kalerkantho

মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে—বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা

এম বদি-উজ-জামান   

২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে—বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা

১৯৭১ সালের ২০ মার্চ। পাকিস্তান শাসনের বিরুদ্ধে চলমান অসহযোগ আন্দোলনের ১৯তম দিনে সকালে কঠোর সামরিক পাহারায় রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পাকিস্তানের সে সময়কার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে চতুর্থ দফা আলোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ছয়জন শীর্ষস্থানীয় সহকর্মী উপস্থিত ছিলেন। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা চলে এই বৈঠক। আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বের হয়ে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। কাল আবার বৈঠক হবে। তিনি এর বেশি কিছু বলতে অপারগতা জানিয়ে বলেন, সময় এলে অবশ্যই আমি সব কিছু বলব। এরপর রাতে এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে বাংলার মানুষ প্রস্তুত রয়েছে। মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে একটি অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত। তিনি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

এদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাবেক নৌসেনাদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে তাঁরা মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা করতে একটি সম্মিলিত মুক্তিবাহিনী কমান্ড গঠনের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সাবেক সৈনিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

মুক্তিপাগল মানুষের দৃপ্ত পদচারণে আজ রাজধানী টালমাটাল হয়ে ওঠে। একের পর এক মিছিল সহকারে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হয়। তারা সেখানে শপথ গ্রহণ করে। এর পর একের পর এক শোভাযাত্রা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে সমবেত হয়। বঙ্গবন্ধু সমবেত জনতার উদ্দেশে একাধিক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, মুক্তিপাগল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়কে পৃথিবীর কোনো শক্তিই রুখতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। এ ছাড়া চারুকলার শিল্পীরা স্বাধীনতা পোস্টার বুকে বেঁধে অসহযোগ আন্দোলনে রাস্তায় বের হন। তাঁদের সমাবেশে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘২৩ মার্চ স্বাধীন পূর্ববাংলা দিবস’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানান।

একদিকে আলোচনা, অন্যদিকে গোপন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাঁর সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল হামিদ খান, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক টিক্কা খান, জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল ওমর, জেনারেল মিঠঠাসহ সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি গোপন বৈঠকে বসেন। এ বৈঠকে তিনি সামরিক প্রস্তুতির পর্যালোচনা করেন। এ বৈঠকে শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক ব্যর্থ হলে কী করণীয় হবে, তা আলোচিত হয় এবং ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুমোদন করা হয়। এ সময় প্রতিদিন সিংহল হয়ে একের পর এক ফ্লাইট বোয়িং-৭০৭ বিমানে করে সৈন্য ও রসদ ঢাকায় আনা হচ্ছিল এবং কয়েকটি জলজাহাজ পূর্ণ করে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হচ্ছিল। অসহযোগ আন্দোলন শুরুর দিকে বাংলাদেশে স্থলবাহিনীর শক্তি ছিল এক ডিভিশন, ২০ মার্চ তা এসে দাঁড়ায় দুই ডিভিশনের অধিক।

এরই মধ্যে কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানা ও জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মুফতি মাহমুদ পৃথক বৈঠকে মিলিত হন।

পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম কৌঁসুলি এ কে ব্রোহি এদিন সকালে করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। এরপর তিনি হোটেল কন্টিনেন্টালে কাউন্সিল মুসলিম লীগ সভাপতি মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ দৌলতানা, ন্যাপপ্রধান খান আবদুল ওয়ালী খান, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মুফতি মাহমুদ, পাঞ্জাব কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান সরদার শওকত হায়াত খান, বেলুচিস্তানের ন্যাপ নেতা গাউস বঙ্ বেজেঞ্জা প্রমুখ নেতার সঙ্গে আলোচনা করেন।

এদিন পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি লন্ডন পরিকল্পনা (যা ১৯৬৯ সালে লন্ডনে বসে শেখ মুজিব, খান আবদুল ওয়ালী খান ও মিয়া মমতাজ মোহম্মদ খান দৌলতানা কর্তৃক প্রণীত) মানবেন না। তিনি বলেন, ওই পরিকল্পনা আওয়ামী লীগপ্রধান কর্তৃক ঘোষিত ছয় দফার ভিত্তিতেই করা হয়েছে।

মন্তব্য