kalerkantho


তিন লাখ মাদক মামলা ঝুলছে

এস এম আজাদ   

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



তিন লাখ মাদক মামলা ঝুলছে

সারা দেশে এখন মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত তিন লাখ মামলা বিচারাধীন। বেশির ভাগ মামলাই বছরের পর বছর ধরে ঝুলছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে। ছাড়া পেয়ে আবার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। কেউ কেউ সামান্য পরিমাণ মাদক বহনের কারণে ধরা পড়ে বছরের পর বছর কারাগারে রয়েছে।

সময়মতো মামলার বিচার না হওয়ায় দেশে মাদকের ভয়াবহতা যেমন কমছে না, তেমনি পুনর্বাসনপ্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত জুন মাস পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে একটি বিবরণী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে অধিদপ্তর। সেখানে তিন লাখ ১৬ হাজার ২৭টি মামলা বিচারাধীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মামলা ৫১ হাজার ৮৭১টি। পুলিশ, র‌্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্ট গার্ডসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মামলা হয়েছে দুই লাখ ৬৪ হাজার ১৫৬টি। এসব মামলার তদন্ত করে পুলিশ। সবচেয়ে বেশি বিচারাধীন মাদক মামলা আছে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে। এ সংখ্যা ৭২ হাজার ৭৪৩।

গত বছরের ২৬ এপ্রিল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেওয়া আরেকটি তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, সেই সময় সারা দেশে দুই লাখ ১৬ হাজার ৩৯৮টি মাদক মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ডিএনসির এককভাবে মামলা আছে ৪৬ হাজার ২১৪টি। ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মামলা ছিল ৫৬ হাজার ১২০টি। এ হিসাবে গত এক বছরে এক লাখেরও বেশি মামলা বেড়েছে।

গত মে মাস থেকে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের কারণে মামলার সংখ্যা বেড়েছে। অক্টোবরের এ পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। ফলে এখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ।

পুলিশ সদর দপ্তরের গত বছরের মামলার হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) মোট ৪৯ হাজার ৮৮২টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ২২ হাজার ৫২৩টি মাদকের মামলা। অর্থাৎ মোট মামলার ৪৫.১৫ শতাংশই মাদকসংক্রান্ত।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত ৪ মে থেকে র‌্যাব এবং পরবর্তী সময়ে অন্য সংস্থাগুলোর মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের কারণে এসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বেড়েছে। তবে বাড়েনি বিচারের গতি। এমন পরিস্থিতিতে আলাদা আদালতে মাদক মামলার বিচারের প্রস্তাব দেওয়া হলেও পাঁচ বছর ধরে সেই প্রস্তাব ফাইলবন্দি পড়ে আছে। তবে নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে (সংশোধনের প্রক্রিয়ায় আছে) মাদক মামলাগুলো বিশেষ আদালতে বিচারের বিধান রাখা হচ্ছে। আইনটি অনুমোদন পেলে মামলাজট কমবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অসংখ্য মামলা বিচারাধীন থাকা অপরাধীদের সাজার ব্যাপারে বড় ধরনের বাধা। পৃথক আদালতে এ মামলা বিচারের জন্য আমরা লিখেছিলাম। সেটি কার্যকর হয়নি। তবে নতুন আইন অনুমোদন পেলে এ সংকট কমবে। কারণ সেখানে বিশেষ আদালতে মাদক মামলার বিচারের বিধান থাকছে।’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিচারাধীন মামলাগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য অধিদপ্তরের প্রতিটি জেলায় প্রসিকিউশন অফিসার দরকার। আছেন মাত্র চারজন। প্রসিকিউশন অফিসার বাড়ানোর ব্যাপারে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০১৩ সালের ৩ মার্চ জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের ত্রয়োদশ সভায় মাদক মামলার বিচারের জন্য আদালত সুনির্দিষ্ট করতে (আলাদা) আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘প্রতি জেলায় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতকে মাদক অপরাধ মামলার বিচারের জন্য সুনির্দিষ্ট করার বিষয়ে একটি প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হবে অথবা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ ওই বছরের ১১ জুলাই ডিএনসির তৎকালীন ডিজি মোহাম্মদ ইকবাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। চিঠিতে তিনি জানান, তখন দেশে ৪৮ হাজার মাদকের মামলা বিচারাধীন ছিল। ওই মামলার বিচার শেষ করতে কমপক্ষে ২০ বছর লাগবে। আর বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মাদক মামলার আসামিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে একই অপরাধ করে যাচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন এবং দ্রুত বিচার আদালতের মতো আলাদা আদালতে বিচার হলে মাদক মামলার জটও কমবে বলে ধারণা তাঁদের। এ জন্য ডিএনসির পক্ষ থেকে তিন দফায় চিঠি দেওয়া হয়। তবে তা কার্যকরের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুটি বিভাগ করার (জননিরাপত্তা বিভাগ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ) পর সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে মাদকসংক্রান্ত মামলার তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এসব মামলা তদন্তাধীন, চার্জ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়াসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আছে।

 



মন্তব্য