kalerkantho

‘এ তবে কিসের আলামত?’

আজাদুর রহমান চন্দন   

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘এ তবে কিসের আলামত?’

১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের ২৩তম দিন। অগ্নিঝরা মার্চের এই দিনে ক্ষোভে উত্তাল ছিল ঢাকাসহ সারা দেশ। একদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পরামর্শক দল প্রহসনের আলোচনা চালাচ্ছিল, অন্যদিকে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নির্বিচারে গণহত্যা চালানোর সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সামরিক জান্তা। বাঙালি ভাবতেও পারেনি মাত্র একদিন পর তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক ভয়াবহ বিভীষিকাময় রাত।

এদিকে আলোচনার নামে প্রহসনে ক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি সামরিক জান্তার উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ‘বাংলার উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বরদাশত করা হবে না।’ পরদিন দৈনিক ইত্তেফাক বঙ্গবন্ধুর ওই হুঁশিয়ারিকেই প্রধান শিরোনাম করেছিল। পত্রিকাটিতে ছয় কলাম শিরোনাম ছিল ‘বাংলার উপর কোন কিছু চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা বরদাশত করা হইবে না’। নিচে কিছুটা ছোট টাইপে লেখা ছিল ‘সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের হুঁশিয়ারি’।

বাঙালিদের হত্যার জন্য চট্টগ্রামে যখন অস্ত্র নামানো হচ্ছিল, ঢাকায় তখন ইয়াহিয়ার পরামর্শকরা বৈঠক করছিলেন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ওই দিন সামরিক জান্তার পক্ষে আলোচনায় অংশ নেন এম এম আহম্মদ, বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান। সকালে ও সন্ধ্যায় দুই দফা বৈঠক চলে। বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, ইয়াহিয়ার কাছে দাবি জানালে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না। ‘বল এখন প্রেসিডেন্টের কোর্টে’ বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাক পরদিন প্রধান প্রতিবেদনের নিচে চার কলাম শিরোনাম করেছিল ‘আওয়ামী লীগের বক্তব্য শেষ—অবিলম্বে প্রেসিডেন্টের ঘোষণা চাই —তাজুদ্দীন’। এ বিষয়ে দৈনিক সংবাদ শিরোনাম করেছিল ‘অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা চলবে না ঃ তাজউদ্দীন’।

একাত্তরের এই দিন করাচি থেকে সোয়াত নামের একটি জাহাজ আসে। এতে পাঁচ হাজার ৬৩০ টন অস্ত্র আনা হয়। অস্ত্র নামাতে গিয়ে বাঙালি শ্রমিকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাকিস্তানি সামরিক অফিসারদের মুখের ওপর শ্রমিকরা অস্ত্র নামাতে অস্বীকৃতি জানান। অবরোধ করে রাখেন জাহাজটি। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এতে সঙ্গে সঙ্গে শহীদ হন স্বাধীনতাকামী বেশ কয়েকজন শ্রমিক। দৈনিক পূর্বদেশ পরদিন এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল ‘চট্টগ্রাম বন্দর জনতা ঘিরে রেখেছে’ শিরোনামে।

ওই দিন পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা একে একে ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের ছোট ছোট পার্লামেন্টারি দলের সব নেতাই এ দিন করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ভুট্টোর সফরসঙ্গী ১৩ জনের সাতজনই এদিন ঢাকা ছাড়েন। ২৩ মার্চ রাত থেকে ২৪ মার্চ সকাল পর্যন্ত সৈয়দপুর সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতলগাড়ি, গোলাহাট ও কুন্দুল গ্রাম ঘেরাও করে অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এতে ১০০ জন নিহত এবং এক হাজারেরও বেশি লোক আহত হয়। রাজধানীতেও বিভিন্ন স্থানে ওই দিন নাশকতা চালায় অবাঙালিরা। এসব নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক পরদিন ২৫ মার্চ প্রথম পাতায় একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল ‘এ তবে কিসের আলামত?’ শিরোনামে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এ তবে কিসের আলামত? চরমতম সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান যখন সদলবলে ঢাকায় বসিয়া সাড়ে সাত কোটি সত্যাগ্রহী বাঙ্গালরি অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত আলোচনায় রত এবং সে আলোচনার অগ্রগতির সংবাদে মানুষ যখন অনেকটা আশান্বিত, ঠিক তখনই আবার এ অশুভ সঙ্কেত কেন, গতকল্য (বুধবার) রাজধানী ঢাকার গণমনে এই প্রশ্ন না জাগিয়া পারে নাই।’

একাত্তরের ২৪ মার্চ দৈনিক সংবাদে আরেকটি শিরোনাম ছিল ‘ছাত্র ইউনিয়নের ডাকে বিরাট জনসভা ঃ বাংলার মানুষ কোন আপোস মানিবে না’। পরদিন পত্রিকাটির সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল ‘অসহনীয় অনিশ্চয়তা’।

একাত্তরের এই দিনে দৈনিক ইত্তেফাকে আট কলামজুড়ে প্রধান শিরোনাম ছিল ‘৭১-এর তেইশে মার্চের সুর ঃ আমরা শুনেছি ঐ, মাভৈঃ মাভৈঃ মাভৈঃ’।

 

 

মন্তব্য