kalerkantho


জাতিসংঘ মহাসচিব বললেন

নির্বাচন যে নিখুঁত হয়নি তা স্পষ্ট

► এখতিয়ার ছাড়া তদন্তের সুযোগ জাতিসংঘের নেই
► রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে অর্থবহ সংলাপে উৎসাহিত করছে জাতিসংঘ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



নির্বাচন যে নিখুঁত হয়নি তা স্পষ্ট

ছবি: ইন্টারনেট

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘নিখুঁত হয়নি’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। গত শুক্রবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে ওই নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশি এক সাংবাদিকের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি ওই মন্তব্য করেন।

জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে বাংলাদেশ বিষয়ে প্রশ্নটি ছিল, ‘আপনি যেমন জানেন, গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন ভোট কারচুপি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বিরোধীদের ধরপাকড়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর বিরোধী দল ওই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বাংলাদেশে স্বাগত জানানো হয়নি এবং তারা করেনি... (নির্বাচন পর্যবেক্ষণ)। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যবস্থাপনায় ১৭টি সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে চাইলেও বাংলাদেশ সরকার তাদের অনুমতি দেয়নি। তাহলে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? পুরো বিষয়টি তদন্ত ও বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আপনি কি কোনো দূত বা বিশেষ কোনো দল পাঠাতে চান?’

জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এখতিয়ার না পেলে এ ধরনের বিষয় তদন্তের অধিকার আমাদের নেই। তবে আমি বলতে চাই, প্রথমত, রোহিঙ্গা শরণার্থী সম্পর্কিত বিষয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের নিজের উন্নয়নসংক্রান্ত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও চরম কঠিন প্রেক্ষাপটে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রতি মহানুভবতার জন্য আমরা বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘এখন  এটি স্পষ্ট যে নির্বাচন নিখুঁত ছিল না এবং আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবন যতটা সম্ভব ইতিবাচক করতে বাংলাদেশি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বিভিন্ন অংশকে অর্থবহ সংলাপে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করি।’

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার রাতের সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে জাতিসংঘের অপারগতার কথা জানানোর আগে জাতিসংঘ মহাসচিব সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়েও একই ধরনের অপারগতা জানান। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘকে পরিচালনা করে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রস্তাব গ্রহণ করে ক্ষমতা দিলেই জাতিসংঘ মহাসচিব বা তাঁর দপ্তর সেটি বাস্তবায়ন করতে পারে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের এই বক্তব্য তাঁর নিজস্ব। জাতিসংঘ এসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।

এর আগে গত ৩১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষে তাঁর মুখপাত্র আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ আইনি ও শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির আহ্বান জানান। সব পক্ষকে সংযত থাকতে এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র বলেন, ‘লোকজন ও সম্পদের ওপর হামলা এবং সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়।’

এরপর গত ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশে জাতিসংঘের দপ্তর তার ফেসবুক পেজে লিখেছে, ‘২০৩০ এজেন্ডা, বিশেষ করে এসডিজি-১৬ এর আলোকে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক সমাজ ও আইনের শাসনের দিকে আরো অগ্রসর হতে জাতিসংঘ নতুন সরকার ও জাতীয় অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত আছে।’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ধীর গতিতে হতাশা : জাতিসংঘ মহাসচিব গত শুক্রবার রাতের সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ‘অত্যন্ত ধীর গতিতে’ চলছে বলে অভিযোগ করেন। হতাশার সুরে তিনি বলেন, গত এক বছরে যে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি।

সাংবাদিকরা জাতিসংঘ মহাসচিবকে প্রশ্ন করেন, মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সর্বশেষ কবে কথা হয়েছে? সু চিকে তিনি কী বলেছেন?

জাতিসংঘ মহাসচিব জানান, সু চির সঙ্গে তাঁর বেশ আগে কথা হয়েছে। তবে তাঁর কথা সব সময় এক। আস্থা ও বিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টির গুরুত্ব তিনি সু চির কাছে তুলে ধরেছেন। কেবল ভৌত অবকাঠামো পুনর্গঠন নয়, সম্প্রদায়গুলোকে যতটা সম্ভব মিয়ানমার সমাজে পুনরায় একত্রিত হওয়া এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা দেওয়ার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।

এদিকে মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াংহি লি গতকাল শনিবার ঢাকায় এসেছেন। ছয় দিনের এ সফরে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরেজমিন দেখবেন। এ ছাড়া তাঁর নোয়াখালীর হাতিয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য প্রস্তুত করা ভাসানচর পরিদর্শন এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকায় কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে।

ইয়াংহি লি বাংলাদেশ সফরের আগে গত সোমবার থেকে ছয় দিন থাইল্যান্ড সফর করেন। মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি খোঁজ নেওয়াই তাঁর সফরের লক্ষ্য। থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ সফরে তিনি তাঁর পাওয়া তথ্য ও সুপারিশগুলো আগামী মার্চ মাসে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ৪০তম অধিবেশনে উপস্থাপন করবেন।

ইয়াংহি লি গতকাল এক টুইট বার্তায় মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে বৈঠকের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর জানায়, মিয়ানমার সরকার ইয়াংহি লিকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। জাতিসংঘের হয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে মিয়ানমারেও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

 



মন্তব্য