kalerkantho


‘নির্বাচনী ট্রেন’ নিয়ে কাড়াকাড়ি

‘বিরতি স্থান’ দিতে সংসদ সদস্যদের চাপ

পার্থ সারথি দাস   

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘নির্বাচনী ট্রেন’ নিয়ে কাড়াকাড়ি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ট্রেন ও ট্রেন থামার স্থান নিয়ে বিভিন্ন এলাকার সংসদ সদস্যের মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি চলছে। নির্বাচনের আগে এলাকাবাসীর দাবি পূরণে রেলপথ মন্ত্রণালয়ও নড়েচড়ে বসেছে। এক এলাকায় চলাচলকারী ট্রেন আরেক এলাকায় চালু করে দাবি পূরণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে জনবিক্ষোভের কারণে বাতিল ট্রেন চালু করা হচ্ছে। রেল নিয়ে বিভিন্ন জেলায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিও পূরণ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ ট্রেন কাড়াকাড়ির ঘটনা ঘটে জয়দেবপুর-ঢাকার তুরাগ ট্রেন বাতিল করে ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটে চালুর মাধ্যমে। জয়দেবপুর-ঢাকার ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত বৃহস্পতিবার থেকে তুরাগ ট্রেনের যাত্রীরা বিপাকে পড়েছে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তখন তিনি ঢাকা-টাঙ্গাইল পথে সরাসরি ট্রেন চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে পার হয় চার বছর। কিন্তু ঢাকা থেকে বিভিন্ন রেলপথে নতুন বগি যুক্ত করে ট্রেন চালু করা হলেও এই ট্রেন চালু করা হয়নি। এর জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। আন্দোলনও হয়েছিল। গত ৬ নভেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল পথে ট্রেন চালুর জন্য গঠিত কমিটিকে নিয়ে জরুরি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে শেষ পর্যন্ত গত বৃহস্পতিবার ঢাকা-টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেন চালু করা হয়েছে। আর এটি চালু করা হয়েছে তুরাগ ট্রেনটি বাতিল করে।

ফলে গত বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথের ‘তুরাগ’ ট্রেনটি বন্ধ রয়েছে। তুরাগ ট্রেনটি বাতিল না করতে রেলমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল। তিনি গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই ট্রেন চালু না হলে আসন্ন ভোটে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আমি গত বুধ ও বৃহস্পতিবার বিষয়টি রেলমন্ত্রীকে জানিয়েছি। আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তুরাগ আবার চালু করা হবে।’

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-জয়দেবপুর পথে তুরাগ ট্রেনটি চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী বুধবার থেকে তুরাগ ট্রেনটি আবার চালু করা হতে পারে। তুরাগ ট্রেনটি চালু থাকায় আগে পেশাজীবীরা সকালে গাজীপুর থেকে ঢাকায় এসে সন্ধ্যার আগেই আবার গাজীপুর ফিরে যেতে পারত। মাত্র ২০ টাকা ভাড়ায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিটে গাজীপুর-কমলাপুর পথে চলত তুরাগ। সকাল ৭টা ২০ মিনিটে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে ছেড়ে ট্রেনটি সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর আসত। শুধু জয়দেবপুর স্টেশন থেকে আট শতাধিক যাত্রী যাতায়াত করত তুরাগে।

