kalerkantho

প্রাণের বইমেলা

টিটু দত্ত গুপ্ত    

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রাণের বইমেলা

পুরো বছর বইয়ের একটা পাতা উল্টানো হয় না, বইমেলায় আসা এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। একা, পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধু-স্বজনের সঙ্গে তারা মেলায় আসে। মোবাইল ইন্টারনেট থেকে চোখ সরায় না, এমন শিশু-কিশোর ও তরুণরাও আসে মেলায়। তারা আসে মা-বাবার হাত ধরে কিংবা দল বেঁধে, জুটি বেঁধে। প্রাণের মেলা, আবেগের মেলা, চেতনার মেলা, মিলনমেলা, যে যা-ই বলুক, অন্তত এক দিন সময় করে ধুলা-ধূসরিত বইমেলায় আসতেই হয়।

মধ্যবিত্তের আভিজাত্য বলে একটা কথা আছে। বাণিজ্য মেলায় না গেলেও চলে। কিন্তু ‘বইমেলায় যাইনি’ বলতে খানিকটা সংকোচ তো লাগেই। আর গেলে খালি হাতে ফেরে কম মানুষই। বাচ্চাদের জন্য তো কিনতেই হয়, দু-একটা বই উপহার দিতে হয়, আবার চেনা-জানা লেখক-কবির বইও কিনতে হয় ইচ্ছা-অনিচ্ছায়। ছেলে-মেয়ের পাঠ্য বই বা গাইড বইয়ের দোকান ছাড়া পারতপক্ষে যারা আজিজ সুপারমার্কেট বা নিউ মার্কেটের বইপাড়ার ছায়া মাড়ায় না, বাংলা একাডেমির বইমেলায় তাদেরও কিছু বই কেনা পড়ে। পড়ুয়া বোদ্ধা মানুষের কথা আলাদা। তারা সব সময় বই কেনে ও পড়ে। বছরজুড়ে বইপাড়ায়, ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলায়। 

নীলক্ষেত মার্কেটে সারি সারি দোকান স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বই, গাইড বইয়ে ঠাসা। দিনভর বেচাকেনায় ব্যস্ত বিক্রয়কর্মী। উল্টো চিত্র সৃজনশীল সাহিত্য বইয়ের দোকানে। সেখানে ক্রেতার প্রতীক্ষায় ঝিমায় বিক্রয়কর্মীরা। সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকদের জন্য সবচেয়ে বড় মৌসুম একুশে বইমেলা। এই একটা মাসের জন্য বছরজুড়ে তাদের অপেক্ষা, বিনিয়োগ। প্রতিষ্ঠিত বড় লেখকদের পাণ্ডুলিপির জন্য তারা বছরজুড়ে লেগে থাকে, তাগিদ দেয়। অন্যদিকে নতুন লেখকরা তাদের পেছন পেছন ঘুরে, ছাপানোর খরচ বা ২০০-৫০০ বই কিনে নেওয়ার শর্তে মেলায় বই প্রকাশের সুযোগ পায়।

কলেবর, ব্যাপ্তি, আবেগ, দর্শক-ক্রেতার উপস্থিতি, সব মিলিয়ে একুশে বইমেলা অনন্য। ফ্রাংকফুর্ট, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, দিল্লির মতো বইয়ের বৈশ্বিক মেলা তিন থেকে সাত দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। এসব মেলা মূলত বাণিজ্যিক। প্রকাশক, লেখক, ক্রেতা-বিক্রেতারা আসে। কেনাকাটা করে, চেনাজানা হয়, নতুন নতুন ব্যাবসায়িক চুক্তি হয়। প্রাণের ছোঁয়া নেই। কিন্তু এই প্রাণের ছোঁয়া রয়েছে একুশে গ্রন্থমেলায়। এটিও মিলনমেলা, এখানেও বাণিজ্য আছে, তবে আবেগটাই মূল চালিকাশক্তি।

মেলার প্রথম ১৭ দিনে আড়াই হাজারের বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। গড়ে দিনে দেড় শ বই। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত সব বয়সী মানুষের উচ্ছলতা, ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে নিজের লেখা নিয়ে নতুন লেখকের কথা বলা, নজরুল মঞ্চ থেকে একের পর এক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, মূল মঞ্চে প্রতিদিনের গুরুগম্ভীর সাহিত্য আলোচনা, সব মিলিয়ে মুখরিত বইমেলা। লেখক-পাঠক ও প্রকাশকরা খুশি। আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিরও বিক্রি এবার বেড়েছে। নতুন লেখকরাও সমাদৃত হচ্ছে। এ পর্যন্ত মেলায় তরুণ লেখকদের ৭০০ বই প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, গোয়েন্দা, বিজ্ঞান, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতির বই। কী নেই এই মেলায়!

