kalerkantho


কুমারীপূজায় ভক্তের ঢল

আজ মহানবমী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০




কুমারীপূজায় ভক্তের ঢল

শারদীয় দুর্গোৎসবের তৃতীয় দিনে মহাষ্টমীতে গতকাল কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ছবিটি ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের। ছবি : কালের কণ্ঠ

ত্রিশক্তিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। আর সেই শক্তি বীজ আকারে কুমারীতেই আছে—সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এমন বিশ্বাস থেকেই দেবী দুর্গার কুমারী রূপের আরাধনা করেন তাঁর ভক্তরা।

গতকাল বুধবার শারদীয় দুর্গোৎসবের তৃতীয় দিনে মহাষ্টমীতে রাজধানীসহ সারা দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নারীতে ‘পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন’—এ বিশ্বাস নিয়ে দেবী দুর্গার বন্দনায় পূজা-অর্চনা ও আরাধনায় মেতেছিলেন। আজ মহানবমী। আর শুক্রবার বিজয়া দশমী।

দুর্গোৎসবের অষ্টমী তিথিতে ‘সর্ববিদ্যাস্বরূপিণী’ কুমারী রূপের আরাধনা হয়েছে। রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন শুধু নয়, সব মণ্ডপেই দেবী দুর্গার জন্য ভক্তের ঢল নামে। ঢাকের তালে, গীতের সুরে, আবৃত্তিতে চারিধার ভরে ওঠে ভক্তিরসে।

সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বহু বছর আগে নিজের স্ত্রী সারদা দেবীকে মাতৃজ্ঞানে যে পূজা করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশের মিশন ও মঠগুলোতে কুমারীপূজা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, নারীর

সম্মান, মানুষের সম্মান ও ঈশ্বরের আরাধনাই কুমারীপূজার শিক্ষা। ভোরে সারা দেশে রামকৃষ্ণ মঠের পাশাপাশি রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠেও কুমারীপূজার আয়োজন করা হয়। সকাল থেকে বিরামহীন ঢাকের আওয়াজের সঙ্গে থেমে থেমে চলে কাসর ঘণ্টা, শঙ্খনাদ ও উলুধ্বনি।

‘জাগো দুর্গা, দশভুজা জগজ্জননী মা’, ‘শারদা শারদা রাগে’, ‘দুর্গতিনাশিনী দুর্গা মা, শুভমতিদায়িনী দুর্গা মা’— এমন সব ভক্তিগীতির সুর-ছন্দে মেতে ওঠে ভক্তপ্রাণ। দুর্গাপূজার মণ্ডপে চলে চণ্ডি পাঠের মাধ্যমে দেবীর অর্চণা।

আমাদের হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জে রামকৃষ্ণ মিশনে এবারও হাজার হাজার ভক্ত উপস্থিত হয়েছিল কুমারীপূজায়। সকাল ১০টায় কুমারী পূজিত হয় ৯ বছর বয়সী ব্রাহ্মণকন্যা জয়িতা চক্রবর্তী। জয়িতা হবিগঞ্জ পৌরসভার চিড়াকান্দি বাগানবাড়ির অসিত চক্রবর্তী ও সোনালী চক্রবর্তীর মেয়ে। সে বিকেজিসি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। কুমারীপূজার দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে আয়োজকদের। যোগিনীতন্ত্র, দেবীপুরাণ, স্তোত্র, কবচ, সহস্ত্রনা প্রভৃতি ধর্মীয় গ্রন্থের বিধান অনুসারে পুরোহিতরা কুমারী মায়ের পূজা করেন। চারদিক মুখরিত হয় শঙ্খ, উলুধ্বনি আর কুমারী মায়ের স্তব-স্তুতিতে।

হবিগঞ্জ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো পুণ্যার্থী সমবেত হয়। পুণ্যার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে রামকৃষ্ণ মিশন এলাকা। অন্য ধর্মের লোকজনেরও সমাগম ঘটে। হবিগঞ্জের বাহুবলের জয়পুরে শচী অঙ্গনে কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মহাঅষ্টমীর মূল আকর্ষণ ছিল কুমারীপূজার ১১ বছর বয়সী কন্যাশিশু। বয়স অনুসারে তার নামকরণ করা হয়েছে রুদ্ররানি।

বাহুবল পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অভিজিৎ ভট্টাচার্য বলেন, সকাল ১১টার দিকে ঢাক-ঢোল ও শঙ্খ বাজিয়ে উলুধ্বনির মাধ্যমে কুমারীকে দেবী সাজিয়ে আনা হয় পূজার বেদিতে। বসানো হয় সুসজ্জিত আসনে। কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। হাতে দেওয়া হয় ফুল, কপালে সিঁদুরের তিলক এবং পায়ে আলতা।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জ শহরের রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারীপূজা হয়েছে। ১১৭ বছর ধরে এখানে এই কুমারীপূজা হয়ে আসছে। গতকাল দুপুরে শঙ্খ, ঘণ্টা, উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে দুর্গা দেবীকে কুমারী রূপে অর্ঘ্য প্রদান করা হয়। ১৬টি উপকরণ দিয়ে পূজার কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস এই পাঁচ উপকরণ দেওয়া হয় কুমারী মায়ের পূজায়। এগুলো দেওয়ার পর দেবীর গলায় পুষ্পমাল্য পরানো হয়। পূজা শেষে প্রধান পূজারি দেবীর আরতি নিবেদন করে দেবীকে প্রণাম করেন। শহরের মিশনপাড়া এলাকার রামকৃষ্ণ মিশনে আয়োজিত কুমারীপূজায় এবার কুমারীর আসনে বসেছিল নারায়ণগঞ্জ শহরের কিন্ডার কেয়ার স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী।

পূজা শেষে প্রিয়ন্তী বলে, ‘আমি খুবই আনন্দিত যে আমি মানবের কল্যাণের জন্য দেবীরূপে বসেছি। আমি সবার আশীর্বাদ কামনা করছি।’

সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা জানান, চট্টগ্রামের রাউজান সদরের জলিলনগর বাসস্ট্যান্ড এলাকার জগন্নাথ সেবাশ্রম পূজামণ্ডপে কুমারীপূজা হয়েছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের কলেজ রোডের শ্রীমঙ্গলেশ্বরী কালীবাড়িতে প্রথমবারের মতো কুমারীপূজা হয়। সেখানে পূজা দেওয়া হয় সাত বছরের কুমারী ঐন্দ্রিলা চক্রবর্তীকে। গাইবান্ধা শহরের শচীন চাকি সড়কে রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমে আট বছরের মেয়ে পরমা সেহানবীশকে কুমারীরূপে পূজা করা হয়। ফরিদপুরে রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারীপূজা হয়েছে।

 



মন্তব্য