kalerkantho


জয়নাবের ধর্ষক ইমরানের ফাঁসি কার্যকর

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



জয়নাবের ধর্ষক ইমরানের ফাঁসি কার্যকর

পাকিস্তানে আলোচিত শিশু জয়নাব আনসারি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত শিশু সিরিয়াল কিলার ইমরান আলীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ভোরে লাহোরের কোট লাখপত কারাগারে শিশু জয়নাবের বাবার উপস্থিতিতে কুখ্যাত ২৪ বছর বয়সী ইমরান আলীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

পাঞ্জাব প্রদেশের কাসুর শহরে গত জানুয়ারিতে ছয় বছরের শিশু জয়নাব আনসারিকে ধর্ষণপূর্বক হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় অপরাধী ধরতে পুলিশের গড়িমসি ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। এ নিয়ে দেশব্যাপী তীব্র বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কাসুরে বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে দুজন মারা যায়। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি সিসিটিভির সূত্র ধরে নিখোঁজের পাঁচ দিন পর একটি ডাস্টবিন থেকে জয়নাবের লাশ উদ্ধার এবং ঘটনার দুই সপ্তাহ পর ধর্ষক ও খুনি ইমরান আলী গ্রেপ্তার হয়।

স্থানীয় পুলিশ অফিসার মোহাম্মদ আফজাল বলেন, ইমরানকে গতকাল ভোর হওয়ার ঠিক আগে ফাঁসিকাষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেট ও ডাক্তারের উপস্থিতিতে তাঁকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয়। তিনি জানান, তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার সময় ফাঁসিকাষ্টের সামনে জয়নাবের বাবা মোহাম্মদ আমিন আনসারি ও জয়নাবের এক চাচা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় কারাগার ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ফাঁসির পর ইমরানের লাশ তাঁর এক আত্মীয় ও দুই বন্ধুর হাতে তুলে দেওয়া হয়। গতকাল রাতে কাসুরে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।

ফাঁসি কার্যকরের আগে ইমরান আলীকে প্রকাশ্যে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানোর জন্য আদালতে আবেদন করেছিলেন জয়নাবের বাবা আমিন আনসারি। গত সপ্তাহে লাহোর হাইকোর্ট এই আবেদন খারিজ করে দিলে ফাঁসি কার্যকরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কারাগার কর্তৃপক্ষ।

ফাঁসি কার্যকরের পর জয়নাবের বাবা আমিন আনসারি ইমরানের ফাঁসির দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার না করায় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বেঁচে থাকলে আজ (গতকাল বুধবার) জয়নাবের বয়স হতো সাত বছর দুই মাস। তার মা দুঃখ-কষ্টে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।’ তবে ফাঁসি কার্যকর করায় তিনি বিচার বিভাগ, সরকার ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আমিন আরো বলেন, ‘আমার মেয়ে আর ফিরে আসবে না। তবে আমি সন্তুষ্ট। আমি বিচার পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিজের চোখে তাঁর (ইমরানের) ভয়ংকর পরিণতি দেখেছি। তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে নেওয়া হয়। এক ঘণ্টা ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়।’

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি বাড়ির পাশ থেকে নিখোঁজ হয় ছোট্ট ফুটফুটে শিশু জয়নাব। কোরআন শিখতে যাচ্ছিল সে। ৯ জানুয়ারি একটি আবর্জনার স্তূপ থেকে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয় শিশুটিকে। তার নিথর মুখে তীব্র যন্ত্রণার ছাপ ছিল। ওই সময় জয়নাবের মা-বাবা মক্কায় ওমরাহ পালনে গিয়েছিলেন। সে তখন তার মামার কাছে ছিল।

জয়নাবের এই করুণ মৃত্যুর খবরে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে পাকিস্তানের মানুষ। জয়নাবের হাসিমুখের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে ক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসে কাসুরবাসীসহ বিভিন্ন শহরের মানুষ। বিশেষ করে জয়নাবের ঘটনার আগে এক বছরের মধ্যে কাসুরের ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে একই ধরনের ঘটনার শিকার হয় আরো ১২টি মেয়েশিশু। এ অবস্থায় জয়নাব ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়ে কাসুরবাসী, যা খুব দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ‘হ্যাশট্যাগ জাস্টিস ফর জয়নাব’ লিখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে তীব্র প্রতিবাদ। এতে যোগ দেন চলচ্চিত্র ও ক্রিকেট তারকারাসহ বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ।

পরে অপরাধীর খোঁজ পেতে এক কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এর আগে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ জানালেও পুলিশ অনুসন্ধানে নামেনি বলে অভিযোগ করে তার পরিবার ও এলাকাবাসী।

পরে ফরেনসিক পরীক্ষার সূত্র ধরে ২৪ জানুয়ারি ইমরান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সে আদালতে জয়নাব ধর্ষণ ও হত্যা এবং আরো ছয়টি শিশু হত্যার কথা স্বীকার করে এবং গত ফেব্রুয়ারিতে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়। একই সঙ্গে আরো ছয়টি শিশু হত্যাকাণ্ডেও তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও তা নাকচ হয়। সুপ্রিম কোর্ট আদেশে বলেছিলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে সে অনুকম্পা পাওয়ার অধিকার রাখে না।’ পরে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভিও জীবন ভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

শিশু নির্যাতনের শহর কাসুর : ডন জানায়, পাঞ্জাবের কাসুর শহর শিশু নির্যাতনের জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কুখ্যাতি অর্জন করেছে। শহরে শিশু অপহরণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ একটি সাধারণ ঘটনা। ২০০৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত শহরটিতে ২৮০টি শিশু অপহরণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সূত্র : বিবিসি, এপি ও ডন।

 



মন্তব্য