kalerkantho


অতীত ভুলে জীবনযুদ্ধে অ্যাসিডদগ্ধ নাসরিন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০১:১০



অতীত ভুলে জীবনযুদ্ধে অ্যাসিডদগ্ধ নাসরিন

স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ডিভোর্স চেয়েছিলেন। সঙ্গে দুই মেয়েকেও নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন।

এইটুকুই অপরাধ ছিল লখনউয়ের নাসরিনের। শেষমেশ কোনো মেয়েকেই পাননি তিনি। পেয়েছেন ডিভোর্স, এবং তার সঙ্গে ভয়াবহ নরক যন্ত্রণা। সম্প্রতি এম টিভি চ্যানেলের রিয়্যালিটি শো ‘‌রোডিস ১৪’‌-‌এর অডিশনে আসেন নাসরিন। শোনান তাঁর করুণ কাহিনী। স্ত্রী হয়ে স্বামীকে তালাক দেবে, আবার দুই সন্তানকেও নিজের কাছে রাখতে চাইবে- এই ‘‌বেয়াদবি’‌ সহ্য হয়নি নাসরিনের স্বামীর। তাই তাঁর মুখে অ্যাসিড ছুড়ে ‘‌উচিৎ শিক্ষা’‌ দিতে চান তিনি। ঘন অ্যাসিডে ঝলসে যায় নাসরিনের মুখের ডান পাশ থেকে কোমর পর্যন্ত। চামড়া, মাংস গলে বিকৃত হয়ে যায় শরীরের ওপরের অংশ। এরপর শুরু হয় নাসরিনের কঠিন লড়াই। এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও সামান্যতম সাহায্য আসেনি পরিবার-‌পরিজনের থেকে। স্রেফ মনের জোর এবং হেরে না যাওয়ার জেদ নিয়ে লড়তে থাকেন তিনি। অবশ্য জন্মের পর জ্ঞান হওয়া থেকেই লড়াই তাঁর নিত্যসঙ্গী। খুব ছোটবেলায় নাসরিনকে ত্যাগ করে তাঁর আপন বাবা-‌মা। এরপর তাঁকে দত্তক নেয় একটি পরিবার। কিন্তু মেয়ে দত্তক নিয়ে খুশি হননি নাসরিনের নতুন মা। প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিতেন, তাঁর সঙ্গে পরিবারের রক্তের সম্পর্ক নেই। তারুণ্যে পা দিতেই জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় নাসরিনকে। এরপর নাসরিনের উপর চলতে থাকে মানসিক এবং শারীরিক অত্যাচার। নিজের দুই মেয়েকেও রেহাই দিত না তাঁর স্বামী। অবশেষে মেয়েদের সুস্থ জীবন দিতে বিবাহবিচ্ছেদের পথে হাঁটেন তিনি। বিচ্ছেদের মামলা চলাকালীন একদিন নাসরিনের সামনে এসে দাঁড়ায় তাঁর স্বামী। তিনি দেখেন, হাতে একটি ফ্রুট জ্যামের শিশি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। নাসরিনই ভালবেসে এই জ্যাম কিনে দিয়েছিলেন তাকে। আর সেই শিশিতেই অ্যাসিড ভরে এনে উপহার দেয় তাঁর মুখে ওই অ্যাসিড ছুড়ে। এরপর দুই মেয়েকে নিয়ে চলে যায় সে। অ্যাসিডে পুড়তে থাকা নাসরিনের অনেক অনুনয় বিনয়ের পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায় পড়শিরা। শুরু হয় তাঁর নরকযন্ত্রণা ভোগ। দীর্ঘ চিকিৎসায় তাঁর যাবতীয় সঞ্চয় বেরিয়ে যায়। অর্ধেক পুড়ে যাওয়া নাসরিনকে ঘরে জায়গা দিতেও রাজি হননি তাঁর মা। এমনকি আত্মীয়রা এগিয়ে এলেও তাঁদেরকে বারণ করে দেন তিনি। অবশেষে নাসরিনের এক দিদি একটি ছোট্ট নোংরা জায়গায় তাঁকে আশ্রয় দেন। সেই ঘরে ছিল না কোনও আসবাব। ঘরটি সামান্য পরিষ্কারও করে দেয়নি কেউ। পড়শিরা পালা করে খাবার দিয়ে যেত দু’‌বেলা। সেখানেই একা একা মাটিতে শুয়ে থাকতেন নাসরিন। ক্ষতের জন্য তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরত লাল পিঁপড়ে। সেই বীভৎস অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে নাসরিন বলেন, ‘‌জীবন্ত শরীর কুরে কুরে খাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করেছি আমি। সম্পূর্ণ শরীর না পোড়ায় হাসপাতালেও জায়গা দেয়নি কেউ। শেষে একদিন ডাক্তারের হাত ধরে বলেছিলাম, আমাকে কবর দিয়ে দিন। ’‌
তবে এতকিছুর পরেও হাল ছাড়েননি নাসরিন। সময়ের সঙ্গে শরীর এবং মনের ক্ষত শুকিয়ে এসেছে। অতীতকে ভুলে এখন অসীম সাহসে বুক বেঁধে তিনি নেমে পড়েছেন নতুন জীবনযুদ্ধে। চাকরি করে মোটামুটি ভালই আয় করতে শুরু করেছেন। তা থেকে উঠে আসছে ভাল জায়গায় চিকিৎসা করানোর খরচও। মেয়েদের পাননি। কিন্তু আপাতত নতুন জীবনেই দারুণ খুশি তিনি। নাসরিনের কাহিনী শুনে ‘‌রোডিস’‌-‌এর সঞ্চালক রণবিজয়, করণ কুন্দ্রা, প্রিন্স নারুলা এবং নেহা ধুপিয়া একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে স্যাল্যুট জানান। চিকিৎসাজনিত কারণে এইবার এই শোয়ে যোগ দিতে পারছেন না তিনি। কিন্তু চিকিৎসা শেষ হলে ‘‌রোডিস’‌-‌এর ‌পক্ষ থেকে তাঁকে ডেকে নেওয়া হবে বলে কথা দেওয়া হয়েছে। তাঁর চমকে দেওয়া জীবনকাহিনী এখন সমস্ত সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ভাইরাল।

সূত্র: আজকাল


মন্তব্য