kalerkantho


ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের ফলাফল স্থগিত

তিন লাখ টাকায় পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন অনলাইনে

এস এম আজাদ   

১৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



তিন লাখ টাকায় পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন অনলাইনে

কম্পিউটারের দোকানে অনলাইনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ফরম পূরণের আড়ালে পরীক্ষায় জালিয়াতি চালিয়ে আসছিল বগুড়ার দুটি প্রতিষ্ঠান। শহরের জলেশ্বরীতলার কালীবাড়ী মোড়ের ‘রাহেমা অ্যাডমিশন ইনফরমেশন সেন্টার অ্যান্ড ফটো স্টুডিও’র মালিক সাব্বির হোসেন রানা এবং সূত্রাপুরের ‘গুগল অ্যাডমিশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টারের’ লাহাদুজ্জামান লিমন পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র দেওয়ার কথা বলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা করে নেন। চুক্তি অনুযায়ী পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগে হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার, ফেসবুকসহ মোবাইল ফোনের বিভিন্ন অ্যাপস ও নেটওয়ার্কে নমুনা প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। ওই প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ৭২ শতাংশ মিলে গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, লিমন ও রানা বগুড়ার কিছু তরুণকে দিয়ে অনলাইনে প্রশ্নপত্র বিক্রির সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। লিমনের বিরুদ্ধে গত বছরও জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তিনটি ধাপে পরীক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্ন পৌঁছান তাঁরা। তাঁদের সঙ্গে অন্তত এক ডজন ব্যক্তি জড়িত। চক্রটি অর্ধশত শিক্ষার্থীকে ‘প্রশ্নপত্র’ দিয়েছে বলেও তথ্য মিলেছে। মোবাইল ফোন (ডিজিটাল ডিভাইস) ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র জালিয়াতির ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর মূল দুই হোতা গা ঢাকা দিয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

এদিকে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর গতকাল সোমবার ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ স্থগিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল সকালে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, মঙ্গলবার ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে। পরে দুপুরে আরেক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সকালের বিজ্ঞপ্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, “বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দপ্তরের অ্যাসাইনমেন্ট অফিসারের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। কাল (আজ মঙ্গলবার) ‘ঘ’ ইউনিটের ফল প্রকাশ হচ্ছে না। উপাচার্যের আদেশে প্রথম প্রেস বিজ্ঞপ্তির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। ‘ঘ’ ইউনিটের ফল প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্য পরে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।” বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মাকসুদুর রহমান বলেন, “‘ঘ’ ইউনিটের ফল প্রকাশ স্থগিত রেখেছেন উপাচার্য। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর ফল প্রকাশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।”

গত শুক্রবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর থেকে পরীক্ষার্থী ইনসান আলী রকিকে (১৯) আটক করে প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে তাঁর ফেসবুক মেসেঞ্জারে সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে প্রশ্ন-উত্তর পাওয়া যায়। পরীক্ষার্থীর বাবা জাহিদুল ইসলাম (৪৫) তাঁকে হাতে লেখা ৭২টি প্রশ্ন ও উত্তর পাঠিয়েছিলেন। পরে জাহিদুল ইসলামকেও আটক করে সিআইডি। দুজনের কথার সূত্র ধরে মোস্তাকিম হোসেন (২০), সাদমান সালিদ (২১), তানভীর আহমেদ (২১) ও আবু তালেবকে (১৯) গ্রেপ্তার করে সিআইডি। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা এস এম কামরুল হাসান বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করেন। গত রবিবার ওই মামলায় ছয়জনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। মামলাটির তদন্তভার সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের সাইবার শাখায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য মুহাম্মদ সামাদকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসলাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা ছায়া তদন্ত করছি। মূলত শিক্ষার্থীদের কাছে মোবাইল ফোনের অ্যাপসে বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কথিত প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন জড়িত। তবে মূল হোতা বগুড়ার দুই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের নাম পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’

সিআইডি সূত্র জানায়, বগুড়ার কিছু তরুণকে নিয়ে তিনটি ধাপে জালিয়াতির সিন্ডিকেট গড়েন লিমন ও রানা। আগে ভর্তি পরীক্ষার বিশেষ ডিভাইস পাওয়া গেলেও এবার ব্যবহার হয়নি। তবে মোবাইল ফোন, একটি ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইনে জালিয়াতির কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে।

