kalerkantho


একুশের চেতনায় অভূতপূর্ব সমাগম

নওশাদ জামিল   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



একুশের চেতনায় অভূতপূর্ব সমাগম

মহান একুশে ফেব্রুয়ারির দিন গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রন্থমেলায় ছিল দিনভর বইপ্রেমীসহ সর্বস্তরের মানুষের বিপুল সমাগম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণে অবিরাম জনস্রোতে অভূতপূর্ব এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রতিটি প্রবেশ পথে ছিল মানুষের দীর্ঘ সারি। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তবেই প্রবেশ করতে হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের গ্রন্থমেলায়। তার পরও ক্লান্তি কিংবা বিরক্তির ছাপ ছিল না কারো চোখে-মুখে। প্রাণের মেলায় আসা মানুষের এই ভিড় মেলার বাইরে ছড়িয়ে ছিল টিএসসি, দোয়েল চত্বরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে।

একুশের চেতনায় গতকাল সব পথ মিশে যায় শহীদ মিনারে। শহীদ বেদিতে ফুলের শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাই চলে আসেন একুশের বইমেলায়। গতকাল বইমেলার দ্বার খোলে সকাল ৮টায়। চলে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। আজ শুক্রবার গ্রন্থমেলার দ্বার খুলবে সকাল ১১টায়। এরপর দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর।

গতকাল গ্রন্থমেলার দুই প্রাঙ্গণেই ছিল বিপুল মানুষের উপস্থিতি। মেলা প্রাঙ্গণে একটু স্থির দাঁড়ানো ছিল দুষ্কর। দিনভর বইয়ের বিক্রিও হয়েছে আশানুরূপ।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের অন্যতম পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক বলেন, ‘টানা তিন দিন সরকারি ছুটি থাকায় অনেকে বেড়াতে গেছেন বিভিন্ন জায়গায়। এর মধ্যে পুরান ঢাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শোকাবহ পরিবেশ। তার পরও মেলায় এমন ভিড় সত্যি নজিরবিহীন। বইয়ের বিক্রিও বেশ হয়েছে।’

গতকাল বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে বক্তৃতা। ‘বাংলা ভাষার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক একুশে বক্তৃতা প্রদান করেন ভাষাসংগ্রামী জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানের শুরুতে পুরনো ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস বহু অবদান ও পরম্পরায় ঋদ্ধ। এ নিয়ে কোনো সরলিকীকরণের সুযোগ নেই। এই ভাষা ও সাহিত্য যেমন প্রাচীন চর্যার ধারাবাহিকতায় পুষ্ট তেমনি মধ্যযুগের মুসলিম অবদানেও সমৃদ্ধ।’

আনিসুজ্জামান বলেন, ‘স্বাধীনতার পর পর বাংলা ভাষার ব্যবহারে আমরা ব্যাপক উৎসাহ দেখালেও এখনো সুচারুরূপে বাংলার ব্যবহারে পূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের এ বিষয়ে সচেতনতা এবং স্পষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন।’

একুশতম দিনে গতকাল গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় ৩৯৬টি নতুন বই। তার মধ্য থেকে চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

গল্পের নদীতে খেয়া ঘাট : কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের গল্পের বই। অসম্ভব মায়াবী ভাষায় এ দেশের বিভিন্ন পেশার মানুষ, তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে তিনি নিপুন কারিগরের মতো এঁকেছেন গল্পগুলোয়। প্রকাশক পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। দাম ৫০০ টাকা।

সুভাষিত : বিশিষ্ট কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতার বই। এ গ্রন্থের  কবিতায় কবি মেলে ধরেছেন প্রেম, প্রকৃতি, যাপিতজীবনের একান্ত অনুভবরাশি। বইটির কবিতার ভাষাভঙ্গিমায় যেমন চমৎকারিত্ব রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিষয় ও আঙ্গিকের অভিনবত্ব। প্রকাশক য়ারোয়া বুক কর্নার। দাম ২০০ টাকা।

ক্র্যাক প্লাটুনের অদম্য গেরিলা : সাংবাদিক ও গবেষক আজাদুর রহমান চন্দনের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখকের গবেষণা ও আগ্রহ দীর্ঘদিনের। বইটিতে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ট ও গবেষণালব্ধ ইতিহাস ও বিবরণ। প্রকাশক প্রগতি প্রকাশনী। পরিবেশক জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী। দাম ১১০ টাকা।

নিষ্পত্তি : তাবারক হোসেনের উপন্যাস। প্রেম, বাস্তবতা, জীবনের টানাপড়েন ঘিরে আবর্তিত হয়েছে উপন্যাসের আখ্যান। প্রকাশক অন্যপ্রকাশ। দাম ৩৫০ টাকা।

লেখক বলছি মঞ্চ : গতকাল মেলার লেখক বলছি মঞ্চে নিজেদের সাম্প্রতিক বই নিয়ে কথা বলেন পাঁচ কবি-সাহিত্যিক। এঁদের মধ্যে ছিলেন গবেষক তপন পালিত, কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান, কবি খালেদ হোসাইন, রাহেল রাজিব এবং ফারুক ওয়াসিফ।

তিন সপ্তাহে সাড়ে তিন হাজার নতুন বই : বাংলা একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মেলার প্রথম ২১ দিন পর্যন্ত তিন হাজার ৩৬৩টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গল্প ৫৪৭, উপন্যাস ৫১৩, প্রবন্ধ ১৯০, কবিতা ১০৭৫, গবেষণা ৫৩, ছড়া ৮১, শিশুসাহিত্য ৮৯, জীবনী ১১৭, রচনাবলি ৭, মুক্তিযুদ্ধ ৮৪, নাটক ৩১, বিজ্ঞান ৬১, ভ্রমণ ৬৯, ইতিহাস ৫৪, রাজনীতি ২৫, স্বাস্থ্য ২১, রম্য/ধাঁধা ২০, কম্পিউটার ৩, ধর্মীয় ১৫, অনুবাদ ২৮, অভিধান ৪, সায়েন্স ফিকশন ৩৭ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ২৩৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে।

মেলামঞ্চের আয়োজন : গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে সকালে অনুষ্ঠিত হয় স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। এতে দেড় শতাধিক নবীন-প্রবীণ কবি কবিতা পাঠে অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন কবি অসীম সাহা। সন্ধ্যায় কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, হাসান হাফিজ, কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, জাফর আহমদ রাশেদ প্রমুখ।

আজকের আয়োজন : আজ শুক্রবার বিকেলে মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার শতবর্ষ : ফিরে দেখা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. মাহবুবুল হক। আলোচনায় অংশ নেবেন সাইফুদ্দীন চৌধুরী, আলী হোসেন চৌধুরী এবং এম আবদুল আলীম। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী।



মন্তব্য