kalerkantho


স্টল ও প্যাভিলিয়নে নান্দনিকতার ছোঁয়া

নওশাদ জামিল   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



স্টল ও প্যাভিলিয়নে নান্দনিকতার ছোঁয়া

অনিন্দ্যসুন্দর স্টলটির নাম ‘বাতিঘর’। আকারে ছোট, কিন্তু ডিজাইন নান্দনিক। সামনে দাঁড়ালে মনে হয়—এ যেন মুঘল স্থাপনা। রং ও বিন্যাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মুঘল আমলে নির্মিত লালবাগ কেল্লার পরী বিবির মাজারের উঁচু কলাম। স্টলের ভেতরটা যেন মুঘল নিরাপত্তারক্ষীর ছত্রী। এবার গ্রন্থমেলায় স্টল-প্যাভিলিয়নে বেড়েছে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে সুন্দর ও নান্দনিক ডিজাইনের স্টল ও প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করেছে অধিকাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। কিছু কিছু গতানুগতিক হলেও নজর কেড়েছে অনেক স্টল ও প্যাভিলিয়ন। সেগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি ওঠাতে ভুলছে না অনেক ক্রেতা-দর্শনার্থী ও পাঠক। 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের গ্রন্থমেলা ঘুরে দেখা যায়, এবার ঘিঞ্জি আবহ নেই। ঘোরানো-প্যাঁচানো বিন্যাস নেই। পাঠকের সুবিধার্থে প্রশস্ত ও সোজা পথ রাখা হয়েছে। তাতে বিছানো হয়েছে ইট। ইট বিছানো পথের দুই ধারে বইয়ের স্টল। মাঝে ও ফাঁকে ফাঁকে দৃষ্টিনন্দন প্যাভিলিয়ন।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘আমাদের স্টলের ডিজাইন করেছেন শিল্পী শাহীনুর রহমান। স্টল ডিজাইনে মুঘল এবং আধুনিক স্থাপত্যের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। স্টলের আলোকসজ্জাতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। ওপরের ছাদ খোলা রাখা হয়েছে। যাতে আকাশ ও প্রকৃতি দেখা যায়।’

ক্রেতা-পাঠকদের আকর্ষণ করছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের প্যাভিলিয়ন। দেশবরেণ্য লেখকদের স্কেচ অবলম্বনে নির্মিত এটি। স্থান পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই, হাছন রাজা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ বেশ কয়েকজন লেখকের স্কেচ। চারপাশে খোলা প্যাভিলিয়নটির চারদিক থেকেই ক্রেতারা বই কিনতে পারবে।

স্বাধীনতা স্তম্ভের লেকের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়ন। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে একা হুমায়ূন আহমেদ। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবারের মতো এবারও হুমায়ূন আহমেদকে অবলম্বন করে সাজিয়েছে প্যাভিলিয়ন। দূর থেকে মনে হয়, ওপর থেকে যেন তাকিয়ে মেলা দেখছেন হুমায়ূন আহমেদ।

এক ইউনিটের স্টল ‘কুঁড়েঘর’। বাঁশ ও বেত দিয়ে অনুপমভাবে সাজানো। মসজিদের গম্বুজের আকৃতিতে নান্দনিক স্টল নির্মাণ করেছে শুদ্ধ প্রকাশ। কথাপ্রকাশের প্যাভিলিয়নের নন্দনশৈলীর সঙ্গে উজ্জ্বল লাল-সবুজ রঙের ব্যবহার আকর্ষণীয় করে তুলেছে। টিনের চালার আদলে এবার স্টল বানিয়েছে তাম্রলিপি ও ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ। এ ছাড়াও নান্দনিক প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছে মাওলা ব্রাদার্স, পাঠক সমাবেশ, জার্নিম্যান বুকস, প্রথমা, অনন্যা, পার্ল পাবলিকেশন্সসহ অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানই।

গতকাল রবিবার গ্রন্থমেলায় ঘুরতে ঘুরতে দেখা অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুল বায়েসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার গ্রন্থমেলার বিন্যাস সুন্দর হয়েছে। আয়তনও বেশ বেড়েছে। পাঠক- ক্রেতাদের জন্য এ পরিবেশ সত্যিই স্বাচ্ছন্দ্যময়।’

