kalerkantho

‘জনতার সংগ্রাম চলবে’

আজাদুর রহমান চন্দন   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘জনতার সংগ্রাম চলবে’

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতেও সারা দেশে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ ছিল বন্ধ। সব সরকারি ভবন, হাটবাজার এমনকি পাড়া-মহল্লায়ও উড়ছিল প্রতিবাদের কালো পতাকা। কোথাও কোথাও বাংলাদেশের নতুন পতাকাও উড়তে থাকে। মহল্লায় মহল্লায় গড়ে উঠছিল সংগ্রাম কমিটি। সব বয়স, পেশা ও শ্রেণির মানুষ বেরিয়ে আসছিল রাজপথে।

তবে ওই সময়ে স্বাধীনতার আন্দোলনকে আরো উজ্জীবিত করতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন শিল্পীরাও। রাজপথে, মাঠে-ময়দানে তখন গণসংগীত, নাটক, পথনাটক ও পথসভা করে চলছিল উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বেতার-টেলিভিশন শিল্পী সংসদ, মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন। এর প্রতিফলন দেখা যায় সংবাদপত্রের পাতায়ও।

একাত্তরের এই দিনে (১৬ মার্চ) তখনকার অন্যতম প্রধান দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় শিরোনাম হয়েছিল ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ : জনতার সংগ্রাম চলবে’। ওই দিন পত্রিকাটিতে আরেকটি শিরোনাম ছিল ‘আওয়ামী লীগ সাহায্য তহবিলে বিভিন্ন সংস্থার চাঁদা’। শীর্ষস্থানীয় অন্য দৈনিক ইত্তেফাক সেদিন প্রথম পাতায় পাঁচ কলামজুড়ে ছবি ছেপেছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আগের দিন সন্ধ্যায় বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ আয়োজিত গণসংগীত অনুষ্ঠানের। ওই দিন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘আজ মুজিব-ইয়াহিয়া সাক্ষাৎকার’। নিচে তিন কলাম ছপি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলের। আগের দিন ঢাকায় প্রেসিডেন্ট হাউসের সামনে ওই বিক্ষোভ হয়েছিল।

একাত্তরের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বৈঠক হয়েছিল। তাতে সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং বাঙালিদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করাসহ বিভিন্ন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে এর জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে বিচার দাবি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালি হত্যার প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে বঙ্গবন্ধু অংশ নেন বৈঠকে। সকাল থেকেই উত্সুক জনতা অপেক্ষা করছিল বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া বৈঠকের ফল কী হয় তা জানতে। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া বৈঠকটি শেষ হয়েছিল দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ইয়াহিয়ার কাছ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া বৈঠক চলা অবস্থায়ই স্বাধীনতাকামী বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামে গোটা বাংলা কার্যত অচল ছিল। ১ মার্চ থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল বাংলাদেশের। সামরিক জান্তার কোনো আদেশ-নির্দেশই মানছে না বীর বাঙালিরা। একমাত্র সেনাছাউনি ছাড়া পাকিস্তানের অস্তিত্বই ছিল না কোনো জায়গায়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আলোচনার জন্য ঢাকায় অবস্থান করলেও ভেতরে ভেতরে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল সামরিক জান্তার। কেননা তারা বুঝতে পেরে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করবে না। তাই আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে ভেতরে ভেতরে সামরিক শক্তি বাড়ানো হচ্ছিল। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে গোপনে সারা দেশে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টি।

 

মন্তব্য