kalerkantho

ঢাকায় সড়ক বিশৃঙ্খলার বড় কারণ মোটরসাইকেল

যাত্রীসেবা বাড়াচ্ছে নিবন্ধন ও দুর্ঘটনা

পার্থ সারথি দাস   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঢাকায় সড়ক বিশৃঙ্খলার বড় কারণ মোটরসাইকেল

রাজধানীতে বেড়েছে মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্য। ছবিটি বিজয় সরণি এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীতে সড়কগুলোর মোড়ে মোড়ে গত এক-দেড় বছরের ব্যাবধানে মোটরসাইকেলের অস্থায়ী স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। ঝোলানো অতিরিক্ত একটি হেলমেট দেখেই বোঝা যায়, চালকরা কোনো রাইড শেয়ার কম্পানির হয়ে রাস্তায় নেমেছেন। তাঁরা ফোন পেলে যাত্রীকে আনতে ছোটেন, না পেলে অনেক সময় পথচারীকেও তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন, ‘কোথায় যাবেন?’ অনেক রাজধানীবাসীর জন্য এই সেবা সুবিধা নিয়ে এলেও সড়কে বেড়েছে জঞ্জাল। পথ যানজটে রুদ্ধ হলেও বাইকাররা চলেন ফুটপাত মাড়িয়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক সড়কে এমন দৃশ্য দেখতে দেখতেই চলন্ত বিহঙ্গ পরিবহনের চালক বাবুল মিয়া বললেন, ‘খালি মোটরসাইকেল আর মোটরসাইকেল। বাস চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।’

সকাল ১০টায় আগারগাঁও মোড়ে দেখা গেল, বাস ও প্রাইভেট কারের ফাঁকে ফাঁকে মোটরসাইকেল ঢুকে গেছে। মোড়ের সব দিকেই মোটরসাইকেলের জট। বিজয় সরণি মোড়েও একই অবস্থা। প্রাইভেট কার চালক মনিরুল হক বললেন, ‘মোটরসাইকেলের জন্য আমাদেরকে সতর্ক হয়ে চালাতে হচ্ছে। হঠাৎ সামনে চলে আসে।’

লেন-বিধি ভেঙে যেখান-সেখান দিয়ে চলতে থাকা মোটরসাইকেল ঢাকার সড়কে বিশৃঙ্খলার বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজধানীতে এখন ট্রাফিক পক্ষ চলছে। গত মঙ্গল ও বুধবার দুই দিনে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার মামলা ও প্রায় ৭০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। অভিযানে ৭৮টি গাড়ি ডাম্পিং ও এক হাজার ৬০০ গাড়ি রেকার করা হয়েছে। তবে আইন অমান্য করায় সবচেয়ে বেশি মামলা হচ্ছে মোটরসাইকেলচালকদের বিরুদ্ধে। ট্রাফিক পুলিশের সদস্য ইমরান আহমেদ বলেন, হাতের ইশারা দিলেও দল বেঁধে চলা মোটরসাইকেল চালকরা তা মানেন না। ফুটপাত দিয়েও তাঁরা চলেন। একসঙ্গে সবার বিরুদ্ধে মামলাও করা যায় না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে মোট ছয় লাখ ১৬ হাজার ৬৪১টি। অথচ ঢাকায় একই সময়ে ২০ ধরনের গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৫০০টি। দেখা গেছে, ঢাকায় ২০ ধরনের যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলই নিবন্ধিত হয়েছে ৪৫ শতাংশ। ২০১৫ সাল থেকেই এ হার বাড়ছে। যেখানে ২০১১ সালে নিবন্ধিত হয়েছিল ৩৪ হাজার ৭০৮টি মোটরসাইকেল, সেখানে গত বছর বা ২০১৮ সালে নিবন্ধনিত হয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৪টি মোটরসাইকেল। আট বছরে নিবন্ধনের হার প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ঢাকার বাইরেও বাড়ছে মোটরসাইকেল। বিআরটিএর হিসাবে, সারা দেশে ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে প্রতিবছর মোটরসাইকেল নিবন্ধন হয়েছে গড়ে ৩১ হাজার ৬৮৫টি। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিবছর নিবন্ধন হয়েছে গড়ে ৬২ হাজার ১৬৬টি মোটরসাইকেল। এই প্রবণতা এখনো বহাল।

