আমার মেয়ের ওপর থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করি পাশে থাকা একটি বই হাতে নিয়ে। বইটি আমি অনেক উত্তেজনা নিয়ে অনলাইনে কিনেছিলাম। কিন্তু বইটির ৩০টি পৃষ্ঠাও আমি শেষ করতে পারিনি। আমার মেয়ে পুনরায় তার পুতুলটি নিয়ে আসলো। এবার আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। বিরক্তির সঙ্গে তার পুতুলটি আমি দূরে ঘরের এক কোণে ছুড়ে ফেলি। আমি তাকে ধমকের সুরে বলি, "তুমি যদি পুতুলটিকে পুনরায় স্কার্ট পরাতে না পারো তাহলে সেটি খোলার দরকার কি?" এতে সে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু তার এই আচরণের কারণ ব্যাখ্যা করে বলে, "মা সে এই মাত্র রাজাপ্রাসাদের একটি অনুষ্ঠান থেকে এসেছে। এখন তার ঘুমানোর সময়। সুতরাং সে আর স্কার্টটি পরে থাকতে চায় না। " এতে আমি খুবই বিরক্ত হই এবং মেয়ের এসব কাণ্ড-কারখানা থেকে মনোযোগ সরাতে পুনরায় আমার ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

আমি আমার সেসব মেয়ে বন্ধুদের কথা ভাবি যারা নিজেদের সন্তানদের পেছনে ফেলে রেখে বন্ধুদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে যায়। এমন কাজ করা হয়ত আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না। কিন্তু এর জন্য আমি পরিস্থিতির ওপর দায় চাপাতে চাই না। আসলে আমি নিজেও আমার মেয়ের প্রতি এতোটাই দূর্বল যে তার প্রয়োজনগুলো থেকে আমি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি না। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি পুনরায় আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, "মা তুমি ঠিক আছো তো? আমার আচরণে তুমি কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি দুঃখিত। " তার এ কথায় আমি বিগলিত হয়ে যাই এবং তাকে জড়িয়ে ধরে হাসি। সেও খুশি মনে ফিরে গিয়ে পুনরায় তার খেলনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

আমার মেয়েটি মনের সুখে তার খেলনাগুলো নিয়ে খেলা শুরু করে। আমিও তার খেলা দেখে আনন্দিত হই। সে এবার নিজের মনে একটি গল্প বুনতে শুরু করে। যে গল্পের শুরুটা সুখময় আর শেষটাও আনন্দময়। তার গল্পের মাধুর্যটা এবার আমি টের পাই! আমি বিস্মিত হই এই ভেবে যে, আমার ছোট্ট মেয়েটি বর্তমান নিয়েই বেশ সুখী। অথচ আমি আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শুধু শুধুই দুশ্চিন্তায় ভুগছি। যার ফলে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সরলভাবে চুটিয়ে উপভোগ করার আনন্দ থেকেই আসলে বঞ্চিত হচ্ছি। বিষয়টি বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আমার ফোনটি বন্ধ করে দেই এবং মেয়ের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠি এবং আমি নিজেও তার সুন্দর সুন্দর গল্পগুলোর অংশ হয়ে উঠি।
সূত্র : টাইমস অফ ইন্ডিয়া


মন্তব্য