kalerkantho


শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বললেন

আমার লেখার ধরন গুটি থেকে সুতো পাকানোর মতো

নওশাদ জামিল   

১১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আমার লেখার ধরন গুটি থেকে সুতো পাকানোর মতো

‘আমার লেখার কোনো ছক নেই, পরিকল্পনা নেই। আমার লেখার ধরন অদ্ভুত। লিখতে বসার আগ পর্যন্ত জানি না কী লিখব। একটা মনে ধরার মতো লাইনের জন্য অপেক্ষা করি। যদি ওই বাক্যটি পছন্দ হয় লিখতে শুরু করি। এমনও হয়েছে বাক্যে একটি শব্দ খুঁজতে গিয়ে ১২/১৩ দিন লিখতে পারিনি। আবার কোনো কোনো দিন ১২/১৩ ঘণ্টা টানা লিখে গেছি। আমার লেখার ধরন অনেকটা তুলোর গুটি থেকে সুতো পাকানোর মতো। ধীরে ধীরে একেকটি চরিত্র দেখতে পাই। তাদের মুখ, শরীর কাঠামো, পোশাক ভেসে ওঠে চোখের সামনে। তাদের জীবনযাত্রা, কথা দেখতে পাই। তখন আমার গল্প, উপন্যাস যেন হয়ে ওঠে একটি প্রতিবেদন লেখার মতো। তবে এভাবে লেখা প্রত্যাশিত নয়। আমার লেখার ধরনটা বৈজ্ঞানিকও নয়। কিন্তু আমি নিরুপায়।’ বাংলাদেশের পাঠকদের উদ্দেশে এভাবেই বললেন দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

ঢাকা লিট ফেস্টে এসেছিলেন ৮৩ বছর বয়সের প্রবীণ কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। লিট ফেস্টেও শেষ দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন এ লেখক। বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক অধিবেশনে শিল্প, সাহিত্য, নিজের লেখালেখিসহ নানা প্রসঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। তাঁর কথা শুনতে জড়ো হয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। গোটা মিলনায়তন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। গতকাল শনিবার লিট ফেস্টের শেষ দিনে শেষ সেশন ছিল ‘শীর্ষেন্দুর সঙ্গে কথোপকথন’। সঞ্চালক ছিলেন সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।

শীর্ষেন্দু বলেন, ‘মানুষের জীবনের চলার পথে কিছু গর্ত রয়েছে, যা এড়ানো যায় না। মানুষ ভেতরে ভেতরে নিষ্ঠুর, কখনো কখনো খুব দয়ালু হয়ে ওঠে। মনের সঙ্গে এই খেলা চলে যাকে আমরা বুঝতে পারি না। মনের মধ্যে এমন ভাবনা আসে, যা প্রকাশ করা যায় না; যাকে আমরা বোতলবন্দি করে রাখি। কিন্তু মনের মধ্যে সেটা থেকে যায়। আমি এই বিচিত্র জীবনকে দেখি। জীবন কত ভাবেই না প্রকাশিত হচ্ছে। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মানুষ দেখি।’

নিজের লেখা প্রসঙ্গে তিনি শীর্ষেন্দু বলেন, “যখন লেখালেখি শুরু করি তখন আমার লেখা কেউ বুঝতে পারত না। সে জন্য আমি জনপ্রিয় লেখক হতে পারিনি। আমার মধ্যে ভয় কাজ করত লেখা যদি কেউ বুঝতে না পারে, তাহলে আমার পত্রিকা থেকে চাকরিটা না চলে যায়! আমার প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’ পড়ে কেউ কেউ বলেছিলেন, ওর লেখা পড় না, মন খারাপ হয়ে যায়। আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম তা শুনে। কিন্তু লিখতেই সব সময় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।”

শীর্ষেন্দু বলেন, একটি গল্পে স্লট মেশিনে পয়সা ঢোকানো আর কার্ড বেরিয়ে আসার বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে আমার তা পছন্দ হচ্ছিল না। পরে তা ৫০ বার লিখেছি। এই গল্পটি লিখতে আমার পৌনে দুই বছর সময় লাগে। এই গল্পটি যখন ছাপা হয় তখন তা খুব একটা আলোচনায় আসেনি। কিন্তু এতে আমার কিছু যায় আসে না। কেননা, আমি তো নিজের জন্যই লিখি।’  তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় একটা চেতন অবচেতনে বিরাজ করি। অনেক সময় মনেও থাকে না আমি লেখক। অদ্ভুত ধরনের এক অন্যমনষ্কতা কাজ করে। রাস্তাঘাটে আমি খুবই অনিরাপদভাবে চলাচল করি। একজন ব্যক্তি জীবনযাপনে অনেক টুকরোতে বিভক্ত হয়ে জীবন যাপন করে। স্ত্রীর স্বামী, সন্তানের বাবা। আমিও তাই।’

আলোচনায় উঠে আসে শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ উপন্যাস প্রসঙ্গ। এ নিয়ে শীর্ষেন্দু বলেন, দেবদাস উপন্যাসে লজিকের খুব অভাব। শরৎচন্দ্র অল্প বয়সে লিখেছিলেন। ওই বয়সে বুদ্ধি পাকে না। সে জন্য লেখায় গ্যাপ রয়েছে। কিন্তু স্টোরি টেলিংয়ে শরৎচন্দ্রের মতো ম্যাজিশিয়ান বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি নেই। ওই রকম একটা উপন্যাস এ অঞ্চলের মানুষ ১০০ বছর ধরে পড়ছে। তাঁর কষ্টে চোখের জল ফেলছে।



মন্তব্য