kalerkantho


ইউরোপীয় এমপিদের হুঁশিয়ারি

বাণিজ্য সুবিধা রাখতে চাইলে অঙ্গীকার পূরণ করুন

মেহেদী হাসান   

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বাণিজ্য সুবিধা রাখতে চাইলে অঙ্গীকার পূরণ করুন

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। গতকাল বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের স্ত্রাসবোর্গে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় তাঁরা বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা বহাল রাখতে চাইলে বাংলাদেশকে অবশ্যই মানবাধিকার ও অন্যান্য ইস্যুতে তার অঙ্গীকারগুলো পূরণ করতে হবে। শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনেরও তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যে ধরনের সহিংসতা হয়েছিল তা তাঁরা আর দেখতে চান না। বাংলাদেশকে অবশ্যই গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করতে হবে।

আলোচনা শেষে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তাবেও সুনির্দিষ্টভাবে ‘এভরিথিং বাট আর্মস, সংক্ষেপে ইবিএ’ (অস্ত্র ছাড়া সব কিছু) স্কিমের আওতায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ইবিএ স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধায় পণ্য রপ্তানির সুযোগ পায়। পার্লামেন্টে আলোচনা পর্বে পার্লামেন্ট  সদস্য (এমইপি) সাজ্জাদ করিম বলেন, ইইউ অব্যাহতভাবে বাংলাদেশকে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো ফল আসছে না। সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্টের অগ্রগতিও আশাব্যঞ্জক নয়। ইউরোপে বাণিজ্য সুবিধা বাতিল করার বিষয়ে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে কাজ শুরু হয়েছে। এ তালিকায় পরবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম আসতে পারে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ অভিহিত করে এমইপি জোসেফ উইডেনহোলজার আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে তিনি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

আলোচনায় অংশ নেওয়া এমইপিদের প্রায় সবাই আলোকচিত্রী শহীদুল আলমের বন্দি দশা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারার অপব্যবহার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম-খুন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক্স্বাধীনতা সংকোচনসহ সার্বিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁরা পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বাণিজ্য সুবিধা কাটছাঁটের প্রস্তাব করেছেন। অনেকে আবার পোশাকশিল্পে নজরদারিতে অ্যাকর্ডকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। রোহিঙ্গাদের এখনই ফেরত পাঠিয়ে তাদের বিপদের মুখে ঠেলে না দিতেও বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

গতকালের আলোচনা শেষে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ১৫ দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ওই প্রস্তাবে বাংলাদেশকে ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউয়ের (ইউপিআর) সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন, মারুফ জামান ও মীর আহমেদ বিন কাশেমসহ অন্য ব্যক্তিদের গুম হওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে অবিলম্বে মুক্তি ও তাঁর নামে মামলা প্রত্যাহারেরও জোরালো তাগিদ রয়েছে প্রস্তাবে। এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে এর বিতর্কিত ধারাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে সংশোধন করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিকূল সময়েও মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের জোরালো প্রশংসার পাশাপাশি সেখানে তাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন উদ্যোগ স্থগিত রাখতে আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। এ ছাড়া ইইউ ও অন্য দাতাদের রোহিঙ্গা শিবিরে আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান রয়েছে প্রস্তাবে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে। এ ছাড়া পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা মান নজরদারিতে অ্যাকর্ডের পরিদর্শন ব্যবস্থা বাতিল করায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতি রেখে শ্রম আইন সংশোধন, বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের ব্যতিক্রমী ধারা বাতিলের আহ্বান জানিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট তার প্রস্তাবে বলেছে, আগামী বছরের প্রথমার্ধে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ইইউ-বাংলাদেশ যৌথ কমিশনের বৈঠকেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় এমইপিরা ইতিবাচক বক্তব্য দিলেও গতকাল তাঁরা ছিলেন সমালোচনায় মুখর।

এমইপি চার্লস ট্যানোক বলেন, বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশ। এ দেশের সমালোচনা করার সময় এ বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত—এমন কথা অনেক বছর ধরে বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আলোকচিত্রী শহীদুল আলমের বন্দি দশা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ধারাগুলোকে যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহারের বিষয়টি আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না।’ আগামী মাসে জাতীয় নির্বাচনে সব দলকে শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে আমরা যে সহিংসতা দেখেছিলাম তা আর দেখতে চাই না।’

এমইপি ইগানজিয়ো কোরাও বাংলাদেশে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নিপীড়নকে অগ্রহণযোগ্য মন্তব্য করেন। ইইউয়ে বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার মতো মানবাধিকার পরিস্থিতি বাংলাদেশে আছে কি না তা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করতে তিনি ইইউয়ের মানবাধিকারবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভকে আহ্বান জানান। এমইপি সোরায়া পোস্ট বলেন, মানবাধিকারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাংলাদেশকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।

এমইপি জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে তার মূলে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। কিন্তু বাংলাদেশ দুর্ভাগ্যজনকভাবে অ্যাকর্ডের পরিদর্শন ব্যবস্থা বাতিল করে পুরো শিল্পকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। তিনি বাংলাদেশে উন্মুক্ত, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করেন।

এমইপি মিগুয়েল উরবান বাংলাদেশে গুম নিয়ে উদ্বেগ জানান। এমইপি মারজেটে সাকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করেছে। ইইউয়ে বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার মতো মানবাধিকার পরিস্থিতি বাংলাদেশে আছে কি না তিনি তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।

এমইপি টমাস জেকভস্কি বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির ব্যাপারে ইইউ চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। এমইপি জিসটফ হেটমেন বলেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গুম চলছে। জনগণের সমালোচনা সহ্য করা হচ্ছে না। তবে তিনি তাঁর বক্তৃতায় শহীদুল আলমও (আলোকচিত্রী) গুম হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।

এমইপি অ্যাগনেস জনগেরিয়াস বাংলাদেশে অ্যাকর্ডের কাজের সুযোগ বাতিল করার সমালোচনা করে বলেন, পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা পরিদর্শনে সক্ষমতা বাংলাদেশের এখনো হয়নি।

এমইপি প্যাট্রাস অসট্রেভিসিয়াস বাংলাদেশকে ইইউয়ে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা ঝুঁকিতে না ফেলার তাগিদ দেন। এমইপি মেরি ক্রিস্টিন ভারজিয়াট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে ‘মৃত্যু পরোয়ানা’ হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশকে এসংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন না করার আহ্বান জানান।

ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষে ক্রিস্টোস স্টাইলিয়ানিডেজ বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জোর তাগিদ দেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, টেকসই ও সম্মানজনক এবং জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার সম্পৃক্ততায় ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে হতে হবে।

 



মন্তব্য