তবে মাসব্যাপী অনন্য আবেগঘন এ উৎসব আন্তর্জাতিক বইমেলার বর্ষপঞ্জিতে ঠাঁই পায়নি। পাশের দেশ ভারতের কলকাতা বইমেলার বিবরণও আছে সেখানে, অন্যতম বৃহত্তম বইমেলা হিসেবে চিহ্নিত সেটি। অথচ বাংলা একাডেমি আয়োজিত এই বইমেলায় বিক্রি গত বছর ছিল ৭০ কোটি টাকা। কলকাতা বইমেলায় ছিল ২২ কোটি টাকা। বইমেলার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একুশে বইমেলা নিয়ে একটি শব্দও খুঁজে পাওয়া যায় না।

আসলে একুশের বইমেলাকে আমরা নিজেরাই আমাদের করে রেখেছি। নীতিমালায় রয়েছে, এ মেলা হবে বাংলাদেশি লেখকের বাংলা ভাষায় লেখা বইয়ের মেলা। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল, আবেগে উচ্ছল আমাদের একান্ত নিজস্ব এ বইমেলার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনুপস্থিতি নিয়ে হা-হুতাশের কিছু নেই।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বললেন, ‘আমাদেরও ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ারের ক্যালেন্ডারে যেতে হবে। আমাদের ব্যাপ্তি দেশের ভেতরেই। আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি আমাদের নেই। কলকাতা বুক ফেয়ারেরও ছিল না। এখন তারাও ইন্টারন্যাশনাল ক্যালেন্ডারে চলে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, “একুশ আমাদের চেতনা। মননের স্মারক। তাই এ মেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। তবে এ ধরনের গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান বিশ্বের কোথাও বইমেলার আয়োজন করে না। সাধারণত প্রকাশকদের সংগঠন অথবা আলাদা কোনো সংস্থা এ ধরনের মেলার আয়োজন করে থাকে। আমাদের দেশেও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ার’ আয়োজন করেছিল একসময়। তবে তা অব্যাহত থাকেনি। তাদের এটি আবার শুরু করা উচিত।”

চলতি বছরের অক্টোবর বা নভেম্বরে আন্তর্জাতিক একটি বইমেলার আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলা একাডেমির। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবও আয়োজন করা হবে। আমন্ত্রণ জানানো হবে আন্তর্জাতিক প্রকাশক ও সাহিত্যিকদের।

বিশ্বের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের যোগসূত্র স্থাপনের আরো উদ্যোগ নিয়েছে বাংলা একাডেমি। ধ্রুপদী সাহিত্যের পাশাপাশি সমকালীন সাহিত্য ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, আরবিসহ প্রধান কয়েকটি ভাষায় প্রকাশের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। শুধু বই প্রকাশ নয়, বিপণনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্যে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, ফ্রাংকফুর্ট, টোকিও বইমেলাভিত্তিক এজেন্ট নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে বাংলা একাডেমির।

অনুবাদক ও বহুভাষী কবি ইসফানদিয়র আরিওনের মতে, অমর একুশে বইমেলা অবশ্যই পাঠক ও লেখক তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। যে ছোট শিশু মা-বাবার হাত ধরে বইমেলায় আসছে, তার মধ্যেও তো রয়েছে সুপ্ত পাঠক কিংবা লেখক। তবে বাংলা প্রকাশনার বার্ষিক এই আয়োজন বিশ্বসাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্নই থেকে যাচ্ছে। লেখক বদরুদ্দীন উমরের পিতা আবুল হাশিমের লেখা ‘অ্যারাবিক মেড ইজি’ বইটি আরবি ভাষা শিক্ষার বিশ্বব্যাপী পঠিত সহায়ক বই। বইটি তিনি কিনেছেন জার্মানি থেকে। বইটি প্রকাশ করেছে দিল্লির কিতাববিতান। আমাদের লেখকদের ক্লাসিক বই আমরা বিশ্বসভায় তুলে ধরতে পারিনি।  

মানসম্মত প্রকাশনা নিশ্চিত করা এবং প্রতিভাবান নতুন লেখকদের উৎসাহিত করার জন্য একটা স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ বা সম্পাদক প্যানেল থাকা দরকার বলে মনে করেন ইসফানদিয়র আরিওন। প্রকাশের আগে যাচাই-বাছাই করবে এই প্যানেল, প্রকাশের পর তাঁরা নির্বাচিত বইয়ের রিভিউ করবেন, পাঠকদের মতামতও নেবেন। এতে নতুন সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটবে, পাঠকরাও তাঁদের চিনতে পারবে।

মন্তব্য