kalerkantho


নিজ আসনে এলডিপিপ্রধান অলির মনোনয়ন অনিশ্চিত!

জোটের কাছে এলডিপির ৩০ আসন দাবি

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নিজ আসনে এলডিপিপ্রধান অলির মনোনয়ন অনিশ্চিত!

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দল বিএনপি থেকে বেরিয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠন করেছিলেন সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। ২০০৬ সালের অক্টোবরে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পর ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সভাপতি অলিসহ দলটির ৪১ জন নেতা দেশের বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে অলি ছাড়া এলডিপির আর কেউ বিজয়ী হতে পারেননি।

এদিকে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে এলডিপি। আর জোটপ্রধান বিএনপি আছে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। সরকারবিরোধী এই জোটের কেন্দ্রীয় নেতা ও গণফোরাম নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে। তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে অলি আহমদের আসনে (চন্দনাইশ) মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ ছাড়া একই আসন থেকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর করিমের ভাই কেন্দ্রীয় বিএনপির পরিবার ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক মহসিন জিল্লুর করিম, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন প্রমুখ মনোনয়নপ্রত্যাশী। এই জোট-ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন পেতে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কঠিন সমীকরণে আছেন সাবেক মন্ত্রী ও ছয়বারের সংসদ সদস্য এলডিপি প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। জোট-ঐক্যফ্রন্টের নানামুখী হিসাব-নিকাশে এই আসন থেকে শেষ পর্যন্ত অলি নাকি সুব্রত? নাকি অন্য কেউ মনোনয়ন পাচ্ছে? সেদিকে তাকিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা। তবে অনেকেই বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে এলডিপিপ্রধান। এখনো জোটগতভাবে নিশ্চিত হয়নি অলির মনোনয়ন।

২০১৪ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বর্জন করলে এলডিপিও বর্জন করেছিল। এদিকে গত পাঁচ বছরে এলডিপিপ্রধান অলি আহমদের নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রামের চন্দনাইশে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এলডিপির সব প্রার্থী পরাজিত হন। শুধু তা-ই নয়, এলডিপি সমর্থিত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার চৌধুরীও প্রায় তিন বছর আগে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। বর্তমানে অলির নির্বাচনী এলাকায় তাঁর বা এলডিপি সমর্থিত কোনো জনপ্রতিনিধি নেই। সব মিলিয়ে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে অলি নানামুখী সংকটে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

নিজ সংসদীয় আসনে অলি আহমদের মনোনয়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রসঙ্গে জানতে গতকাল তাঁর মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

নিজ আসনে মনোনয়ন নিয়ে অলি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কি—জানতে চাইলে এলডিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁর নির্বাচনী এলাকায় জোটগতভাবে অন্য কেউ মনোনয়ন দাবি করবে, এটা কল্পনাতীত। তিনি ওই আসনে ছয়বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। অনিশ্চয়তার বিষয়টি ঠিক নয়। যিনি জিতে আসবেন তাঁকেই জোট থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

সেলিম আরো বলেন, ‘গত পরশু আমাদের দল থেকে ৩০ জনকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিসংবলিত তালিকা জোটপ্রধান বিএনপির কাছে দিয়েছি। এই তালিকায় ডজনখানেক জনপ্রিয় প্রার্থী রয়েছেন, যাঁরা এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।’

এলডিপি থেকে একাধিকবার চন্দনাইশ উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলেন আব্দুল জব্বার চৌধুরী। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। গতকাল বিকেলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে এলাকায় জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ। এখানে এখন এলডিপির কোনো জনপ্রতিনিধি নেই। এলডিপি এই আসনে দ্বিতীয় অবস্থানে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ চন্দনাইশ এবং সাতকানিয়া-লোহাগাড়া—এই দুটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন। তিনি চন্দনাইশে জিতলেও সাতকানিয়ায় জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। গত কয়েক বছরে চন্দনাইশে অলির ইমেজ আগের মতো নেই।

এদিকে চন্দনাইশ আসন থেকে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানসহ ২৩ জন দল থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এ ছাড়া বিএনপি জোট ও ঐক্যফ্রন্ট থেকেও বেশ কয়েকজন মনোনয়ন চেয়ে মাঠে রয়েছেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এলডিপির সঙ্গে এখনো আসন ভাগাভাগি হয়নি জোটের। আসন নিয়ে দর-কষাকষি হচ্ছে। দলটি বিএনপি জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে শেষ পর্ষন্ত কয়টি আসন পাচ্ছে সেই সঙ্গে অলির আসনটি তাঁর জন্য অক্ষত থাকছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ আসন থেকে ছয়বার নির্বাচিত হন। এর মধ্যে পাঁচবার বিএনপি থেকে এবং ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে নিজ দল এলডিপি থেকে নির্বাচিত হন তিনি। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি চন্দনাইশের পার্শ্ববর্তী বর্তমান চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক) আসন থেকে নির্বাচিত হন। এর মধ্যে চন্দনাইশ আসনে উপনির্বাচনে তাঁর সহধর্মিণী মমতাজ অলি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অলি আহমদ বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত রেল ও যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। এরপর ২০০১ সালে নির্বাচনে তিনি চন্দনাইশ এবং লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক দুই আসন থেকে নির্বাচন করে চন্দনাইশে বিজয়ী হন। লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আসনে জামায়াত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। অলি বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে ওই নির্বাচনে চন্দনাইশ থেকে এমপি হলেও সেই আমলে মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। একপর্যায়ে তিনি ২০০৬ সালে বিএনপি থেকে বেরিয়ে ওই বছর নতুন রাজনৈতিক দল এলডিপি গঠন করেন।



মন্তব্য