kalerkantho


বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডে সাক্ষাৎকার

সবাইকে ইসিতে মনোনয়ন ফরম জমার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সবাইকে ইসিতে মনোনয়ন ফরম জমার নির্দেশ

রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গতকাল ধানের শীষের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয় দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সব প্রার্থীকে মনোনয়ন ফরম নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তিনি ছাড়া অন্য সবাই মনোনয়ন ফরম প্রত্যাহার করে নেবেন। যাঁরা মানবেন না তাঁদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশের মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল রবিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার পর্বে এসব নির্দেশনা আসে। সকাল থেকেই শুরু হয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার। এ উপলক্ষে কার্যালয়ের সামনে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রথম দিনে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের আসনগুলোর জন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। মনোনয়ন বোর্ডে লন্ডন থেকে ভিডিও কলের মাধ্যমে সংযুক্ত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও।

সকাল পৌনে ১০টা থেকে প্রথম ধাপের এই সাক্ষাৎকার চলে বিকেল পর্যন্ত। পরে মধ্যাহ্নভোজ শেষে দ্বিতীয় ধাপের সাক্ষাৎকার চলে রাত পর্যন্ত। প্রথম ধাপে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে ১৫৮ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনে ৩৬৮ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। জানা গেছে, আসনভিত্তিক মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ডেকে একসঙ্গে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। প্রথম ডাক পড়ে পঞ্চগড়-১ আসনের প্রত্যাশীদের। এ আসনে মনোনয়ন চেয়েছেন তিনজন। তাঁরা হলেন—ইউনুস শেখ, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির ও তৌহিদুল ইসলাম।

প্রায় প্রত্যেক আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কাছে বোর্ডের তিনটি প্রশ্ন ছিল কমন। এগুলো হচ্ছে—কেন দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান কী এবং মনোনয়ন দিলে জয় লাভ করার সম্ভাবনা কতটুকু। তারেক রহমানও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেন।

মনোনয়ন বোর্ডে ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, লে. জে. (অব) মাহবুবুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বোর্ডের আরেক সদস্য মির্জা আব্বাস মামলার কারণে অনুপস্থিত ছিলেন।

সাক্ষাৎকার শেষে একাধিক প্রার্থী কালের কণ্ঠকে বলেছেন, বোর্ড কারো প্রার্থিতাই চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দেয়নি। সবাইকে এলাকায় গিয়ে নির্বাচনী গণসংযোগ করতে বলা হয়েছে। সব প্রার্থীকেই নির্বাচন কমিশনে মনোনয়ন ফরম জমা দিতে বলেছেন বোর্ডের সদস্যরা, যাতে করে দলের প্রথম পছন্দের কেউ বাদ গেলে সহজেই বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায়।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কর্মী-সমর্থক নিয়ে আসতে নিষেধ করা হলেও অনেকেই ১০-১২ জনকে সঙ্গী করে আসেন। তাই গতকাল গুলশানের কার্যালয় ছিল নেতাকর্মীতে ভরপুর।

সাক্ষাৎ দানকারী কয়েকজনের কথা : দিনাজপুর-৪ আসনের অ্যাডভোকেট আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমরা চারজন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছি। আমার কাছে তারেক রহমান জানতে চেয়েছেন, কেন দল আমাকে মনোনয়ন দেবে? মনোনয়ন দিলে আমার জয়ের সম্ভাবনা কতটুকু? তিনি দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে তাঁর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও পরামর্শ দেন।’ পঞ্চগড়-২ আসনের প্রার্থী ফরহাদ হোসেন ফরহাদ বলেন, ‘আমার কাছে বিএনপি মহাসচিব জানতে চেয়েছেন, কেন আমি নির্বাচন করতে চাই? অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলে আমি কাজ করব কি না। এ ছাড়া তারেক রহমান জানতে চেয়েছেন, নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার কেমন সম্পর্ক রয়েছে।’ ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের প্রার্থী জাহিদুর রহমান জাহিদ বলেন, তাঁর আসনে বিএনপি থেকে ১০ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তাঁদের সবাইকে এলাকায় গিয়ে গণসংযোগ চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরে জানিয়ে দেওয়া হবে কাকে দল মনোনয়ন দিয়েছে।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা বলেন, ‘আমার রাজনীতিতে আসার একটাই কারণ, আমি মানুষের সেবায় থাকতে চাই।’ নীলফামারী-৪ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বেবী নাজনীন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই দলের জন্য কাজ করছি। আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দি। তাঁর মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়া। দল যাকেই মনোনয়ন দেবে আমরা তার পক্ষেই কাজ করব।’

‘ইসি নির্বাচনবিধি লঙ্ঘন করেছে’ : প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার পর্বের মধ্যেই বিকেলে গুলশান কার্যালয়ের নিচতলায় মহাসচিব ফখরুল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার পর্বে তারেক রহমানের যুক্ত হওয়া—এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের প্রশ্ন তোলা এবং এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভিযোগ পেলে তারা বিষয়টি দেখবে—এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফখরুল বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন নিজেই তো আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে। তারা একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পরিবেশ পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি। এ জন্য তাদের মুখে এ ধরনের কথা বলা ঠিক নয়। আর আমার দলের মধ্যে আমি কিভাবে সাক্ষাৎকার নেব, সেটা তাদের বলার কোনো এখতিয়ার আছে বলে মনে করি না।’