গতকাল গ্রন্থমেলা ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণে জমজমাট মেলা প্রাঙ্গণ। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রচুর পাঠক সমাবেশ দেখা যায়। সরস্বতী পূজা উপলক্ষে গতকাল বন্ধ ছিল সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভিড় করে মেলায়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মীরা জানান, বিক্রি ভালো হয়েছে।

মেলা প্রাঙ্গণের উৎসবের রং ছুঁয়ে যায় মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের ‘লেখক বলছি’ মঞ্চেও। সেখানে গতকাল কবি অসীম সাহা ‘নির্বাচিত কবিতা’, কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন ‘কবিতা সংগ্রহ’, শিশুসাহিত্যিক মীম নোশিন নাওয়াল খান ‘টুপিটুন’, কথাসাহিত্যিক মাজহার সরকার ‘নেমকহারাম’ এবং কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন ‘বাংলাদেশের গল্প’ নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হন।

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার দশম দিনে নতুন ৯০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্য থেকে চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি ছাপা হলো।

পীরচাঁনের পালা : প্রয়াত লেখক সৈয়দ শামসুল হক অনূদিত নাট্যগ্রন্থ। বইটি বিশ্বখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের ‘পিয়ের গিন্ট’ নাটকের মৌলিক অনুবাদ। লেখক তাঁর নিজস্বতা ও শৈলীতে নাটকটিতে রূপান্তর করেছেন বাংলাদেশের পটভূমি। প্রকাশক চারুলিপি। দাম ২০০ টাকা।

আমার মুক্তিযুদ্ধ : আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন আহমেদের স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ। বইটিতে উঠে এসেছে গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধের নানা স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলো নিয়ে চমকপ্রদ নানা তথ্য। প্রকাশক অন্যপ্রকাশ। দাম ৩০০ টাকা।

সুখলতার ঘর নেই : কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস। বইটির পটভূমি বঙ্গোপসাগরের জলতল। লেখক মাছের মুখে কথা বসিয়ে বলেছেন মৎস্যজীবনের গল্প। প্রকাশক প্রথম। দাম ৩২০ টাকা।

চাওয়া পাওয়ার গল্প : গবেষক ও লেখক শেখ মেহেদী হাসানের গল্পগ্রন্থ। বইটিতে স্থান পেয়েছে দশটি গল্প। এগুলোর পটভূমি মানুষের স্বপ্ন ও স্বপ্নের বিনাশ, প্রেম ও মুক্তিযুদ্ধ। প্রকাশক বেহুলাবাংলা। দাম ২০০ টাকা।

নতুন বই : ইমদাদুল হক মিলনের ‘আমার প্রেমের উপন্যাস’ (কথাপ্রকাশ), মোস্তফা কামালের ‘আমি কবি’ (অন্যপ্রকাশ), মুস্তাফিজ শফির ‘ব্যক্তিগত রোদ ও এবং অন্যান্য’ (কথাপ্রকাশ), মোস্তফা মামুনের ‘দুর্ধর্ষ তিন’ (পার্ল পাবলিকেশন্স), স্বকৃত নোমানের ‘মায়ামুকুট’ (অন্যপ্রকাশ), আলতাফ শাহনেওয়াজের ‘কলহবিদ্যৎ’ (বাতিঘর), জুলফিকার রবিনের ‘বিরহের তসবি’ (বেহুলাবাংলা), এন এস এম মঈনুল হাসান সজলের ‘তৃতীয় চোখে কাব্য’ (পূর্বা প্রকাশনী)।

মূলমঞ্চের আয়োজন : গতকাল মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘কথাশিল্পী অমিয়ভূষণ মজুমদার : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহীবুল আজিজ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন হোসেনউদ্দীন হোসেন, মাহবুব সাদিক এবং হরিশংকর জলদাস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেলিনা হোসেন। সন্ধ্যায় কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন মুহম্মদ নূরুল হুদা এবং সঞ্জীব পুরোহিত। আবৃত্তি পরিবেশন করেন মীর মাসরুর জামান রনি এবং লাবণ্য শিল্পী। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আলম দেওয়ান, রণজিত দাস বাউল, মমতা দাসী বাউল, লতিফ শাহ ও মো. আনোয়ার হোসেন।

আজকের আয়োজন : আজ সোমবার মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেলে মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরী : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অনুপম হায়াৎ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন আমানুল হক, লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং শিবলী মহম্মদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কামাল লোহানী। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।



মন্তব্য