kalerkantho


এক প্রহর বইমেলায়

রিদওয়ান আক্রাম

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



এক প্রহর বইমেলায়

২০১০ সালে অনুভূতিটা প্রথমবারের মতো হলো। সেটা বজায় রইল ২০১১ সালেও। এ দুই বছর আমার কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। তো এ দুই বছর একুশে বইমেলায় গেলাম মনমরা হয়ে। আর অনুভূতি ছিল অনেকটা ‘বউ ছাড়া শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার মতো’। যা হোক ২০১২ সালে সেটা কেটেও গিয়েছিল। এ বছর আবার কেন জানি তেমন অনুভূতি হচ্ছে! কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা নয়। এ বছর একটা হলেও আমার নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ১০ বছর পর আমার তৃতীয় বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণও এসেছে এবারের বইমেলায়। এই অনুভূতিটাও নতুন। এরপরও সব কিছু ছাপিয়ে ‘বউ ছাড়া শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার’ অনুভূতিটা কেন জানি যাচ্ছেই না। সহকর্মী ও কবি মাসুদ হাসান ভাই ধরে-বেঁধে নিয়ে গেলেন বলে রক্ষে। আমার পাল্লায় পড়ে বেশ খানিকটা সময় অপচয় হলো তাঁর। শেষমেশ আমাকে পাকড়াও করেই ছাড়লেন।

দিনটা শুক্রবার ছিল বলে রক্ষে! না হলে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার হ্যাপার কথা ঢাকাবাসী মাত্রই জানেন। শহরের অন্যান্য সড়ক ফাঁকা থাকলেও প্রেস ক্লাব থেকে বইমেলার উত্তাপটুকু টের পাওয়া গেল। রিকশার মিছিলে শামিল হয় আমাদের তিন চাকার বাহনটি। দোয়েল চত্বরে সেটাকে বিদায় জানালাম। দিনের আলো কমে আসছে। আজানও ভেসে এলো কানে। মাসুদ ভাই বললেন, ‘মেলায় ঢোকার আগে দুই-তিনটা শিঙাড়া সাপটে গেলে কেমন হয়?’

তথাস্তু বলে শিঙাড়াগুলোর ওপর ঝাঁপিয়েই পড়তে যাচ্ছিলাম; কিন্তু ওনারা বেশ ‘গরম’ থাকায় রণে ভঙ্গে দিতে হলো। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে ‘মুখখানা পুড়িয়ে’ মেলায় ঢুকতে হলো। নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্যকে সুবোধ নাগরিকের মতো অনুরোধ করলাম আমার পিঠের ঝোলাখানা দেখতে। ভদ্রলোক মনে হয় বেশ ক্লান্ত ছিলেন, তিনি পাশে থাকা আরেক পুলিশ সদস্যের কাছে আমার অনুরোধটি চালান করে দিলেন। সেই ভদ্রলোকও বেশ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ঝোলাখানা দেখে আমাকে ভেতরে যাওয়ার সদয় অনুমতি দিলেন।

মেলায় ঢুকেই মনে হলো কোথা থেকে শুরু করব? বিশাল বইমেলা বলে কথা! যাঁরা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে এসেছিলেন সকাল সকাল, তাঁরা এরই মধ্যে বাইরে বের হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছেন। তবে বের হতে থাকা মানুষের চেয়ে বেশি বইপ্রেমিক-প্রেমিকা মেলায় প্রবেশ করছিলেন। বই কিনতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই আসতে হবে। মূল আয়োজন তো এখানেই। দূরে দূরে সারি সারি স্টল দেখা যাচ্ছে। ছোট-বড়। কোনো প্রকাশনী নিজের স্টলের ওপরে সাবমেরিনের পেরিস্কোপের মতো একখানা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যায় তাতে বাতি জ্বলে উঠল। বইয়ের এই বিশাল রাজ্যে আগ্রহী ক্রেতাদের জন্য বেশ উপকারী মনে হলো এই পন্থাখানা। সেসব দেখতে গিয়ে বাধল এক বিপত্তি। দৃষ্টি সেখানে থাকায় খেলাম হোঁচট। গুরুতর কিছু নয়। সামনে তাকাতেই দেখলাম একটা সাইনবোর্ড আমার দিকে তাকিয়ে দন্ত বিকশিত করে হাসছে। তাতে লেখা—‘চলাচলের রাস্তা উঁচু-নিচু, সাবধানে ধাপ ফেলুন।’ ওটায় আগে চোখ পড়লে তো আর এই কাণ্ডটা হতো না। পায়ের নিচে সারিবদ্ধ ইট। সেসব বিছিয়ে মাঠের ধুলো থেকে বইপ্রেমীদের রক্ষার চেষ্টা করছে মেলা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বেরসিক দমকা বাতাস এসে বাগড়া দিয়ে বসল। বলা নেই কওয়া নেই ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করে দিল। আর তাতেই ধুলোদের পাখা গজাল। আমিও ঝোলার ইতিউতি খুঁজে ধুলোর হাত বাঁচতে কাপড়ের মুখোশখানা বের করে ফেললাম। যাক, আপাতত রক্ষা। কিন্তু মেলায় দেখা হয়ে যাওয়া বন্ধুবান্ধবরা একটু রিক্ততিই প্রকাশ করলেন—‘বড় মুখোশ পরে যে ঘুরছ, চিনব কিভাবে?’ তাঁদের নিরস্ত্র করে শেষমেশ বাধ্য হয়ে অবশ্য মুখোশখানা মুখ থেকে সরাতেই হলো।