এদিকে দিনাজপুর-পঞ্চগড় রেলপথে আগে চলাচলকারী শার্টল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। ছয় বগির ওই বন্ধ ট্রেনটি ঢাকা-টাঙ্গাইল রেলপথে চালু করা হবে। এ ক্ষেত্রে ঢাকা-জয়দেবপুর পথে বাতিল করে বর্তমানে ঢাকা-টাঙ্গাইল পথে চলাচলকারী ট্রেনটি আবার ঢাকা-জয়দেবপুর পথে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এটি তুরাগ নামেই আগের মতো চালানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইল-৫ আসনের সংসদ সদস্য ছানোয়ার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা-টাঙ্গাইল পথে একটি আন্ত নগর ট্রেনের জন্য আমাদের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল দুই বছর আগে। ২০১২ সালের ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সরাসরি একটি ট্রেন চালুর। সর্বশেষ আমি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ৯ মাস আগে অনুরোধপত্র পাঠাই। সংসদে চারবার দাবিটি তুলি। এখন যে কমিউটার ট্রেন পেয়েছি, তাতে ৬৪২ আসন আছে। সাতটি স্থানে থামে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার ভ্রমণ সময়ে এখানে যাত্রী অনেক বেশি। সামনে নির্বাচন। মানুষ চায় মনের মতো ট্রেন। যতদূর জানতে পেরেছি, আমাদের জন্য দেওয়া কমিউটার ট্রেনটি আবার গাজীপুরবাসীর জন্য দেওয়া হবে। কারণ সেখানকার মানুষ ট্রেনটি বন্ধ হওয়ায় ক্ষুব্ধ। ভালো ও বড় ট্রেন বরাদ্দের বিষয়টি জানতে আগামীকাল আমি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে যাব।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুসারে পঞ্চগড় থেকে সরাসরি ট্রেন চালু করা হয়েছে গত শনিবার। ট্রেন বাড়ানো হয়েছে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রুটে। এ ছাড়া আরো কয়েকটি রুটে ট্রেন চালু করা হয়েছে।

বিরতিস্থান নিয়ে নির্বাচনী চাপ : এদিকে ট্রেনে যাত্রী বেড়ে যাওয়ায় আন্ত নগর ট্রেনের বিরতিস্থান আরো বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন এলাকার সংসদ সদস্যদের একের পর এক আধাসরকারিপত্র রেলপথ মন্ত্রণালয়ে জমা হচ্ছে। এর বাইরেও নানাভাবে তাঁরা মন্ত্রণালয়ে চাপ তৈরি করছেন বিরতিস্থানের জন্য।

গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল জানান, গাজীপুরে সকালে আন্ত নগর ট্রেনের বিরতি দেওয়া হলে মানুষ ভীষণ খুশি হবে। কারণ সড়কপথে গাজীপুর থেকে ঢাকায় চলাচলে চার ঘণ্টা লেগে যায়।

সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের অনুরোধে রেলপথ মন্ত্রণালয়ও বিভিন্ন আন্ত নগর ট্রেনের বিরতিস্থান বাড়িয়ে চলেছে। এতে আন্ত নগর ট্রেনের সময়সূচি পরিবর্তিত এবং ভ্রমণসময় বেড়ে যাচ্ছে। চলতি বছর প্রায় ৪০টি স্থানে যাত্রাবিরতির অনুরোধ আসে। এর মধ্যে ১২টি স্থানে যাত্রাবিরতির অনুমোদন দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে চলাচলকারী ‘মহানগর প্রভাতী’ ও ‘আন্ত নগর গোধূলী’র বিরতিস্থান ২০১৩ সালে কুমিল্লার লাকসামে করা হয়েছিল। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী রেলস্টেশনে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের আন্ত নগর গোধূলী ও মহানগর প্রভাতী ট্রেনের নতুন বিরতিস্থান চালুর আদেশ জারি করা হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর থেকে এ আদেশ কার্যকর করা হয়েছে। এটি রেলমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা। এলাকাবাসীর দাবি পূরণে এটি করা হয়েছে।

জানা গেছে, একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের অনুরোধপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি যাত্রাবিরতি করছে। ঢাকা-সিলেট রেলপথের আন্ত নগর কালনী ট্রেনটি এখন শমসেরনগর স্টেশনে থামে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ ঢাকা-ভৈরব রেলপথে তিন জোড়া ট্রেনের জন্য পুবাইল রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতি চেয়েছেন। ঘোড়াশাল, গাজীপুর, জয়দেবপুর, ঢাকার তেজগাঁও ও শ্যামপুরের বরইতলা, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন স্থানে যাত্রাবিরতি নির্ধারণের জন্য সংসদ সদস্যদের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের রেলের জন্য নতুন বগি আসবে আগামী মার্চের মধ্যে। বর্তমানে পুরনো বগি দিয়েই ট্রেন চালু করতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে আমরা নতুন ট্রেন চালু করছি। ঢাকা-জয়দেবপুর পথে আগের মতোই তুরাগ পরিচালনার জন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।’ বিরতিস্থান বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জনস্বার্থে আমরা সব করছি।’

 

         



মন্তব্য