kalerkantho


সিনহার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই ভারতের

ঢাকার পরামর্শকেই গুরুত্ব দেবে নয়াদিল্লি

মেহেদী হাসান, নয়াদিল্লি থেকে ফিরে   

১৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



সিনহার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই ভারতের

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে ভারতের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকারের সম্পর্ক নিয়ে সিনহার মন্তব্যকে নয়াদিল্লি গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং তিনি যদি এখন ভারত সফর করতে চান তবে তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি ঢাকার মতামত নেবে।

ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তারা কোনোভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না। বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের স্বার্থে গত জুলাই মাসে ব্রিটিশ আইন প্রণেতা ও আইনজীবী লর্ড কারলাইলকে নয়াদিল্লির বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দিতেও ভারত দ্বিধা করেনি।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ওয়াশিংটনে তাঁর বই ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে’ ভারতের সমর্থন কামনা করেন। তিনি বলেন, কেবল ভারতের সমর্থনেই এ সরকার টিকে আছে।

ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআইকে সিনহা সম্প্রতি বলেছেন, প্রধান বিচারপতি থাকাকালে ভারতে গিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়ে বাংলাদেশে বর্তমান সরকারকে সমর্থন না করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি আবারও ভারত সফর করতে চান।

গত সপ্তাহে নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি কে সিংয়ের কাছে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, তাঁর সরকার সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ভারতে ঢুকতে দেবে কি না? জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি কেউ এখানে আসতে চায় তবে আমরা বাংলাদেশের পরামর্শ মতোই চলব। আমরা যদি জানতে পারি, কেউ এখানে আসছে এবং কিছু বলার জন্য আসছে যা বন্ধুসুলভ নয় এবং এটি বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তবে আমরা বাংলাদেশের পরামর্শ অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেব।’

ভারত সরকারের সমর্থনেই বাংলাদেশের সরকার টিকে আছে—সিনহার এমন মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ভি কে সিং কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কে কী বলল সেটি আমাদের বিবেচ্য নয়। আপনারা (বাংলাদেশ) যেভাবে বলবেন আমরা (ভারত) সেভাবে সিদ্ধান্ত নেব। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কটা এখন এমনই।’

অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন আলোচনা পর্বে ভারতীয় কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের অনেকেই সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বক্তব্যকে ‘বিতর্কিত’ ও বই প্রকাশকে ‘উদ্দেশ্যপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দেখভালকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক বলেন, বইটি না পড়লেও এর বিভিন্ন দিক ও লেখকের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর (সিনহা) কাছ থেকে এই বইই প্রত্যাশা করা উচিত ছিল। সরকারের সঙ্গে তাঁর অনেক ইস্যু ছিল। আর এটি প্রকাশ করার সবচেয়ে ভালো সময় ছিল নির্বাচনের প্রাক্কাল। আর তিনি তাই করেছেন। কেন তিনি বই লিখেছেন, কারা তাঁকে সহযোগিতা করেছে, কারা অর্থ দিয়েছে, কিভাবে তিনি এ বই বের করেছেন—এ ধরনের অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মেলেনি।’

ওই কূটনীতিক বলেন, বিদেশের মাটিতে বসে বই প্রকাশ করতে টাকাসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন। এগুলোর সঙ্গে আর্থিক বিষয়ও জড়িত। নিঃসন্দেহে এর সঙ্গে আরো লোকজনের সম্পৃক্ততা আছে। বিশেষ করে, বইটি সম্পাদনা, সংশোধন, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকাশ করা, ওয়াশিংটনে প্রেস ক্লাবে যোগাযোগ করা, অনুষ্ঠান করা—এগুলো একার পক্ষে সম্ভব নয়।

ওই কূটনীতিক বলেন, বইটি এমন একসময় প্রকাশ করা হয়েছে যখন তিনি সরকারসহ প্রায় সবাইকে তাঁর বিরোধী প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। স্পষ্টতই তিনি অন্য কিছু চেয়েছিলেন। তিনি যখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে রায় দিয়েছেন তখন তিনি সেটিই লিখবেন বা তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো আনবেন। কিন্তু সেটি না করে তিনি বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যন্ত টেনেছেন।

ওই কূটনীতিক আরো বলেন, ‘প্রধান বিচারপতিরও অনেক দায়িত্ব আছে। তিনি এমনভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে তাঁকে উত্খাত করা হয়েছে। তিনি ক্ষমতাসীন সরকারকে কার্যত প্রতিপক্ষ বানিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য কী আমরা জানি না। তবে তাঁর আরো উচ্চাশার ইংগিত পাওয়া যায়। এখন বই থেকেও জানা যায় যে তিনি আরো কর্তৃত্ব চেয়েছিলেন। এটি গঠনমূলক নয়।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি থাকাকালে বিচার বিভাগের দেড় হাজার কর্মকর্তার প্রশিক্ষণের জন্য ভারতকে অনুরোধ করেছিলেন। বর্তমান সরকারের পূর্ণ সমর্থনেই সেটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আইনমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এ বিষয়ে পুরোপুরি সমর্থন করেছেন। ইতিমধ্যে ৫০০ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার প্রশিক্ষণও সম্পন্ন হয়েছে।



মন্তব্য