kalerkantho

আগামী সপ্তাহে দেওবন্দের বৈঠকে ঠিক হবে বিশ্ব ইজতেমা কবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আগামী সপ্তাহে দেওবন্দের বৈঠকে ঠিক হবে বিশ্ব ইজতেমা কবে

তাবলিগ জামাতের বিরোধ মিটিয়ে বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে নতুন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভারতের দেওবন্দ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী সপ্তাহে প্রতিনিধিদলটি ভারত যাচ্ছে বলে জানা গেছে। গত ১৪ জানুয়ারি ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বিবদমান দুই পক্ষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ভারত যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিনিধিদলে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের সদস্যরা থাকছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারতের দেওবন্দে অনুষ্ঠেয় বৈঠকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশে কবে হবে বিশ্ব ইজতেমা। জানা গেছে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ইজতেমা করার টার্গেট নিয়েই কাজ করছে সরকার।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের জন্য জমি দিয়েছিলেন। সেই তাবলিগ জামাতে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। তারা মারামারি, হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে। সারা বিশ্বে তারা দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেতাবলিগ জামাতের মতবিরোধ দূর করার জন্য কাজ করছি। এরই অংশ হিসেবে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ভারতে যাচ্ছি। সেখান থেকে আমরা যাতে একটি সুসংবাদ নিয়ে আসতে পারি, সেই চেষ্টা থাকবে। কারণ তাবলিগ জামাতের মতো একটি অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠনের মধ্যে বিরোধের কারণে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিশ্ব ইজতেমা থেকে বঞ্চিত হতে পারে না। এ জন্যই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ভারতে যাওয়া হচ্ছে।’

তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের মধ্যে মাওলানা সাদের অনুসারীরা গত বছর ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর টঙ্গীতে তুরাগ নদের তীরে জোড় ইজতেমা এবং চলতি বছরের ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে দেওবন্দপন্থীরা (জুবায়েরপন্থী) ৭ থেকে ১১ ডিসেম্বর জোড় ইজতেমা এবং ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের কথা জানায়। দুই পক্ষের আলাদা ইজতেমা করার ঘোষণায় উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। ওই পরিস্থিতিতে গত বছর ১৬ নভেম্বর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে এক বৈঠক থেকে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব স্থগিত করা হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে বিশ্ব ইজতেমার একটি তারিখ নির্ধারণে ছয় সদস্যের এক প্রতিনিধিদল ভারতের দেওবন্দে যাবে। সেখানে দুই পক্ষ সমঝোতায় এলেই নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে।

কিন্তু সাদপন্থীরা গত বছর ৩০ নভেম্বর থেকে জোড় ইজতেমা করার প্রস্তুতি নিলে অন্য পক্ষ তুরাগ তীরে ইজতেমা মাঠের সব কয়টি ফটকে পাহারা বসায়। এ পরিস্থিতিতে জুবায়েরপন্থীরা গত বছর ২৪ নভেম্বর ইসিতে চিঠি দিয়ে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘ভয়াবহ অবনতির শঙ্কা’ প্রকাশ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করে। (ইসিকে চিঠি দেওয়ার কারণ, ওই সময় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল।) ইসি ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়ে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগে টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান না করার নির্দেশনা দেয়। অন্যদিকে সাদপন্থীরা গত বছর ২৭ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে।

অন্যদিকে মাওলানা সাদের বাংলাদেশে আসাকে কেন্দ্র করে গত বছর ১ ডিসেম্বর ব্যাপক সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অসংখ্য ব্যক্তি আহত হয়। সংঘর্ষ থামার পর ওই দিন বিকেলে বিবদমান দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঠিক করা হবে ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর।’

এরই মধ্যে ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নতুন জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদও গঠিত হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এরই মধ্যে বিবদমান দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল ভারতের দেওবন্দ যাওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। তবে দেওবন্দ যাওয়ার দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি বলে জানা গেছে।

উপমহাদেশে সুন্নি মতাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় সংঘ তাবলিগ জামাতের মূল কেন্দ্র ভারতের দিল্লিতে। ভারতের ইসলামী পণ্ডিত ইলিয়াছ কান্ধলভি তাবলিগ জামাতের সূচনা করেন। মাওলানা ইলিয়াছের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা ইনামুল হাসানের মৃত্যুর পর একক আমিরের বদলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হয় একটি শুরা কমিটির ওপর। ওই কমিটির সদস্য মাওলানা জুবায়েরের মৃত্যুর পর মাওলানা সাদ আমিরের দায়িত্ব নিয়ে একক নেতৃত্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনেন। এ অবস্থায় মাওলানা জুবায়ের হাসানের ছেলে মাওলানা জুহাইরুল হাসান নেতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে এলে তাঁর অনুসারীরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানায়। কিন্তু সাদ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। বিভিন্ন সময় মাওলানা সাদের বক্তব্য নিয়েও আলেমদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়। নেতৃত্ব নিয়ে দিল্লির মারকাজ এবং দেওবন্দ মাদরাসার অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হতে থাকে। এরই জেরে বিশ্ব ইজতেমার সময় নির্ধারণ নিয়ে সৃষ্টি হয় এ সংকট। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদেও এ বিরোধের জের চলতে দেখা গেছে গত বছরজুড়ে।

কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসা মাওলানা সাদ কান্ধলভি গত বছর ঢাকায় এসে বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সরকারের মধ্যস্থতায় ইজতেমায় অংশ না নিয়ে তিনি ঢাকা ছেড়ে যান।

দেওবন্দে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম নিষিদ্ধ

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসার একটি নোটিশ কালের কণ্ঠ’র হাতে এসেছে। তবে নোটিশটি তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি। গতকাল প্রচারিত নোটিশটিতে ওই মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ‘প্রিয় ছাত্রবৃন্দ। দ্বিনের প্রচার ও প্রসারের কাজ আমাদের ওপর ফরজ। তবে তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সৃষ্ট ফেতনা থেকে দারুল উলুমকে বাঁচানোর জন্য দারুল উলুম কর্তৃপক্ষ প্রথম থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে—দারুল উলুমের কোনো ব্যক্তি তাবলিগের দুই পক্ষের কারো সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না।

এ জন্য প্রিয় ছাত্রবৃন্দ, দারুল উলুমের (দেওবন্দের) চৌহদ্দির মধ্যে তাবলিগ জামাতের চলমান সংকট নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। কোন ছাত্র কিংবা বহিরাগত যদি দারুল উলুমের চৌহদ্দির মধ্যে এ ব্যাপারে মাথা ঘামায়, তাহলে অন্য ছাত্ররা এতে না জড়িয়ে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত অবহিত করবে।

যদি কোনো ছাত্র আইন অমান্য করে নিষিদ্ধ আরোপ করা কোনো কাজে লিপ্ত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

মন্তব্য