ঢাকায় ২০১৬ সাল থেকে অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেলে যাত্রীসেবা জমে উঠলে নিবন্ধনও বেড়ে যায়। বর্তমানে ‘উবার’ ও ‘পাঠাও’সহ কমপক্ষে ছয়টি প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করছে। অবস্থা এমন যে গ্রামের বেকার যুবকরা ঢাকায় এসে মোটরসাইকেল কিনে অ্যাপভিত্তিক সেবা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে যাত্রী টেনে রোজগার করছেন দিন-রাত। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, উবারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনে যুক্ত হয়েছে কমপক্ষে চার লাখ মোটরসাইকেল। ঢাকায় আরো প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেলে যাত্রীসেবা নিয়ে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিশ্বের আদর্শ নগরীগুলোয় মেট্রো রেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) মতো দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তবে ঢাকায় দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থা মনোরেল পরিকল্পনায়ই থেকে গেছে। মেট্রো রেল ও বিআরটি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি আদর্শ মহানগরীতে যেখানে বাসের মতো গণপরিবহন বাড়ার কথা, সেখানে উল্টো ছোট বাহন বেড়ে যাওয়ায় সড়কের বিরাজমান বিশৃঙ্খলা আরো বেড়েছে। অভিযানে নেমেও ট্রাফিক পুলিশ বা বিআরটিএর নির্বাহী হাকিমরা পরিস্থিতি বাগে আনতে পারছেন না। ট্রাফিক পক্ষে বেশির ভাগ স্থানে মামলা ও জরিমানা হচ্ছে মোটরসাইকেলচালকদের বিরুদ্ধে।

গতকাল কাকলী মোড়ে উবার ও পাঠাও দুই অ্যাপই ব্যবহার করে মোটরসাইকেল দিয়ে যাত্রী সেবাদানকারী চালক মো. শরীফুল আলম বললেন, তিনি তিন মাস আগে মাদারীপুর থেকে ঢাকায় এসে মোটরসাইকেল কিনে এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। দিনে দেড় হাজার টাকার মতো আয় হয় তাঁর।

পরিবহন খাতের বিশিষ্ট গবেষক, বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, তরুণরা কর্মসংস্থানের জন্য এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। যাত্রীরা যানবাহনের নিশ্চয়তা পেতে মোটরসাইকেলে চেপে বসছে। কিন্তু একটি মহানগরীতে কী পরিমাণ গাড়ি চলবে এর সমীক্ষা থাকা দরকার। সমীক্ষা না থাকায় তাতে নিয়ন্ত্রণও নেই। ছোট গাড়ি হিসেবে প্রাইভেট কারের পর এখন মোটরসাইকেল যেভাবে বাড়ছে তাতে করে রাস্তায় যাত্রায় বিভীষিকা নেমে এসেছে। তিনি বলেন, ২০০৪ সাল থেকে গণপরিবহন ও দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।

ড. সামছুল হক বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেলে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ‘কারপুলিং’ চালু করলে সুফল মিলবে। নেপালের কাঠমাণ্ডু, ভিয়েতনামের বিভিন্ন শহরেও মোটরসাইকেল বাড়ানো হয়েছিল, এখন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ঢাকায় এখন যা চলছে তাতে নিয়ন্ত্রণ নেই বিআরটিএর। শুধু নিবন্ধনই দিয়ে যাচ্ছে। যত দুর্ঘটনা ঘটছে তার ৫০ শতাংশের বেশি হচ্ছে মোটরসাইকেলে।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘মোটরসাইকেল রাস্তা ও ফুটপাতে নৈরাজ্য চালাচ্ছে। যাত্রীরা কর্মস্থলে যেতে চাইছে সময়মতো। ট্রিপ বেশি দিতে চালকরা বেপেরোয়া চলছে।’

জানা গেছে, গত বছর ‘মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা-২০১৮’-এর খসড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। মোটরসাইকেল সংযোজনশিল্পের পরিবর্তে দেশে এখন বিশ্বমানের মোটরসাইকেল উৎপাদন কারখানা তৈরিতে উৎসাহিত করছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে এ খাতে কর্মসংস্থান পাঁচ লাখ, ২০২৭ সালের মধ্যে তা ১৫ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এসিআই মোটরস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, ‘মোটরসাইকেলের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে ও মূল্য কমছে। আমাদের দেশে প্রতি ১২০ জনে একটি মোটরসাইকেল আছে, ভিয়েতনামে আছে প্রতি চারজনে একটি। আমাদের ১৫০ সিসির মোটরসাইকেলের বিক্রি বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। ১২৫ সিসির বেড়েছে ২৪ শতাংশ।’

ঢাকার সড়কে পথচারী ও যাত্রীর প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে এই দুই চাকার বাহন। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) হিসাবে, ২০১৭ সালে রাজধানীতে ৪৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৫৩ জন নিহত এবং ১৯ জন আহত হয়। গত বছরের প্রথম আট মাসে ৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৪৭ জনের প্রাণ যায়। ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ের চালকরা তাড়াহুড়া করে ট্রিপ শেষ করতে চান। এ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি।

 

মন্তব্য