kalerkantho


ভাঙল সাহিত্যের উৎসব, মানবিক বিশ্বের প্রত্যাশা

কাঁদলেন মনীষা কৈরালা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ভাঙল সাহিত্যের উৎসব, মানবিক বিশ্বের প্রত্যাশা

বাংলা একাডেমিতে গতকাল ঢাকা লিট ফেস্টের শেষ দিনে ‘হিল্ড’ শিরোনামের অধিবেশনে অতিথি ছিলেন বলিউডের অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা (ডানে)। ছবি : তারেক আজিজ নিশক

মুক্তচিন্তা, বাক্স্বাধীনতা ও নারীর অধিকার আদায়ের লড়াই বেগবান করার লক্ষ্যে শেষ দিনেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছিল উৎসবমুখর। শিল্প-সাহিত্য নিয়ে চলে মনোজ্ঞ আলোচনা। ফাঁকে ফাঁকে দেশ-বিদেশের লেখকদের আড্ডা। ছিল কবিতা আবৃত্তি, গানের আসরসহ নানা আয়োজন। বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণজুড়ে বেশ কয়েকটি মঞ্চ। গতকাল শনিবার শেষ দিনে সব মঞ্চই আলোকিত করেন বরেণ্য লেখক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্প সমালোচক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীসহ নানা ভুবনের উজ্জ্বল মানুষ। গতকাল ঢাকা লিট ফেস্টের শেষ দিনে তাঁদের কথায় উচ্চারিত হলো মানবিক পৃথিবী গড়ার প্রত্যাশা।

কথাসাহিত্যিক কাজী আনিস আহমেদ, কবি সাদাফ সায সিদ্দিকী ও কবি আহসান আকবরের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা লিট ফেস্ট। এতে অংশ নেন বাংলাদেশসহ ১৫ দেশের তিন শতাাধিক কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, অভিনয়শিল্পী, চিন্তাবিদ ও গবেষক। যাত্রিক আয়োজিত উৎসবের সহযোগিতায় ছিল সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমি। এবারের উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিল ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউন। সহপৃষ্ঠপোষক ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। লিট ফেস্টের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আরো বক্তব্য দেন অস্কারজয়ী ব্রিটিশ অভিনেত্রী টিল্ডা সুইন্টন ও উৎসব পরিচালক সাদাফ সায।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমার মনে হয় বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক জীবনে উত্থান-পতন আছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাতাস আমরা সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের পালে লাগতে দিই না। নির্বাচন আমাদের খুব সন্নিকটে, পরিবেশ খুব ভালো এবং শান্ত। যাঁরা এখানে বিদেশি অতিথিরা এসেছেন, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনারা কি বুঝতে পেরেছেন যে দেশে ইলেকশন সামনে? দেয়ার ইজ নো ইলেকশন ফিভার, অ্যান্ড ইট ইজ গুড। এর মানে হলো, আমরা ভালো আচরণ করছি এবং ডিসেম্বরেই নির্বাচন হবে।’

এর আগে গতকাল উৎসব আঙিনা বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘হিল্ড’ শীর্ষক অধিবেশনে অংশ নেন মনীষা কৈরালা। উৎসব পরিচালক সাদাফ সায সঞ্চালিত আলোচনায় মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন মনীষা। শ্রোতায় পরিপূর্ণ মিলনায়তনে সবাইকে বাকরুদ্ধ করে শোনালেন কেমন করে মৃত্যুকে পরাজিত করে জয় করে নেওয়া যায় জীবনকে।  সেই সঙ্গে বলেছেন, বহিরাগত হয়েও কেমন করে জায়গা করে নিলেন বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে।       

আলাপচারিতায় মনীষা ফিরে যান ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর। বললেন, ‘সেদিন মৃত্যু আমার দুয়ারে কড়া নাড়ে। কিন্তু আমি মরতে চাইনি। আমি  চোখ বন্ধ করেছিলাম, চোখ মেলে দেখি কালো হয়ে আসছে আমার আকাশ। নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, এর মধ্য দিয়েই যেতে হবে আমাকে। একসময় জানতে পারলাম আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৪৪ শতাংশ, উল্টো পিঠে  মৃত্যুর ঝুঁকি ৫৬ শতাংশ। আমার হার্টবিট বেড়ে গেল। সব কিছু যেন থমকে গেল। তবে অসহনীয় শারীরিক যাতনার মধ্যেও হাল ছাড়িনি। ঝাঁপিয়ে পড়লাম জীবনযুদ্ধে।’

