kalerkantho


শিবগঞ্জে নবান্নে মাছ মেলা

উৎসবে মাতল ২০ গ্রাম

নতুন আলু ২০০ টাকা কেজি!

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



উৎসবে মাতল ২০ গ্রাম

নবান্ন উৎসব উপলক্ষে গতকাল বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলিতে বসেছে মাছের মেলা। ১২ কেজি ওজনের এই বোয়াল মাছের দাম হাঁকা হয়েছে ১২ হাজার টাকা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নবান্ন উৎসব উপলক্ষে গতকাল রবিবার বসেছিল মাছ মেলা। মেলায় মাছ কেনাবেচা হয়েছে ঢের। দেড় কেজি থেকে শুরু করে ১৮ কেজি ওজনের বাঘাইড়, বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, সিলভার কার্প, ব্রিগেডসহ হরেক রকমের মাছ বিক্রি হয় মেলায়। তবে দাম ছিল বহু ক্রেতার নাগালের বাইরে।

বিশাল আকৃতির বাঘাইড়, রুই, কাতলা ও চিতল মাছগুলো এক হাজার থেকে ৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। তবে মাঝারি আকারের মাছ ৩০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এ ছাড়া ২০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে ব্রিগেড ও সিলভার কার্প মাছ বেচাকেনা হয়। প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন উথলী মাছ মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের ২০ গ্রাম স্বজনদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পঞ্জিকানুসারে রবিবার পহেলা অগ্রহায়ণ হওয়ায় এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নবান্ন উৎসব পালন করে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর মাছ মেলা বসে উথলীতে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও উথলী, রথবাড়ী, ছোট ও বড় নারায়ণপুর, ধোন্দাকোলা, সাদুল্যাপুর, বেড়াবালা, আকনপাড়া, গরীবপুর, দেবীপুর, গুজিয়া, মেদেনীপাড়া, বাকশন, গণেশপুর, রহবল শিবগঞ্জসহ প্রায় ২০ গ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে চলে উৎসবের আয়োজন। প্রতিটি বাড়িতেই মেয়েজামাইসহ আত্মীয়স্বজনকে আগে থেকেই নিমন্ত্রণ করা হয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে তারা নতুন ধানের নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে।

নবান্ন উপলক্ষে মাছ মেলা শুধু নয়, জমি থেকে নতুন তোলা অন্যান্য শাকসবজির পসরাও সাজানো হয় মেলা চত্বরে। মেলায় নতুন আলু বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া মিষ্টি আলু ও কেশর (ফল) প্রতি কেজি দেড় শ টাকা বিক্রি হয়েছে।

গাইবান্ধার বালাসী ঘাটে যমুনা নদীতে ধরা পড়া পাঁচটি বিশাল আকৃতির বাঘাইড় মাছ বিক্রি করতে মেলায় এসেছিলেন ব্যবসায়ী শামছুল হক। প্রতিটি বাঘাইড় মাছের ওজন ১২ থেকে ১৫ কেজি। প্রতি কেজি মাছের দাম হাঁকছেন ৯০০ টাকা। কিন্তু দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মাত্র দুটি মাছ বিক্রি করতে পেরেছেন। ১৫ কেজি ওজনের একেকটি মাছ বিক্রি করেন ১১ হাজার টাকায়।

শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলার ব্যবসায়ী শিহাব প্রামাণিক বিশাল আকৃতির কয়েকটি বোয়াল মাছ নিয়ে মেলায় এসেছেন। প্রতি কেজির দাম চাইছেন এক হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত ১২ কেজির একটি বোয়াল মাছ ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন আট হাজার ৪০০ টাকায়। গত বছরের তুলনায় এবার দাম কিছুটা বেশি, বেচাকেনাও আশানুরূপ হয়নি।

অপর মাছ বিক্রেতা কালাই উপজেলার পুনট গ্রামের মোসলেম উদ্দিন মিয়া জানান, মেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক মাছের দোকান বসেছে। প্রত্যেক বিক্রেতা অন্তত ছয় থেকে ১০ মণ করে মাছ বিক্রি করেছে। মেলায় মাছ সরবরাহের জন্য ২০টি আড়ত খোলা হয়। সেসব আড়ত থেকে স্থানীয় বিক্রেতারা পাইকারি দরে মাছ কিনে মেলায় খুচরা বিক্রি করে।

মেলায় ১২ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছের দাম চাওয়া হয় ৬০০ টাকা হিসাবে সাত হাজার দুই হাজার টাকা।

স্থানীয় উথলী গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ব্যাংকার আবদুল কাদের বাবলু জানান, প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মেলাটি যেমন মাছের জন্য বিখ্যাত, তেমনি মেলার দিন নতুন শাকসবজিতেও ভরপুর থাকে। এ কারণে আশপাশের লোকজন মেলায় ছুটে আসে। তিনি বলেন, মেলা উপলক্ষে সেখানে নাগরদোলা, শিশু-কিশোরদের খেলনার দোকান বসেছে। সেই সঙ্গে মিষ্টান্ন ও দইয়ের একটি বড় বাজারও বসেছে মেলা চত্বরে।

শিবগঞ্জ উপজেলার ধোন্দাকোলা গ্রামের প্রতুল কর্মকার বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি এই মেলা। আশপাশের এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় নবান্নের মেলাটি জমজমাট হয়। মেলায় নবান্নের সব উপকরণওই পাওয়া যায়।’ 

মেলায় মাছ কিনতে এসে বেড়াবালা গ্রামের আজির উদ্দিন ও গণেশপুর গ্রামের সুখেন চন্দ্র দাস জানান, উথলীর নবান্ন মেলায় বিক্রির জন্য আশপাশের এলাকার পুকুরগুলোতে শৌখিন চাষিরা মাছ মজুদ করে রাখে। কে কত বড় মাছ মেলায় তুলতে পারে যেন তারই প্রতিযোগিতা চলে চাষিদের মধ্যে। এ ছাড়া আড়তদাররা তো আছেই। এলাকার লোকজনও প্রায় প্রতিযোগিতা করে তুলনামূলক বড় মাছ কিনে বাড়িতে নিয়ে যায়। হিন্দুদের নবান্ন হলেও আশপাশের গ্রামের সব সম্প্রদায়ের মানুষই কেনাকাটা করে।

উথলী বহুমুখী মৎস্য আড়তের স্বত্বাধিকারী ফজলুল বারী জানান, আগে মেলাটি ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা ব্যাপকতা লাভ করেছে। শুধু আশপাশেরই নয়, পুরো শিবগঞ্জ উপজেলার মানুষ এখানে নবান্নের বাজার করতে আসে। মাছ মেলার খবর পেয়ে শহর থেকেও অনেকে সেখানে ছুটে যায় মাছ কিনতে। তবে তুলনামূলকভাবে এবার মাছের আমদানি অনেকটা কম।

 

 

 



মন্তব্য