kalerkantho


আসাদ দিবসের ৫০ বছর আজ

আসাদের শার্ট জানায় পাকিস্তান পতনের কথা

নওশাদ জামিল   

২০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আসাদের শার্ট জানায় পাকিস্তান পতনের কথা

শহীদ আসাদ স্মরণে কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন কালজয়ী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। তাতে কবি লিখেছিলেন—‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা/সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;/আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’

১৯৬৯ সালের আজকের এই দিনে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে শহীদ হন ছাত্রনেতা আসাদ। এর পর আসাদের সেই রক্তমাখা শার্ট যেন হয়ে উঠেছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। শহীদ আসাদের মৃত্যুর পরই প্রতিবাদী মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার নামে ঢাকাসহ সারা বাংলার রাজপথে। সংঘটিত হয় উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সংঘটিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। আর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল জয়ের মধ্য দিয়ে পতন হয় পাকিস্তানের। ছাত্রনেতা আসাদের ৫০তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ রবিবার। ইতিহাসের যুগান্তকারী এই দিনে আজ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হবে শহীদ আসাদকে।

ছাত্রনেতা আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) ঢাকা হল শাখার সভাপতি ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি স্বৈরাচারী আইয়ুব খান সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পাশে চানখাঁরপুলে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তিনি। এর পর থেকে দিনটি শহীদ আসাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

আসাদ শহীদ হওয়ার পর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ছয় দফা ও ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনে সংঘটিত হয় ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। পতন ঘটে আইয়ুব খানের। আরেক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় বসে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালের সেই অভূতপূর্ব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়; কিন্তু ইয়াহিয়া ক্ষমতা না ছাড়ার জন্য নানা টালবাহানা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তর সালে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। আর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজিত করে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

শহীদ আসাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল বরেণ্য বাম রাজনীতিবিদ ও লেখক হায়দার আকবর খান রনোর। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘আসাদ শহীদ হওয়ার কিছুদিন আগেও কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে চরমভাবে মার খেয়েছিলেন। সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন অসম্ভব সাহসী ও চরিত্রবান বিপ্লবী। শহীদ আসাদের সঙ্গে আমার পরিচয় ষাটের দশকেই। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন। নেতৃস্থানীয় পদেও ছিলেন। আসাদ মনেপ্রাণে বিপ্লবকে ধারণ করতেন। মার্ক্সবাদে বিশ্বাস করতেন সৎ, নিষ্ঠাবান এ মানুষটি। একই সঙ্গে তিনি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন, আবার একই সঙ্গে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কৃষক সংগঠনও করতেন।’

ঐতিহাসিক ২০ জানুয়ারির স্মৃতিচারণা করে হায়দার আকবর খান রনো বলেন, ‘সেদিন ১৪৪ ধারা জারি করেছিল আইয়ুব খান সরকার। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যারা মিছিল নিয়ে বেরিয়েছিল, তাদের মধ্যে আসাদ ছিলেন। আমি সে মিছিলে ছিলাম না, কারণ তখন আমি তো আর ছাত্র নই। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি, আমার ভাই হায়দার আনোয়ার খান জুনু আসাদের পাশেই সামনের সারিতে ছিল। অল্প কিছুদূর থেকে একটা জিপ থেকে মিছিল লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ, আসাদ শহীদ হন। আসাদ শহীদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটা একটা পুরো অগ্নস্ফুিলিঙ্গ হয়ে উঠল। সারা দেশ যেন নড়ে উঠল, কেঁপে উঠল, জেগে উঠল। অর্জিত হলো বাঙালির নানা অর্জন।’

তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহ স্মৃতিচারণা করে হায়দার আকবর খান রনো বলেন, ‘আসাদের মৃত্যুর পরপরই ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ কয়েক দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর মধ্যে ২৪ জানুয়ারি হরতাল ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ২৪ জানুয়ারির হরতাল তো হরতাল নয়, সে এক বিরাট অভ্যুত্থান! এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে অনেক ওলটপালট হয়ে গেল। আইয়ুব খানের পতন ঘটেছিল। আইয়ুব খানের পতন ঘটানোর পেছনে বিশাল ভূমিকা রেখে গিয়েছিলেন আসাদ, নিজের জীবন দিয়ে। আসাদের জানাজা হয়েছিল পল্টন ময়দানে। লোকে লোকারণ্য, একেবারে ভরা ছিল পল্টন ময়দান। উপস্থিত ছিল প্রায় দুই লাখ মানুষ।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আসাদ ছিলেন অসম্ভব সাহসী এক নেতা। অনেকবার তাঁর সাহস ও বীরত্বের সাক্ষাৎ পেয়েছি আমরা।’ শহীদ আসাদের আত্মত্যাগকে ‘স্বাধীনতাসংগ্রামের সিঁড়ি’ হিসেবে অবহিত করে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আসাদের মৃত্যুর পরই যেন নতুন শক্তিতে জেগে উঠেছিল গোটা দেশ। তাঁর রক্তদানই আইয়ুব শাহির পতনের পথ তৈরি করে। এর পরই গণ-অভ্যুত্থানের পথ ধরেই স্বাধীনতাসংগ্রাম তরান্বিত হয়।’

আসাদ দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ২০ জানুয়ারি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৬৯ সালের এই দিনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শহীদ হন। কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে গর্জে ওঠে সারা বাংলার মানুষ। শহীদ আসাদের আত্মত্যাগ চলমান আন্দোলনকে আরো বেগবান করে। যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন হয় স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের।’

শহীদ আসাদের ৫০তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে শহীদ আসাদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সকালে ও বিকেলে সমাবেশ, এ ছাড়া আসাদের নিজ গ্রাম নরসিংদীর শিবপুরে তাঁর প্রতিকৃতি ও কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণসহ নানা কর্মসূচি রয়েছে।

 



মন্তব্য