ফখরুল আরো বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে, খালেদা জিয়ার মুক্তির লক্ষ্যে আসন্ন নির্বাচনকে আমাদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিয়েছি। সে জন্যই আমরা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক যেসব কাজ, সেগুলো সারছি। এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে বলে আমরা মনে করছি না। এই সরকার আগের মতো একইভাবে একদলীয় নির্বাচন করার পাঁয়তারা করেই যাচ্ছে। আমরা, ঐক্যফ্রন্ট, ২০ দল ও অন্যান্য দল যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী তারা মিলে নির্বাচনকে ফলপ্রসূ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য দাবি করে আসছি। আমরা সংলাপে গিয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের জন্য যে সমতলভূমি ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, সেটা তৈরি হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত নির্বাচনকালীন সরকারকে নিরপেক্ষ করার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের জন্য যে ন্যূনতম পরিবেশ দরকার, তা তৈরি করা হয়নি।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আজকে বলা হয়েছে যে মিডিয়া নিরপেক্ষ থাকবে, সব দলের খবর সংগ্রহ ও প্রকাশ করবে। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। বিটিভি সমানে আওয়ামী লীগের উন্নয়নের খবর বারবার প্রচার করছে। সরকারি রেডিও বাংলাদেশও একই কাজ করছে। এটা সুস্পষ্ট আইনের লঙ্ঘন। বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিওগুলোকেও তারা চাপের মুখে রেখেছে, যাতে বিরোধী দলের সংবাদ প্রচার করা না হয়। অন্যদিকে গ্রেপ্তার এখনো বন্ধ হয়নি। বারবার বলা হয়েছে, আর গ্রেপ্তার করা হবে না। কিন্তু গ্রেপ্তার চলছেই। আমরা চাই মামলা-মোকাদ্দমা বন্ধ করে দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে মাঠে থাকার সুযোগ করে দেওয়া হোক।’

প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার বিষয়ে ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আশা করি আগামীকাল, পরশুসহ আমাদের প্রার্থীদের যে সাক্ষাৎকারের সময় আছে, তা যথাসময়ে শেষ করতে পারব।’ প্রার্থীদের কী বার্তা দিচ্ছেন—প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়, তার চেষ্টা যেন তাঁরা করেন। জয়ী হওয়ার জন্য যেন তাঁরা নির্বাচন করেন। কেন্দ্রগুলোতে যাতে কারচুপি করতে না পারে ও আগের মতো দখল করতে না পারে সে জন্য আমরা সজাগ ও সচেতন থাকার জন্য তাঁদের বলেছি।’

চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পক্ষে মনোনয়ন ফরমে স্বাক্ষর করেছেন বিএনপির মহাসচিব। সাক্ষাৎকার শেষে বেরিয়ে আসা একাধিক ব্যক্তির মনোনয়ন ফরমে দেখা গেছে মির্জা ফখরুলের স্বাক্ষর। মনোনয়ন ফরমে লেখা আছে, ‘আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। দলের নিবন্ধন নম্বর ৭। এতদ্বারা নির্বাচনী এলাকা...জেলা...হতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থীরূপে...কে, ভোটার নম্বর...কে দলের মনোনয়ন প্রদান করছি।’ উল্লেখ্য, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে (আরপিও) বলা আছে, যেকোনো দলের মনোনয়ন ফরমে দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও দলীয় মনোনীত প্রার্থী স্বাক্ষর করবেন।

আরপিও অনুযায়ী, কোনো দল চাইলে একই আসনে একাধিক ব্যক্তি ওই দলের মনোনয়ন ফরম জমা দিতে পারবেন। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগে দল থেকে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তা জানাতে হবে। দলের মনোনীত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাবে।

পুলিশের তল্লাশি : গুলশানের মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়েছিল পুলিশ। গুলশান কার্যালয়ের সামনের ৮৬ নম্বর রোডে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল বেশি। এই রোডে কোনো যানবাহন পুলিশের তল্লাশি ছাড়া প্রবেশ করতে পারেনি। সাধারণ মানুষকে অন্য রাস্তায় চলাচল করতে বলেছে পুলিশ।

সাক্ষাৎকারের বাকি সূচি : আজ সোমবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত বরিশাল বিভাগ এবং দুপুর আড়াইটা থেকে খুলনা বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম বিভাগ, দুপুরে কুমিল্লা সাংগঠনিক বিভাগ ও সিলেট বিভাগের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। ২১ নভেম্বর সকালে ময়মনসিংহ বিভাগ ও ফরিদপুর সাংগঠনিক বিভাগ এবং বিকেলে ঢাকা বিভাগের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে।

নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম দাখিলের শেষ তারিখ ২৮ নভেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ নভেম্বর। আগামী ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

 



মন্তব্য