kalerkantho

গবেষণাগারের আড়ালে হাসিবের ‘মাদক ল্যাব’

এস এম আজাদ   

১৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গবেষণাগারের আড়ালে হাসিবের ‘মাদক ল্যাব’

হাসিব মুয়াম্মার রশিদের (৩২) বাবা প্রকৌশলী। মা করতেন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা। পাঁচ ভাই-বোনের কেউ প্রকৌশলী আবার কেউ চিকিত্সক। তাঁদের মধ্যে দুজনের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বাস। হাসিব নিজেও প্রকৌশলী। রাজধানীর জিগাতলায় আছে তাঁদের ছয়তলা বাড়ি। এমন সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান হয়েও বেশি টাকার নেশায় নতুন মাদক তৈরির এক ভয়ংকর কারবারে নামেন হাসিব। মালয়েশিয়ায় পড়তে গিয়েই ‘আইস’, ‘ক্রিস্টাল মেথ’ ও ‘এমডিএমএ’ মাদকের ব্যাপারে তথ্য পান তিনি। সাত বছর আগে দেশে ফিরে প্রথমে ইয়াবা এবং পরবর্তী সময়ে অপ্রচলিত মাদকের কারবার শুরু করেন তিনি। বাড়ির নিচে গবেষণাগারের নামে গড়ে তোলেন ‘মাদক ল্যাব’। এ ল্যাবে ওষুধ থেকে সিইড্রোঅ্যামফিটামিন (ইয়াবার উপাদান) বের করে আইস ও

এমডিএমএ বানাচ্ছিলেন তিনি। এরপর নিজের সিন্ডিকেটে এসব মাদক বাজারে ছেড়েছেন। তবে ধরা পড়ে যাওয়ায় তাঁর উদ্দেশ্য আর সফল হয়নি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে হাসিবের এমন অনেক তথ্য বেরিয়ে আসছে। ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের নির্দেশে হাসিবকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি তাঁর কারবারের সিন্ডিকেট শনাক্ত, লেনদেন ও যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ব্যাপারে তদন্ত চলছে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ক্রিস্টাল মেথ, আইস, এমডিএমএ জব্দের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি এবং জাতিসংঘের মাদক অপরাধবিষয়ক দপ্তর ইউএনওডিসি তথ্য চেয়েছে। এ কারণে হাসিব দেশের ভেতরেই শুধু এ কারবার করতেন, নাকি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট এর সঙ্গে জড়িত তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

জানতে চাইলে ডিএনসির সহকারী পরিচাছলক (ঢাকা উত্তর) মোহাম্মদ খোরশিদ আলম বলেন, ‘গত শনিবার গ্রেপ্তারের পর রবিবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে হাসিবের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। বিজ্ঞ আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।’

ডিএনসির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসিবের বাবা এফ এম রাশিদুজ্জামান সত্তরের দশকে বুয়েট থেকে পাস করা প্রকৌশলী। তাঁর মা ফেরদৌস আরা জামান সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। হাসিবের পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বড় ভাই সফটও্যার প্রকৌশলী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। আরেক বোনও সেখানে আছেন। হাসিব তৃতীয়। তাঁর আরেক ভাই চিকিত্সক। ছোট ভাইও প্রকৌশলবিদ্যায় পড়ছেন।

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে মালয়েশিয়ার নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সফটও্যার বিজ্ঞানে পড়তে যান হাসিব। ২০১০ সালে বিএসসি শেষ হলে ২০১১ সালে দেশে ফেরেন তিনি। সেখানে তিনি মাদক হিসেবে ক্রিস্টাল মেথ ও এমডিএমএ ব্যবহারের তথ্য পান। দেশে ফিরে তিনি প্রথমে ইয়াবা কারবারে যুক্ত হন। এরপর জিগাতলার ৭/এ রোডের ৬২ নম্বর (ছয়তলা) বাড়ির নিচতলায় একটি ল্যাব গড়ে তোলেন। বাড়ির ও বাইরের সবাইকে তিনি এটি গবেষণাগার বলে জানাতেন। ওই গবেষণাগারে ঢুকতে পাসওয়ার্ড লাগে। তিনি ও তত্ত্বাবধায়ক এস এম জাহাঙ্গীর আলম ছাড়া কেউ সেখানে ঢুকতে পারত না। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বাড়িতে অভিযানের সময় জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। 

হাসিব জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, দেশে ইয়াবার ব্যাপারে সতর্কতা তৈরি হলেও আইসসহ নতুন মাদকগুলোর ব্যাপারে সাধারণ লোকজন এবং প্রশাসন কম জানে। এসব মাদক ইয়াবার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও ক্ষতিকর। এসব মাদকের দামও বেশি। দ্রুত বেশি টাকা আয় করা যাবে—এমন পরিকল্পনায় তিনি তৈরি ও বিক্রি করতেন। কত দিন ধরে  এবং কাদের মাধ্যমে বিক্রি করতেন, সেসব ব্যাপারে হাসিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, হাসিবের ল্যাব থেকে ১৩ ধরনের উপাদান ও উপকরণ জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ইয়াবার কাঁচামাল সিউড্রোঅ্যামফিটামিন ও মিথাইন অ্যামফিটামিন ছিল। দেশে এসব উপাদান নিষিদ্ধ। হাসিব দাবি করছেন, তাঁর প্রকৌশলবিদ্যা এবং মালয়েশিয়ান বন্ধুদের মাধ্যমে এ মাদক সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে। তবে তদন্তকারীরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

ডিএনসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সম্প্রতি ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানীসহ অভিজাত এলাকায় আইস মাদক ব্যবহারের তথ্য পান ডিএনসির গোয়েন্দারা। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ইস্কাটন থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর সূত্র ধরে হাসিবের জিগাতলার ল্যাবের খোঁজ মেলে। পরে গত শনিবার মিরপুরের পাইকপাড়া থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মন্তব্য