পরীক্ষার্থী ইনসানের বাবা জাহিদ জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তিনি বগুড়ার কালীবাড়ী মোড়ের জলেশ্বরীতলার রাহেমা কম্পিউটার সেন্টারের সাব্বির হোসেন রানা এবং গুগল অ্যাডমিশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টারের লাহাদুজ্জামান লিমনের কাছ থেকে তিন লাখ টাকায় প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন। মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তিনি এই প্রশ্ন পান। এরপর জাহিদ তাঁর ছেলে রকিকে ওই প্রশ্নপত্র দেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগেই পাওয়া যায় ওই প্রশ্নপত্র। যার সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের ৭০ শতাংশেরও বেশি মিলে গেছে।

এই সূত্রে পুলিশ গ্রেপ্তার করা ছয় আসামির মোবাইল ফোন যাচাই করে তথ্য পায়, হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়াও ইমো, ভাইভার ও ফেসবুকে তারা বেশ কিছু ব্যক্তির কাছে ‘প্রশ্নপত্র’ পাঠিয়েছে, যার সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অনেকটাই মিলে গেছে। গ্রেপ্তার করা অন্য চারজনের বাড়িও বগুড়ায়। নাটাইপাড়ার হযরত আলীর ছেলে মোস্তাকিম হোসেন, শাহজাহানপুর থানার রহিমাবাদের আব্দুর শেকুয়ারের ছেলে সাদমান সালিদ, শম্মশানকান্দীর আবু বকর সিদ্দিকের ছেলে তানভীর আহমেদ, গাবতলী থানার রাইসুলী গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে আবু তালেব প্রধান দুই আসামি লিমন ও রানার সহযোগী। এরা ঢাকায় অবস্থান করে অনলাইনের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করছিল। এই চক্রটি অর্ধশত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানায় তদন্তকারী সূত্র।

অভিযুক্তরা লাপাত্তা

বগুড়ার স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরও ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল গুগোলের মালিক লিমনের বিরুদ্ধে। এরপর তিনি কালীবাড়ী থেকে কার্যালয়টি সূত্রাপুরে স্থানান্তর করেন। বদ্দিরকোলা নামের একটি স্থানে তাঁর বাড়ি। একটি সূত্র জানায়, জলেশ্বরীতলায় রাহেমার পাশেই অন্বেষা নামে একটি প্রতিষ্ঠানই আগের গুগোল। অভিযোগের কারণে নাম পাল্টিয়ে কারবার করছিল লিমন। তবে মিশুক নামে অন্বেষার এক পরিচালক মোবাইল ফোনে বলেন, ‘না, আমাদের প্রতিষ্ঠান আলাদা। ওরা সূত্রাপুরে চলে গেছে।’ গতকাল কালের কণ্ঠের বগুড়ার ফটোসাংবাদিক জলেশ্বরীতলায় গিয়ে দেখেন, রাহেমায় তালা ঝুলছে। স্থানীয় লোকজন বলছে, এসব প্রতিষ্ঠান মূলত কম্পিউটারে ভর্তির ফরম পূরণের কাজ করে। 

বগুড়ার কোচিং সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা কোনো কোচিং সেন্টার নয়। এরা কম্পিউটারের দোকান। ভর্তি ফরম পূরণ করে। এদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

যেভাবে ধরা পড়ে জালিয়াতি

একাধিক সূত্র জানায়, গত শুক্রবার পরীক্ষার আগেই ফজলুল হক হলে অবস্থানকারী পরীক্ষার্থী রকির ফোনে প্রশ্নপত্র আসে। রকি মূলত বগুড়ারই এক শিক্ষার্থীর কাছে অবস্থান করে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিল।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী বিষয়টি জানতে পেরে কৌশলে তার ই-মেইলে প্রশ্নের নমুনাটি নিয়ে নেন। এরপর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঘটনাটি জানান এবং প্রশ্নের নমুনাটি দেন। পরে সাংবাদিকরা পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে অনলাইনে সরবরাহ করা প্রশ্নের মিল পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে জানান। একপর্যায়ে আটক করা হয় রকি ও তার বাবাকে। পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহায়তা নেয়।

 



মন্তব্য