বাংলা একাডেমির বিশাল স্টলে এক পিচ্চি মেয়েকে দেখে অবাক হলাম—এই পিচ্চি এখানে কী করছে? একাডেমির ভারিক্কি সব বইয়ে ওর পছন্দসই বই পাবে? একটু খেয়াল করতেই বুঝতে পারলাম মেয়েটা এসেছে তার বাবার সঙ্গে। মূল ক্রেতাটি সেই ভদ্রলোকই। ওই মেয়েটার মতো সদ্য কৈশোর পেরনো কয়েক তরুণকে দেখে আবারও হোঁচট খেলাম। পরে অবশ্য মনটা আনন্দে ভরে গেল। ওরা বেশ আগ্রহ করে বাংলা একাডেমির ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বইটা কিনছে। যাক ভুলভাল বানানে বাংলা লেখার মিছিলে দু-একজন তরুণ যে ব্যতিক্রম আছে, তাই বা মন্দ কী! আর বইটার দামটা বেশ কম, মাত্র ২০ টাকা।

বাংলা একাডেমি স্টল পেরিয়ে সামনে যেতেই মানুষের জটলা। নির্দিষ্ট করে বললে সেলফিপ্রেমীদের জটলা। রঙিন আলোসংবলিত চমৎকার এক ফোয়ারাকে কেন্দ্র করে সেলফিপ্রেমীরা জড়ো হচ্ছেন। হাতে তাঁদের স্মার্টফোন। এটায় তোলা ছবিখানা দেওয়া হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। মেলায় আসার একটা নিদর্শন তো রাখতে হবে! তাঁদের ছবি তোলার কসরত দেখতে দেখতে কানে ভেসে এলো এক সুকণ্ঠ। ভদ্রমহিলা মাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে। ওখানে গিয়ে মঞ্চে পেয়ে গেলাম শিশুসাহিত্যিক আলী ইমামকে। প্রধান অতিথি হিসেবে বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের অপেক্ষায় তিনি।

এবারের মেলায় বেশি লাভের আশায় অনেক ক্রেতাকেই দেখা গেল কেনা বইয়ের দাম মোবাইল দিয়ে চুকাতে। এতে নাকি মোটের ওপর ৩২ শতাংশ ছাড় মেলে। আমিও সেই সুযোগ গ্রহণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এক প্রকাশনীতে গিয়ে হতাশ হতে হলো। তাদের নাকি এই সুবিধা নেই। পছন্দের বই বলে কথা, এত লাভের কথা চিন্তা করলে চলে?

মেলায় সামনের দিকে যে ভিড় দেখেছিলাম একদম ভেতরে গিয়ে তার উল্টো চিত্রটি দেখতে হলো। হয়তো ঘড়ি ডিজিট আটের ঘরে বলেই কিনা। তবে সেবা প্রকাশনীর চিত্রটা অন্য রকম ছিল। কিশোর-তরুণের ভিড় ঠেলে কাউন্টার পর্যন্ত যেতে একপ্রকার ব্যর্থ হলাম। অবশ্য অন্যান্য শুক্রবারের তুলনায় সেবায় সেই ভিড় নেই। তবে খাবারের স্টলগুলো ছিল জমজমাট। বই কিনে-কেটে অনেকের যে বেশ খিদে লেগেছে তা বোঝা গেল। সেখানে পেটপুজো সেরে অনেককেই দেখা গেল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে দু’দণ্ড জিরিয়ে নিতে। শুধু তা-ই নয়, আধো আধো আলোতে মঞ্চ সাজাতে বেশ কিছু কর্মী ব্যস্ত সময় পার করছেন। সিসিমপুরের মঞ্চের কাছে গিয়ে চোখ তো চড়কগাছ। এই রাত ৯টাতেও পিচ্চিগুলোর ক্লান্তি নেই। মঞ্চে ধুপধাপ করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন একেকটা ক্যাঙ্গারুর বাচ্চা।

বের হওয়ার দরকার। অনেকের তেমন একটা তাড়া দেখলাম না। কিন্তু মেলার সময় যে শেষ। মেলার ভেতর থেকে বের হয়ে আরেক দফা আড্ডা শুরু করে দিতে দেখলাম অনেককেই। আসলে বাঙালির আড্ডা শেষ হওয়ার নয়। শুধু উপলক্ষের প্রয়োজন। হোক না সেটা বইমেলারই।



মন্তব্য