দৃঢ়চেতা কণ্ঠে মনীষা বলে যান, ‘প্রথমে হাসপাতাল থেকে কেউই আমাকে কিছু জানাচ্ছিল না। একপর্যায়ে দেখলাম পরিবারের সবাই এসে হাজির হলো হাসপাতালে। সবার মুখে ভয় দেখলাম। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।  শুরুতে চিকিৎসকরাও কিছু জানাচ্ছিল না। একপর্যায়ে পরীক্ষা করার পর জানানো হলো, লিড স্টেজে ছড়িয়ে পড়েছে আমার ক্যান্সার। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম চিকিৎসকের দিকে। একসময় বলা হলো, আমার জরায়ুর ক্যান্সার হয়েছে এবং সেটা কেটে ফেলে দিতে হবে। আমি সন্তানের মা হতে চেয়েছিলাম। তখন উপলব্ধি হলো, আমি কখনো মা হতো পারব না। এভাবেই আমার জীবনের নিঃসঙ্গ রাত শুরু হলো। সেই সঙ্গে শুরু আমার ভয়ংকর দিনগুলো।’ কথা বলতে বলতে মনীষার চোখের কোল গড়িয়ে ঝরে পড়ে বেদনার অশ্রুজল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭১তম জন্মদিন উপলক্ষে গল্পকার থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁকে নিয়ে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা কবিতার সংকলন ‘পিস অ্যান্ড হারমনি : সেভেন্টি ওয়ান পোয়েমস ডেডিকেটেড টু শেখ হাসিনা’। কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে কসমিক টেন্টে আলোচনা করেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ সামাদ, কামাল চৌধুরী, আবুল আজাদ, সংকলনের সম্পাদক আহমেদ রেজা, সংকলনের ইংরেজি অনুবাদক আনিস মুহাম্মদ প্রমুখ। রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কবিতা সবাইকে নিয়ে লেখা যায় না, সব বিষয় নিয়েও লেখা যায় না। কিন্তু পদ্য লেখা যায়। পদ্যে শব্দের অর্থ আক্ষরিক নয়; কিন্তু কবিতায় শব্দের অর্থ আক্ষরিক। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ও কবিতা লেখা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যখন তাঁর নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ ছিল তখনো একজন কবি তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তিনি হচ্ছেন নির্মলেন্দু গুণ। সুতরাং আমাদের দেশের কবিদের নিয়ে যতই হাসিঠাট্টা, তামাশা করি না কেন, আমাদের দেশের কবিরা জাতির দুঃসময়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান।’

সাহিত্যে ‘মিটু’র প্রভাব : সাহিত্যে ‘#মিটু’ আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে ‘নো নোবেল : মিটু ইন লিটারেচার’ শীর্ষক আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন জার্মান লেখক ওলগা গ্রাসনোয়া, ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক অধ্যাপক ফিলিপ হেনশার, ব্রিটিশ লেখক রিচার্ড বিয়ার্ড, আমেরিকান লেখক রস পটার এবং ভারতীয় লেখক ও সমাজকর্মী হিমাঞ্জলি শংকর। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত অধিবেশনটিতে সঞ্চালক ছিলেন ভারতীয় লেখক চন্দ্রবিভাস চৌধুরী।

‘প্যারাসাইটস লাইক আস’ : পুলিৎজারজয়ী সাহিত্যিক অ্যাডাম জনসনের প্রথম উপন্যাস ‘প্যারাসাইটস লাইক আস’। এ শিরোনামে আলোচনা করেন অ্যাডাম জনসন ও ফিলিপ হেনশার। সঞ্চালনায় ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মন্ময় জাফর।

অন্যান্য অধিবেশন : আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও লিঙ্গুয়িস্টিকস সার্ভে অব বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় প্রকাশিত হতে যাওয়া ২০ খণ্ডের ভাষাবিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ নিয়ে ভাষার বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলেন কবি কামাল চৌধুরী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক জীনাত ইমতিয়াজ আলী ও ভাষা গবেষক সৌরভ শিকদার। এ আলোচনার সূত্রধর ছিলেন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গর্গ চট্টোপাধ্যায়।



মন্তব্য