kalerkantho


প্রাথমিকেও ভুয়া পরীক্ষার্থী!

১৯ জনকে আটকের পর ছেড়ে দেওয়া হয়

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রাথমিকেও ভুয়া পরীক্ষার্থী!

এবারের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে ভুয়া পরীক্ষার্থী। গতকাল রবিবার প্রথম দিনে ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষায় দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভুয়া পরীক্ষার্থী ধরা পড়েছে। এরা মূলত কয়েক ধাপ উঁচু ক্লাসের শিক্ষার্থী। মূল পরীক্ষার্থীদের নামে পরীক্ষায় বসা এই অপকর্মকারীর সংখ্যা পিইসির চেয়ে ইবতেদায়িতে ছিল বেশি।

গতকাল লালমনিরহাটের হাতিবান্ধায় পাঁচজন, মাদারীপুর সদর উপজেলায় পাঁচজন, শ্রীমঙ্গলে আটজনসহ মোট ১৯ জন ভুয়া পরীক্ষার্থী ধরা পড়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এরাও শিশু হওয়ায় এদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মূল পরীক্ষার্থীকে অনুপস্থিত দেখিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষকদের যোগসাজশেই এই ভুয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। কারণ যে স্কুল বা মাদরাসা থেকে পরীক্ষা দেবে সেই প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রের শিক্ষকদের যোগসাজশ ছাড়া কোনোভাবেই ভুয়া পরীক্ষার্থীদের হলে ঢোকানো সম্ভব নয়। অথচ এই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভুয়া পরীক্ষার্থীদের খবরটি এখনো আমার কাছে আসেনি। তবে এ ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। যেই জড়িত থাকুক সবার বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

জানা যায়, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি পরীক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গ্রহণ করলেও ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলো মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে। এ ব্যাপারে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম ছায়েফ উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেডিসি পরীক্ষায় আমরা একজন ভুয়া পরীক্ষার্থী পেয়েছিলাম। তাকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। ইবতেদায়িতেও যদি ভুয়া পরীক্ষার্থী পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষক জড়িত থাকলে তাঁকেও ছাড় দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আমাদের জানালে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।’

জানা যায়, এবারের পিইসি ও ইবতেদায়ি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা প্রায় ৩১ লাখ শিক্ষার্থীর। তবে গতকালের প্রথম দিনেই অনুপস্থিত ছিল এক লাখ ৬০ হাজার ১৬৮ জন পরীক্ষার্থী। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে মাত্র একজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার দেখানো হয়েছে।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় বড়াইপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার পাঁচজন ভুয়া পরীক্ষার্থী সরকারি এসএস উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে

পরীক্ষা দিতে এসে ধরা পড়ে। গতকাল পরীক্ষা চলাকালে ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। সেখানে বড়াইপাড়া ইবতেদায়ি মাদরাসার পাঁচ পরীক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তারা উপজেলার বিভিন্ন মাদরাসার উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী। ফলে ওই সব শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বড়াইপাড়া মাদরাসার সুপার দাবিদার হাবিবুর রহমান হাবিবকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

হাতীবান্ধার ইউএনও সামিউল আমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ওই মাদরাসার দুজন সুপার রয়েছেন, এর মধ্যে কে আসল তা বলা মুশকিল। ওই কেন্দ্রে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ ও সপ্ততম শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানোর ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

মাদারীপুর সদর উপজেলার তাঁতীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইবতেদায়ি পরীক্ষা দিতে আসা পাঁচ ভুয়া পরীক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। এসব শিক্ষার্থী উত্তর বড় বাড্ডা মাদরাসা ও মস্তফাপুর বড়মেহের মাদরাসার শিক্ষার্থীদের পক্ষে পরীক্ষা দিতে এসেছিল। আটককৃতরা হলো—ফারজানা আক্তার, ডলি আক্তার, সাদিয়া আক্তার, সুমাইয়া আক্তার ও খুকু মনি। মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুউদ্দিন গিয়াস ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ইবতেদায়ি পরীক্ষা দিতে আসা পাঁচজন শিক্ষার্থীকে আটক করে রাখা হয়। পরে সাদা কাগজে তাদের শিক্ষকদের অঙ্গীকারনামা রেখে এই শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চণ্ডীপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পিইসি পরীক্ষায় অন্যের জন্য পরীক্ষা দিতে গিয়ে জ্যোতি খাতুন নামের একজন আটক হয়। সে জোতজয়রাম আনন্দ স্কুলের ছাত্রী নুপুর খাতুনের হয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছিল। পরে তাকে অভিভাবকের মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। কেন্দ্রসচিব এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা সন্দেহ পোষণ করছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা বলেন, ‘এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। ওই ছাত্রীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’

এ ছাড়া শ্রীমঙ্গলে পিইসি পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে এসে ধরা পড়ে অষ্টম শ্রেণির আট শিক্ষার্থী। যাদের পক্ষ হয়ে এসব শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে এসেছিল তারা সবাই স্থানীয় আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী। উপজেলার সাতগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। পরে ওই শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিত দেখিয়ে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ প্রক্সি দেওয়াদের ছেড়ে দেয়। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি, আট শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হয়েছে।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক; লালমনিরহাট, মাদারীপুর ও বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি।

 

 



মন্তব্য