kalerkantho


বাণিজ্য প্রতিযোগিতা

সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশ এক ধাপ পিছিয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশ এক ধাপ পিছিয়েছে

বিশ্ববাজারে নিজেদের পণ্য ও সেবা বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আগের মতো নেই বাংলাদেশের। দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তথ্য-প্রযুক্তি স্থাপন ও ব্যবহার পর্যাপ্ত না হওয়া এর একটি বড় কারণ। এ ছাড়া স্বল্প সুদে ঋণপ্রাপ্তির অভাব, উচ্চ কর ও জটিল কর ব্যবস্থাপনাসহ বড় বড় বেশ কয়েকটি কারণে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় বাংলাদেশ গত বছরের তুলনায় এক ধাপ পিছিয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) তৈরি করা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন ২০১৮-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। গ্লোবাল কম্পিটিটিভ ইনডেক্স (জিসিআই) বা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে গত বছরের চেয়েও তুলনামূলক ভালো ফল করার পরও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সামগ্রিক বিবেচনায় এক ধাপ পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ। এ বছর ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩। ২০১৭ সালে ওই সূচকে অংশ নেওয়া ১৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০২।

গতকাল বুধবার বিশ্বব্যাপী একযোগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ডাব্লিউইএফ। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডাব্লিউইএফের পক্ষে বাংলাদেশে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে পণ্যবাজার, আর্থিক ব্যবস্থা, বাজারে গতিশীলতা না আসাসহ বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

তবে সিপিডি বলেছে, গত এক বছরে বাংলাদেশ বেশ কিছু খাতে উন্নতি করলেও দুর্নীতি, অবকাঠামোগত সমস্যা, উচ্চ করহার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগসহ ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান মোট ১৬টি সমস্যার কারণে সূচকে পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বাণিজ্য সক্ষমতা সম্পর্কে বাংলাদেশের ৮৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর একটি মতামতধর্মী জরিপের তথ্য সন্নিবেশিত হয়। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি হলেও জরিপটি চালানো হয় এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত।

গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, এবার এই সূচক তৈরির মেথোডোলজিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। তুলনা করার সুবিধার জন্য এ প্রতিবেদনে গত বছরের সূচকের অবস্থানও প্রকাশ করা হয়েছে। একটি দেশের অবস্থান বিচারের জন্য প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, পণ্যবাজার, শ্রমবাজার, আর্থিক ব্যবস্থা, বাজারের আকার, বাজারের গতিশীলতা, নতুন ধারণার আত্তীকরণ—এই ১২টি মানদণ্ড ব্যবহার করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। এসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রতিটি সূচকে ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশের গড় স্কোর হয়েছে ৫২.১, যা গত বছরের স্কোরের চেয়ে ০.৭ বেশি। তবে অন্যান্য দেশের স্কোর এর চেয়ে বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ র্যাংকিয়ে পিছিয়ে পড়েছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিচারে সূচকের মানদণ্ডগুলোর মধ্যে প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, শ্রমবাজার, বাজারের আকার, উদ্ভাবনী ক্ষমতায় বাংলাদেশের উন্নতি হলেও পণ্যবাজার, আর্থিক ব্যবস্থা ও বাজারের গতিশীলতায় অবনতি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ১৬টি সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সমস্যাগুলো হলো—দুর্নীতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শিক্ষিত কর্মীর অভাব, ঋণপ্রাপ্তির সমস্যা, নীতির স্থিতিশীলতা না থাকা, উচ্চ করহার, কর নিয়ন্ত্রণের জটিলতা, দুর্বল শ্রম আইন, বারবার সরকার পরিবর্তন, অপরাধ ও চুরি, জটিল করনীতি, প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও উদ্ভাবনের অভাব, দুর্বল জনস্বাস্থ্য, বৈদেশিক মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি ও রক্ষণশীল শ্রম নীতিমালা। এর মধ্যে ছয়টিতে গত বছরের তুলনায় সামান্য উন্নতি হলেও তা এক ধাপ অবনমন ঠেকাতে যথেষ্ট ছিল না।

এ বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির উন্নতির জন্য দরকার আইসিটি বা তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে পুঁজির সমন্বয় করে এগিয়ে চলা।

নির্বাচনের বছর হলেও ২০১৮ সালকে তেমন ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেননি জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা। তবে এই সময়ে উৎপাদন, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান সিপিডির গবেষকরা।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে এশিয়ার ভিয়েতনাম চার ধাপ এগিয়ে ৭৪তম স্থানে উঠে এসেছে, কম্বোডিয়া এক ধাপ এগিয়ে ১১০তম স্থানে এসেছে। এবারও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির স্কোর ৮৫.৬। সিঙ্গাপুর ও জার্মানি রয়েছে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে। শীর্ষ ১০-এ থাকা অন্য সাতটি দেশ যথাক্রমে—সুইজারল্যান্ড, জাপান, নেদারল্যান্ডস, হংকং, যুক্তরাজ্য, সুইডেন ও ডেনমার্ক।

এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া এক ধাপ এগিয়ে ২৫তম, থাইল্যান্ড দুই ধাপ এগিয়ে ৩৮তম, ইন্দোনেশিয়া দুই ধাপ এগিয়ে ৪৫তম এবং ফিলিপাইন ১২ ধাপ এগিয়ে ৫৬তম স্থানে এসেছে।

এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারত। ৬২ স্কোর নিয়ে ভারত আছে সূচকের ৫৮ নম্বরে। গতবারের চেয়ে পাঁচ ধাপ উন্নতি হয়েছে প্রতিবেশী এই দেশটির। শ্রীলঙ্কা ৫৬ স্কোর নিয়ে সূচকের ৮৫তম, ৫১ স্কোর নিয়ে পাকিস্তান সূচকের ১০৭ নম্বরে এবং নেপাল ৫০.৮ স্কোর নিয়ে ১০৯ নম্বর অবস্থানে রয়েছে। মালদ্বীপ, ভুটান ও আফগানিস্তানের ওপর এ জরিপ চালানো হয়নি। এ বছর নতুন করে যে পাঁচটি দেশ এই সূচকে এসেছে সেগুলোর মধ্যে চারটিই বাংলাদেশের নিচে রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।

 

 

 



মন্তব্য